মুরাসাকি শিকিবুর ‘দ্য টেল অব গেনজি’
চিরায়ত উপন্যাসের প্রতিভূ
প্রকাশ : ১০ এপ্রিল ২০১৪, ১৯:৩৪
হাজারতম মৃত্যুবার্ষিকীর শ্রদ্ধা
সূর্যোদয়ের দেশ জাপানে ৯৭৮ (মতান্তরে ৯৭৩) খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বিশ্বসাহিত্যের প্রথম ঔপন্যাসিক মুরাসাকি শিকিবু। তিনি মৃত্যুবরণ করেন ১০১৪ খ্রিস্টাব্দে। এক অভিজাত পরিবারে তাঁর জন্ম। বাবা ছিলেন হেইয়ান সাম্রাজ্যের এক প্রাদেশিক গভর্নর। ঐশ্বর্যের মধ্যে জন্মগ্রহণ করেও তাঁর জীবনটা সুখের ছিল না। বিয়ের তিন বছরের মধ্যে ১০০১ সালে বয়স্ক স্বামী ফুজিওয়ারা নোবুতাকাকে হারান। পরে ইম্পেরিয়াল লেডি-ইন-ওয়েটিং (সম্রাজ্ঞী শোশীর সহচরী) হিসেবে রাজঅন্তপুরে চাকরি লাভ করেন। এ সময়ে লেখা তাঁর ডায়েরি থেকেও অসুখী জীবনের পরিচয় পাওয়া যায়। একসময় তিনি চাকরিটা ছেড়ে দেন। মাত্র ৩৬ (মতান্তরে ৪১) বছর বয়সে তিনি মারা যান।
মুরাসাকি শিকিবু তাঁর আসল নাম নয়, ছদ্মনাম। মিচিনাগার ১০০৭ সালের ডায়েরিকে অনুসরণ করে কেউ কেউ মনে করেন, তার নাম ছিল ফুজিওয়ারা তাকাকু। তবে তিনি মুরাসাকি শিকিবু নামেই সারা বিশ্বে পরিচিত। মুরাসাকি শিকিবু ঔপন্যাসিক এবং কবি। তাঁর লেখা ডায়েরিও সাহিত্যিক মূল্যসম্পন্ন।
‘গেঞ্জি মনোগাতারি’ বা ‘দ্য টেল অব গেঞ্জি’ তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস। উপন্যাসটি ১০০০ থেকে ১০১২ সালের মধ্যে চায়নিজ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ জাপানি ভাষায় লেখা। চায়নিজ ক্লাসিক—ভাষা সেসময় শুধু জাপানি ছেলেরাই শিখতে, লিখতে ও পড়তে পারত, মেয়েরা নয়। মুরাসাকি শিকিবুর লেখা ডায়েরি থেকে জানা যায়, তাঁর ছোট ভাইকে এক গৃহশিক্ষক এ ভাষা শেখাতেন। শুনে শুনে মুরাসাকি এ ভাষাটা শিখে ফেলেন। তাঁর ভাষা শেখার দক্ষতা দেখে তাঁর পিতা বলেছিলেন, তুই যদি আমার ছেলে হতিস, আমার জন্য তা হতো বড় সৌভাগ্যের ।
মুরাসাকি শিকিবুর প্রধান কীর্তি হচ্ছে, ‘গেঞ্জি মনোগাতারি’ বা গেঞ্জি উপন্যাস, ইংরেজিতে ‘দ্য টেল অব গেঞ্জি’। বিশ্বের প্রথম উপন্যাস বলা হয় এটিকে। তিন খণ্ডে চুয়ান্ন অধ্যায় বিশিষ্ট এগারশ পৃষ্ঠার বিশাল উপন্যাস।
