সময়ের স্রোতে জেগে উঠেছে

‘মহুয়া সুন্দরী’

নমশূদ্রের ব্রাহ্মণ কবি দ্বিজ কানাই রচিত, চন্দ্র কুমার দে সংগৃহীত—শ্রী দীনেশচন্দ্র সেন সংকলিত- ময়মনসিংহ গীতিকা অবলম্বনে অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের গ্রন্থনায়, প্রয়াত ওস্তাদ যোগেশ চন্দ্র দাসের নৃত্য পরিকল্পনায় এবং ইলোরা ইমাম শম্পার নৃত্য পরিচালনায় মঞ্চস্থ হয়েছে নৃত্যনাট্য ‘মহুয়া’। শিক্ষক ও সঙ্গীতজ্ঞ ওয়াহিদুল হকের স্মরণে দেশের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ছায়ানট’-এর আয়োজনে গত ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার বকুলতলায় অনুষ্ঠিত দু-দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের শেষদিন সন্ধ্যায় এ নৃত্যনাট্যটি মঞ্চস্থ হয়। বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, ময়মনসিংহ জেলা সংসদ নৃত্যনাট্যটি পরিবেশন করে। কবি দ্বিজ কানাই ৩০০ বছর পূর্বে ‘মহুয়া সুন্দরী’ নামে এই পালাগানটি রচনা করেন, যা আমাদের অনেকের কাছে ‘নদের চাঁদ ও মহুয়া’র পালা বা গাথা নামে পরিচিত। এখন নতুন করে আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্যের সমৃদ্ধির ধারার এইসব অনন্যসৃষ্টি লোকজ গাথাগুলো উপস্থাপন করার ফলে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করছে এবং আমাদের নিজস্ব ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতি ভালোলাগার পথ দেখাচ্ছে। তারই প্রমাণ মেলে বর্তমান সময়ে রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন দলের পরিবেশনায় নৃত্যনাট্য ‘মহুয়া’র জনপ্রিয়তায়। আলোচ্য এই নৃত্যনাট্য ‘মহুয়া’ শুরুর পূর্বে ‘আহারে তাহার লাইগা...’ গানের সুরে ঢোল, দোতারা, বেহালা আর হারমোনিয়ামের বিরহের করুণ বাজনা বেজে ওঠে। মঞ্চের এক কোণে দাঁড়িয়ে বয়াতি—স্বপন সরকার। মঞ্চের সামনে প্রস্তুত মহুয়া নৃত্যনাট্য দেখার জন্য হাজারখানেক দর্শক-শ্রোতা। মঞ্চের এক কোণে দাঁড়িয়ে বয়াতি শুরু করলেন—বন্দনা। বন্দনা শেষে বয়াতি শুরু করলেন ‘ধুয়া’। আর এর পরপরই শুরু হলো বাংলা লোকসাহিত্যের কালজয়ী বিয়োগান্তক গীতি উপাখ্যান ‘মহুয়া’র পালা থেকে নৃত্যনাট্য ‘মহুয়া’। বদলে গেল মঞ্চের দৃশ্য। ...কাঞ্চনপুর গ্রাম, মঞ্চে প্রতিকীভাবে উঠে এল ডাকাতির দৃশ্য। নেপথ্যে থেকে বয়াতির গীতবর্ণনার সাথে অন্যান্য কণ্ঠশিল্পীদের মনোমুগ্ধকর কোরাসে আর মঞ্চে কুশীলবদের অনবদ্য শারীরিক অভিনয় ও মনোহর নৃত্যশৈলীতে ধন-দৌলতের সাথে চুরি হলো শিশুকন্যাও। অতঃপর, ষোল বছর পর ডাকাত সর্দার হোমরা বাইদ্যা চুরিকৃত ছোট শিশুকন্যা মহুয়াকে নাচ শেখাতে থাকে। ধীরে-ধীরে