মানুষের প্রতি হিরনের ছিল গভীর ভালোবাসা :প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, শওকত হোসেন হিরনের মতো একজন এমপিকে হারিয়ে আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে। তিনি বলেন, মানুষের সেবা ও মঙ্গলের জন্য কাজ করে একজন ব্যক্তি রাজনৈতিক নেতা হয়ে উঠেন, হিরন সে রকমই একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। মানুষের প্রতি তার ছিল গভীর ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ। তার মৃত্যুতে আমরা একজন সত্ কর্মী হারালাম। বরিশাল-৫ আসনের সংসদ সদস্য ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শওকত হোসেন হিরনের মৃত্যুতে গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদে শোক প্রস্তাব উত্থাপন ও তা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এ সব কথা বলেন। শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনা শেষে রেওয়াজ অনুযায়ী তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দিনের কার্যসূচিতে থাকা একমাত্র আলোচ্য বিষয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনা স্থগিত করে অধিবেশন মুলতবি করেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। আজ বৃহস্পতিবার বিকেল তিনটায় অধিবেশন বসবে। দশম জাতীয় সংসদের চলতি প্রথম অধিবেশন আজ শেষ হওয়ার কথা। এর আগে বিকেল ৫টার কয়েক মিনিট পর অধিবেশন বসলে শুরুতেই দিনের সম্পূরক কার্যসূচি অনুযায়ী শওকত হোসেন হিরনের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করে শোক প্রস্তাব আনেন স্পিকার। প্রধানমন্ত্রী বলেন, হিরন ছিলেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র। আমি সবসময় তাকে এলাকার উন্নয়নে উত্সাহ দিতাম। বরিশাল শহর দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল, সেটি ছিল সন্ত্রাসীদের আখড়া। হিরন এসে সেই বরিশাল শহরে শান্তির সুবাতাস বইয়ে দেয়। শহরবাসী যেন আধুনিক সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা পায়, সেজন্য সে সবসময় সচেষ্ট ছিল। এবারের সংসদ নির্বাচনে আমি তাকে মনোনয়ন দিলাম, সে নির্বাচিত হলো, অথচ মেয়াদ পূরণ করতে পারলো না। এত অল্প বয়সে তাকে চলে যেতে হল। তার মৃত্যুতে বরিশালবাসীর অনেক ক্ষতি হয়ে গেল। শেখ হাসিনা বলেন, হিরনের একমাত্র ছেলের এখন এইচএসসি পরীক্ষা চলছে। একদিকে বাবার লাশ, আরেকদিকে তার পরীক্ষা। আমি তাকে শোক সামলে পরীক্ষা দিতে বলেছি। হিরনের ছেলেকে দেখে আমার মনে পড়েছে আমি যখন এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিলাম এবং যেদিন আমার ইংরেজি প্রথমপত্রের পরীক্ষা ছিল, আগেরদিন রাতে বাবাকে গ্রেফতার করা হয়। কী দুশ্চিন্তা নিয়ে সেদিন আমিও পরীক্ষা দিয়েছিলাম। প্রধানমন্ত্রী হিরনের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। এর আগে আলোচনায় অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেন, পুরো বরিশাল বিভাগ একজন কৃতী সন্তান হারালো। হিরন বরিশাল শহরকে সন্ত্রাসমুক্ত করেছিল। এজন্য বরিশালবাসীর কাছে তার একটি আলাদা স্থান ছিল। শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতীয় পার্টি (জেপি) চেয়ারম্যান এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, যারা রাজনীতি করেন তারা মানুষের মঙ্গল ও এলাকার উন্নয়ন চান। ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, হিরন প্রথমে উপজেলা চেয়ারম্যান হওয়ার পর আমি যতবার বরিশাল গেছি, যত রাতই হোক হিরন রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতো। উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে যে গাড়িটি সে পেয়েছিল, একবার সেটি নিয়ে রাত ২টার সময় সে আমার জন্য রাস্তায় অপেক্ষায় ছিল। আমি বললাম, এত রাতে এই শহরে তুমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে কেন? হিরন বললো, চেয়ারম্যান হিসেবে পাওয়া এই গাড়িতে প্রথম আপনি চড়বেন, এজন্য অপেক্ষা করছি। এই স্মৃতির কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন মন্ত্রী। পরিবেশ মন্ত্রী বলেন, হিরনের রাজনৈতিক জীবনে এত অল্প সময়ে এত সফলতা, সে কখনও বলতো না-আমি করেছি। সবসময় বলতো-প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতায় সব উন্নয়ন হয়েছে। একজন সার্থক রাজনীতিক হিসেবে ও ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য তাকে আমরা বারবার স্মরণ করবো। আনোয়ার হোসেন মঞ্জুও হিরনের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে তার পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। শোক প্রস্তাবের ওপর আলোচনার সূচনা করে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, হিরনের এমপি জীবন মাত্র শুরু হয়েছিল। মেয়র হিসেবে তিনি ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। প্রতিটি জনপদে ছিল তার বিচরণ। জাপা মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, উন্নয়নের কারণে তার মর্যাদা বরিশালের সীমানা পেরিয়ে পুরো বাংলাদেশে এমনকি দেশের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছিল। এ ধরনের মানুষ যুগে যুগে আসে না। আলোচনায় অন্যদের মধ্যে অংশ নেন- আওয়ামী লীগের শাজাহান খান, জাহাঙ্গীর কবির নানক, ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস, বাহাউদ্দিন নাসিম ও তালুকদার মোহাম্মদ ইউনুস প্রমুখ। শোক প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর হিরনের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকারসহ সবাই দাঁড়িয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করেন। এরপর তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত পরিচালনা করেন ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া।