উপন্যাসটি এক হাজার বছর আগে লেখা হলেও তার কয়েকটি দিক বিস্ময়ের অবতারণা করে। এটি শুধু প্রথম উপন্যাসই নয়, প্রথম আধুনিক উপন্যাসও। প্রাচীন সাহিত্যে আমরা শুধু দেখি ধর্ম আর দেব-দেবীদের প্রাধান্য। সেখানে মানুষ গৌণ। প্রাচীন জাপান অর্থাত্ মুরাসাকির সমসাময়িককালে যেসব উপাখ্যান বা মনোগাতারি রচিত হয়েছে, সেগুলোয় দেবদেবীর প্রাধান্য, কম করে হলেও রূপকথা অথবা ফ্যান্টাসিতে ভরপুর। জাপানের ঐতিহ্যগত ‘মনোগাতারি সাহিত্যে’ তা-ই মানুষ দেখে আসছে।
এই ধারায় ব্যতিক্রম নিয়ে এলেন মুরাসাকি। এখানে প্রাধান্য পেলো মানুষ এবং মানুষের বাস্তবজীবন। সেই মানুষেরা হচ্ছে তার চারপাশের মানুষ, যাদের সঙ্গে তার প্রতিদিনই সাক্ষাত্ ঘটে। সম্রাট, সম্রাজ্ঞী, যুবরাজ রাজন্যবর্গ। আর লিখলেন রোমান্টিক প্রেমের উপন্যাস। এমন উপন্যাস, যা আমাদের ‘খেলারাম খেলে যা’ উপন্যাসকেও হার মানায়। এটি প্রথম মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসেরও গৌরব পেলো। আধুনিক মানুষের যে মনস্তাত্ত্বিক সংকট, তা উঠে এল এই উপন্যাসে। ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণগুলো একই সঙ্গে নৈতিক ও নিয়তিনির্ভর এবং বৈজ্ঞানিক। সমালোচকেরা মনে করেন, এই উপন্যাস আজ পর্যন্ত আদর্শ ক্লাসিক্যাল উপন্যাসের প্রতিভূ।
উপন্যাসের পটভূমি দশম-একাদশ শতকের সমৃদ্ধ হেইয়ান সাম্রাজ্য। সম্রাট এবং তার দরবারের অভিজাত মানুষ যেমন : সম্রাজ্ঞী, রাজপুত্র-রাজকন্যা, মন্ত্রী, গভর্নর, সেনা কর্মকর্তা, রাজকর্মচারী, রাজকবি প্রভৃতি উচ্চপর্যায়ের মানুষের জীবনচিত্র অঙ্কন করেছেন তিনি। তবে তা বাস্তবের আদলে কাল্পনিক চিত্র। যুবরাজ মিচিনাগার আদলে (মডেল) তিনি সৃষ্টি করেছেন গেঞ্জি চরিত্রটি। এই মিচিনাগা তাঁকে রাজপ্রাসাদে লেডি-ইন-ওয়েটিং-এর চাকরি দিয়েছিলেন। মুরাসাকির ডায়েরিতে বহু জায়গায় তার কথা বলা আছে। মুরাসাকি তার সঙ্গে কবিতা বিনিময় করতেন। মিচিনাগা মুরাসাকির মূল্যবান কাগজ-কালি জোগাতেন। কেউ কেউ মনে করেন, গেঞ্জি চরিত্রটি ‘মিনিস্টার অন দ্য লেফট’-এর চরিত্র অবলম্বনে সৃষ্টি।
সমকালীন বিষয় নিয়ে কাজ করার মধ্যে ঝামেলাও ছিল। তা ছিল খুব স্পর্শকাতর বিষয়। তিনি রাজপ্রাসাদে কাজ করলেও রাজকবি কিংবা কাহিনিকারদের মতো রাজা বা সম্রাটের প্রশস্তিমূলক সাহিত্য রচনা করতে যাননি। লেখার ক্ষেত্রে স্বাধীনতা ভোগ করতে চেয়েছেন। এক রাতের ভোজসভায় সভাকবি (কোর্টপয়েট) ফুজিওয়ারা নো কিনটু মুরাসাকিকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলার জন্য হঠাত্ করেই প্রশ্ন করেন, তোমার গেঞ্জি মনোগাতারিতে এই রাজপ্রাসাদের কোন কোন চরিত্রের কথা বলেছ? মুরাসাকি তাত্ক্ষণিক জবাব দেন, আমার কোনো চরিত্র এখানে বাস করে না। তিনি তাঁর ডায়েরিতে বিষয়টির অবতারণা করেন।
সম্রাট, সম্রাজ্ঞী ও মিচিনাগা নিয়মিতই তাঁর লেখা পড়তেন। তারপরও চরিত্র সৃষ্টি কিংবা গল্প বর্ণনায় কাউকে খুশি করতে তত্পর হননি। বরং যা দেখাতে চেয়েছেন, তা হলো ক্ষমতার নির্মম বা অন্যায় ব্যবহারে নশ্বর সুখ শুধু মানবঅস্তিত্বে দুঃখই বয়ে আনে। উপন্যাসের অন্তত এক হাজার জায়গায় তিনি ‘মোনো নো এওয়্যার’ অর্থাত্ দ্য সরো অব হিউম্যান এক্সিসটেন্স’ কথাটি ব্যবহার করেছেন।
মুরাসাকি চাইলে রাজপ্রাসাদে তাঁর অবস্থানের কথা বিবেচনায় এনে সুবিধাভোগীর মতো আইডিয়ালিন্টিক ভাবনায় উপন্যাসকে পরিপূর্ণ করে তুলতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা না করে গেঞ্জি উপন্যাসে মানবজীবনের বাস্তব কিছু দিকের পরিচয় তুলে ধরলেন, যেখানে ভোগ, ক্ষমতা, বাসনা বাস্তবিকভাবেই পরিদৃশ্যমান। তার জন্য আছে নির্লিপ্ততা, আত্মপ্রক্ষেপশূন্যতা (চরিত্র সৃষ্টিতে, কাহিনি রূপায়ণে কিংবা ঘটনার বর্ণনায়) যা নায়কের জন্য সহানুভূতি সত্ত্বেও অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ভাবলোকের জন্ম দেয়নি এবং উপন্যাসে তা অভিপ্রেতও নয়। তবে টেলরের ভাষায়, মুরাসাকি চরিত্রে নিজের জীবনের প্রতিফলন ঘটালেও তিনি ঔপন্যাসিক হিসেবে তাঁর নতুন স্রষ্টা ঈশ্বরই থাকতে চেয়েছেন, নিজে উপন্যাসের চরিত্র হতে যাননি।
উপন্যাসের সর্বত্র হেইয়ান সাম্রাজ্যের আভিজাত্য, ঐশ্বর্য এবং উচ্চতর জীবনমানের পরিচয় আছে। উচ্চ সমাজের পরিপূর্ণ একটি সমাজচিত্র আছে। এই সমাজের সঙ্গে মুরাসাকির পরিচয় ছিল প্রত্যক্ষ। একজন মেধাবী ও প্রতিভাময়ী বা জিনিয়াস হিসেবে তাঁর উপন্যাসের উপজীব্য বিষয় ও পটভূমি নির্বাচনের মধ্যে যতটা পরিচয় পরিব্যাপ্ত, তারচেয়ে বেশি প্রতিভার সাক্ষাত্ মেলে চিত্রকল্প ও চরিত্র সৃষ্টিতে। গেঞ্জি উপন্যাসের ৪৫তম অধ্যায়ে একটি দৃশ্যবর্ণনা এরকম : এক দারুণ বসন্তদিন। অষ্টম যুবরাজ উজির রাজপ্রাসাদে বসে প্রাকৃতিক বাগানের দিকে তাকিয়ে আছেন। সেখানে পুকুরে সন্তরণশীল একজোড়া বুনোহাঁস। বাঁশ গাছের নুয়ে পড়া অগ্রভাগ পানি স্পর্শ করে দুলছে। তার মনে কবিতার জন্ম হলো। তিনি কবিতা আওড়াতে লাগলেন। স্ত্রী বিয়োগের আগে যখন এ দৃশ্য দেখতেন, তখন তার মনে হতো, ছোট্ট এসব বুনোহাঁসেরা অনিশ্চিত অস্তিত্ব নিয়ে পানির ওপর বাঁচে খামোখাই। এখন তার ঈর্ষাই হয় যখন দেখে যে, এরা একে অন্যের কাছে সুখে ছুটে যাচ্ছে পাখা মেলে।
মুরাসাকি মূলত একজন কবি। ১২৮টি কবিতা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর কবিতা সংকলন—যার ইংরেজি নাম ‘পয়েটিক মেমোরিজ’। বহু কবিতা আছে গেঞ্জি উপন্যাসে। গদ্য-উপন্যাসে তাঁর কবিপ্রতিভার প্রকাশ সর্বত্র। আমাদের কালিদাসের মেঘদূতম-এর সে বর্ণনা ‘বসন ধরে আছে শিথিল হাতে যেন, তেমনি নুয়ে আছে বেতের শাখা, মুক্ত কর সখা তট নিতম্বরে, সরিয়ে নিয়ে নীল সলিলবাস’ কিংবা রবীন্দ্রনাথের ‘কল্পনা’ কাব্যের ‘স্বপ্ন’ কবিতার উজ্জয়িনীর দৃশ্যবর্ণনা বা চিত্রকল্পের কথা মনে করিয়ে দেবে প্রেম ও প্রকৃতিসচেতন মুরাসাকির চিত্রকল্পগুলো।
মানব সম্পর্ক বিশ্লেষণে মুরাসাকি উচ্চতর শক্তিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন। বহু চরিত্র এসেছে উপন্যাসে। চরিত্রগুলোর মানবিক বৈশিষ্ট্য, সামাজিক ও রাজকীয় অবস্থান, পারস্পরিক সম্পর্ক বিচার, বিশেষ করে নারী চরিত্রের ভালোবাসার অনুভূতি এবং অন্তরের ভেতরকার সৌন্দর্যগুলো এমনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে, তার প্রেক্ষিতে হেলেন ম্যাককলাফ বলেন, ‘মুরাসাকির লেখার আবেদন বিশ্বজনীনই হয়ে ওঠেনি, মানুষের অভিজ্ঞতা, যুক্তি, বিশ্বাস ও বর্ণনাশক্তির সীমা ছাড়িয়ে তা সকল যুগকে অতিক্রম করেছে।’
গেঞ্জি উপন্যাসের প্রথম ইংরেজ অনুবাদক আর্থার ওয়ালে মনে করেন, উপন্যাসটি লেখার কাজ শেষ করেছিলেন মুরাসাকি। আইভান মরিচ, ‘দ্য ওয়ার্ল্ড অব দ্য শাইনিং গেঞ্জি’ বইয়ের লেখক, মনে করেন, উপন্যাসটির কাজ শেষ হয়নি। অথবা শেষাংশটি হারিয়ে গেছে। দ্বিতীয় ইংরেজ অনুবাদক সেইডেন স্টাইকার বিশ্বাস করেন, মুরাসাকি শিকিবুর বোধহয় শেষ করবার মতো কোনো গল্প-কাঠামো জানা ছিল না, যতদূর সম্ভব লিখে যেতে চেয়েছেন।
এসব কথা বলার কারণ আছে। এ উপন্যাসের দুর্বল দিক হচ্ছে এটি। উপন্যাসের কাঠামোগত দিক বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, তার বিস্তৃতি ঘটেছে তৃতীয় প্রজন্ম পর্যন্ত। ঐতিহ্যগতভাবে তিন ভাগে বিভক্ত উপন্যাসটির প্রথম দুভাগ গেঞ্জির জীবনভিত্তিক। শেষের ভাগ গেঞ্জির উত্তরাধিকারী নাইও এবং কাওরোদের কাহিনি। উপন্যাসের ১ হতে ৩৩ অধ্যায় প্রেম ও রোমান্স, ৩৪ থেকে ৪১-এ সাফল্য ও ব্যর্থতা, ৪২ হতে ৪৪ ক্রান্তিকাল এবং ৪৫ হতে ৫৪ পর্যন্ত বহুল আলোচিত উজি অধ্যায়। কেউ কেউ মনে করেন, মূল উপন্যাস শেষ হয়ে গেছে ৩৩ নং অধ্যায়েই। ইয়াসানো আকিকো, যিনি প্রথম আধুনিক জাপানি ভাষায় উপন্যাসটির ভাষান্তর করেন, বলেন যে, ১ থেকে ৩৩ অধ্যায় পর্যন্ত মুরাসাকি নিজে লিখেছিলেন। বাকি ৩৪ থেকে ৫৪ অধ্যায় পর্যন্ত লিখেছেন তাঁর কন্যা দাইনি নো সানমি। অপর এক পণ্ডিতব্যক্তি বলেন, ৪২ হতে ৫৪ অধ্যায়গুলো বিশেষ করে ৪৪ অধ্যায় একজন লেখকই লিখেছেন—এমন মনে হয় না। রয়েল টেইলার তাঁর ইংরেজি অনুবাদের ভূমিকায় কম্পিউটার বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, পরিসংখ্যানগত তাত্পর্য যা-ই থাকুক, ৪৫-৫৪ অধ্যায়ের সঙ্গে অপরাপর অধ্যায়গুলোর রচনাশৈলিতে বেশ অসঙ্গতি রয়েছে।
সাধারণভাবে মনে করা হয়, উপন্যাসটি সমাপ্ত হয়েছে ১০২১ সালের মধ্যেই। এরকম মনে করার কারণ হচ্ছে, সেই সময়কার ‘সারাসিনা নিক্কি’-গ্রন্থের লেখিকা তাঁর ১০২১ সালের ডায়েরিতে উচ্ছ্বাসের সঙ্গে লিখেছেন, তিনি গেঞ্জি উপন্যাসের সবগুলো অধ্যায় পেয়ে গেছেন। পঞ্চাশটির বেশি অধ্যায় এবং একটি চরিত্রের উল্লেখও করেছেন তিনি। তাই পণ্ডিতেরা মনে করেন, যদি কেউ মুরাসাকির উপন্যাসের শেষাংশের কাজ করেও থাকেন, তা তাঁর লেখার খুবই কাছাকাছি সময়ে। মুরাসাকির ডায়েরির একটি সূত্রও উপন্যাসের প্রধান চরিত্র ‘মুরাসাকি’র যে ইঙ্গিত বহন করে, তা নিশ্চিত করে পুরো উপন্যাসটি তখন শেষের দিকে। উল্লেখ্য, ডায়েরিটি ১০০৮ সালে লেখা।
একাদশ শতকের জাপানি সম্রাট এবং তাঁর সভাসদদের রুচিবোধ ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে উপন্যাসটি রচিত। আধুনিক পাঠকের কাছে তাই তা অনেকাংশেই বেশ কঠিন। ভাষার দিক থেকে রীতিমতো দুর্বোধ্য। তাই বিশ শতকে এসেও ইয়াসানো আকিকোকে আধুনিক জাপানি ভাষায় তা আবার অনুবাদ করতে হয়েছে। সে অনুবাদও যে সুখপাঠ্য, তা কিন্তু নয়। হেইয়ান রাজসভার ভাষা ছিল বেশ বাঁকানো এবং ব্যাকরণগতভাবে অত্যন্ত জটিল। হেইয়ান রাজভাষার অপর একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে কবিত্ব। ভাষা কাব্যধর্মী নয়। কথোপকথনে ছন্দময় পদ্যের ব্যবহার। সে পদ্য থাকত ইঙ্গিতধর্মী, যা এখন সান্ধ্যভাষার মতোই রহস্যময়। চলমান অবস্থার প্রেক্ষাপটে ক্লাসিককাব্য করা ছিল আভিজাত্যের লক্ষণ। সবটা বলে ফেললে কিংবা বুঝতে দিলে যেন আভিজাত্য থাকে না। মুরাসাকি উপন্যাসে জাপানি তানকা রীতির কবিতা ব্যবহার করেছেন। এই কবিতার সবটা পাত্র-পাত্রীরা উচ্চারণ করে না, কারণ এসব কবিতা তাদের জানা আছে বলে শুধু দু-এক পঙিক্ত উচ্চারণ করে।
মুরাসাকির মূল পাণ্ডুলিপি কিন্তু পাওয়া যায়নি। পাওয়া গেছে দ্বাদশ শতকের লিপিকরদের পাণ্ডুলিপি। পরে এগুলো বহু হাতে লিপিবদ্ধ হয়েছে। মনে করা হয়, উপন্যাসটি জাপানি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আদি কানা ভাষায় রচিত। তার পক্ষে যুক্তি হচ্ছে, চায়নিজ বৈশিষ্ট্যের ভাষা শুধু পুরুষরাই তখন শিখতে পারত, নারীরা নয়। নারী পাঠকদের কথা বিবেচনা করে মুরাসাকি কানা ভাষায় উপন্যাসটি লিখেছেন। তবে তিনি চায়নিজ বৈশিষ্ট্যের ক্লাসিক্যাল রাজভাষা জানতেন। সম্রাজ্ঞী শোশী তার কাছে নবম শতকের জনপ্রিয় চীনা কবি বাইযুয়ীর গাথা শুনতে চাইতেন, চায়নিজ ভাষা শিখতে চাইতেন। মুরাসাকি সম্রাজ্ঞীর সে ইচ্ছে পূরণ করেছেন। ভাষাগত এবং অসীম জ্ঞানভাণ্ডারের জন্য তাকে টাইটেল দেয়া হয় ‘নিহোনজি নো সুবোনে’ যার ইংরেজি অর্থ ‘আওয়ার লেডি অব দ্য ক্রোনিক্যালস’। মৌখিক ভাষার বাইরে রাজদরবারে রাজনীতি ও বৌদ্ধধর্ম চর্চার ক্ষেত্রে চায়নিজ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ক্লাসিক ভাষার ব্যবহার ভাষার গতিকে শ্লথ করে দিয়েছে। পঞ্চাশ হাজারের বেশি চায়নিজ বৈশিষ্ট্যের ক্লাসিক্যাল ভাষার ব্যবহার তাঁর লেখায় দুর্নিরীক্ষ নয়।
এছাড়া একই শব্দের নানারকম ব্যবহারে আধুনিক পাঠক বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে যেতে বাধ্য। উপন্যাসের চরিত্রগুলোও নানা সমস্যার সৃষ্টি করে। এদের নাম, পেশা ও সামাজিক মর্যাদা নির্ণয় করা এখন বেশ শক্ত। কোনো নারী চরিত্র তার স্বামীর পদবির সঙ্গে সম্পর্কিত ও পরিচিত। কেউ কেউ পোষাকের রঙ বা ধরনের ওপর সম্বোধন পেয়েছে অথবা অ্যাবাসার্ড নাটকের চরিত্রের মতো ইঙ্গিতে-ইশারায় পরিচিতি লাভ করেছে। একই ব্যক্তিকে দেয়া নানা খেতাব এবং উপাধি তাকে শনাক্তকরণের প্রক্রিয়াকে আরো জটিল করে তুলেছে। তাই গেঞ্জি উপন্যাসকে কেউ কেউ মনে করেন, হেইয়ান রাজসভার কোটনি, পঠন অযোগ্য সেকেলে অপরিচিত রাজভাষার উপন্যাস।
মুরাসাকি শিকিবুর সামনে তখন অনুসরণযোগ্য আধুনিক উপন্যাসের কোনো নমুনা বা মডেল ছিল না। সাহিত্যের যা উদ্দেশ্য, পাঠককে আনন্দদান এবং আদর্শগত ও নৈতিকতার পথ প্রদর্শন, তা সামনে রেখেই প্রচলিত ধারা ও বিশ্বাসকে দু-দিকে ঠেলে এগিয়ে গেছেন তিনি। তাঁর সমকাল এ প্রচেষ্টাকে গ্রহণ করেছে। ‘সারাসিনা নিক্কি’ গ্রন্থের লেখিকার ১০২১ সালে লেখা ডায়েরিতে প্রকাশিত উচ্ছ্বাস থেকেই বোঝা যায়, এ উপন্যাস তখনই কতটা জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। দ্বাদশ শতকে এ উপন্যাসের আলোকে বহু চিত্রকলা অঙ্কিত হয়েছে, কাঠ খোদাই হয়েছে, যা এত শতাব্দি পর আজও চালু আছে। উপন্যাসটি বর্তমান জাপানেও সমান প্রিয়, মূলভাষার অংশ বিশেষ স্কুলে পাঠ্য এবং বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ‘মাস্টারপিস’।
জর্জ লুইস বর্গেস যে কথা বলেছেন, তাঁর সঙ্গে একমত না হয়ে পারা যায় না। তিনি বলেছেন, ‘অদ্ভুত স্বাভাবিকত্বে লেখা উপন্যাসটি মানব-মনস্তত্বের যে বার্তা নিয়ে এসেছে, তার প্রতি আগ্রহ না জন্মে পারে না।’ জাপানি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ঔপন্যাসিক ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা তাঁর নোবেল বক্তৃতায় বলেন, ‘গেঞ্জি উপন্যাস জাপানি সাহিত্যের সর্বোচ্চ চূড়া স্পর্শ করে আছে। আমাদের আজকের দিনেও এমন কোনো উপন্যাস নেই, তার সঙ্গে যার তুলনা করা চলে। আমার কাছে খুবই অলৌকিক মনে হয়, একাদশ শতকে এমন একটি আধুনিক সাহিত্য রচিত হয়েছে।’
এই উপন্যাসের ভেতরকার গঠনশৈলীর সুসংহতরূপ ও শিল্পিত বাঁধুনি, জটিল মনস্তত্ত্বের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা, চরিত্র চিত্রণে বিশ্লেষণধর্মিতা ও সুস্পষ্টতা, শিহরণ জাগানো রোমাঞ্চ, উত্সব-ঐতিহ্যের প্রাসঙ্গিক আবাহন, রাজকীয় পটভূমিতেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অবগাহন, কনফুসিয়ান দর্শনের রূপায়ণ এবং পাশাপাশি উজি তথা কিয়োটোর স্পিরিচুয়াল দিকের আঙ্গীকরণ মেধাবী পাঠককে না টেনে পারে না। এই উপন্যাসের আবেদন বিশ্বজনীন এবং সর্বকালের পাঠকের উপযোগী। ম্যাক কলাফ ঠিকই বলেছেন, ‘মুরাসাকি ইজ বোথ, দ্য কুইনটেসেনশিয়াল রিপ্রেজেনটেটিভ অব এ ইউনিক সোসাইটি অ্যান্ড এ রাইটার হো স্পিকস টু ইউনিভার্সেল হিউম্যান কনসার্নস উইথ এ টাইমলেস ভয়েস।’
আমাদের বিচারে এ মূল্যায়ন যথার্থ।