সে নাচে-গানে, খেলা দেখানোয় পারদর্শী হয়ে ওঠে। ছোট মহুয়া হয়ে ওঠে যৈবতী-সুন্দরী। নৃত্যনাট্যে এভাবে বেদেদের ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা শিশু মহুয়া তাদের আচার-আচরণে অভ্যস্ত হয়ে যায়। শিকারের পাশাপাশি সুন্দরী মহুয়া সাপখেলা দেখানোতেও অত্যন্ত পারদর্শী হয়। বেদে দলের সাথে দেশ-দেশান্তরে ঘুরে ঘুরে সাপ খেলা দেখায়। এক মুগ্ধ দর্শনার্থীর মুখে, গ্রামে বেদের দল এসেছে এবং তারা খুব ভালো খেলা দেখাচ্ছে, শুনে জমিদার নদের চাঁদ তার বাড়িতে খেলা দেখানোর জন্য বেদের দলকে লোক মারফত আহ্বান জানায়। বেদে দল সানন্দে রাজি হয়। নদের চাঁদ, বেদের দলের খেলা দেখে মুগ্ধ হওয়ার চেয়ে অধিক মুগ্ধ হয় মহুয়াকে দেখে। এবং জমিদার তার এলাকায় বেদের দলের জন্য থাকার ব্যবস্থা করে দেয়। জমিদারের মতো মহুয়ারও ভালো লাগে জমিদার নদের চাঁদকে। একসময় মহুয়ার প্রেমে মজে যায় জমিদার নদের চাঁদ। বেদেরা সেটাকে মেনে নিতে পারে না। শুরু হয় বিবাদ। বেদে দলের সর্দার হোমরা বাইদ্যা এ কথা জানতে পারলে ক্ষিপ্ত হয়। নদের চাঁদ ও মহুয়ার প্রেম মেনে নেয় না হোমরা বাইদ্যাও। হোমরা বাইদ্যা মহুয়াকে নির্দেশ দেয় নদের চাঁদকে হত্যা করতে, কিন্তু তা করতে পারে না মহুয়া। ঘটনাক্রমে মহুয়া আত্মহত্যা করে। মহুয়ার আত্মহত্যার পরপরই বেদের দলের সর্দারের নির্দেশে নদের চাঁদকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে—সুজন। মঞ্চে মহুয়ার পাশে লুটিয়ে পড়ে নদের চাঁদ। ময়মনসিংহ উদীচী শিল্পগোষ্ঠী এই নাট্যটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার উন্মুক্ত মঞ্চে পরিবেশন করায় এবং আলোর ব্যবস্থা না থাকায় যে দৃশ্যে যে আলোর প্রয়োজন, তার পরিপূর্ণ ব্যবহার করতে পারেনি বা সম্ভব হয়নি। তাছাড়া নাট্যটিতে সামগ্রিক বিবেচনায় (অভিনয় ও কণ্ঠসঙ্গীত) বেশ দীনতা চোখে পড়েছে। অভিনয়ে নদের চাঁদ চরিত্রে গোলাম কিবরিয়া খানের অভিনয়ে স্বতস্ফূর্তের ভাব থাকলেও নৃত্যের সাথে শারীরিক বহিঃপ্রকাশের যোগসূত্র (অনেক ক্ষেত্রে) পাওয়া যায়নি। তার নৃত্যের ক্ষেত্রে আরো ভালো করার জায়গা আছে। তবে, মহুয়া চরিত্রে নুছরাত ইমাম বুলটির অভিনয় ভালো। সময়ের প্রেক্ষিতে দৃশ্যের পরম্পরায় নৃত্যের পাশাপাশি শারীরিক বহিঃপ্রকাশ ছিল অসাধারণ। এবং হোমরা বাইদ্যা চরিত্রে মনি ভূষণ ভট্টাচার্যের পরিবেশনা দর্শকদের মোহিত করেছে। নৃত্যনাট্যটির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন, নদের চাঁদ চরিত্রে—গোলাম কিবরিয়া পিনু, মহুয়া—নুছরাত ইমাম বুলটি, হুমরা বাইদ্যা—মনি ভূষণ ভট্টাচার্য, মহুয়ার সই পালংয়ের চরিত্রে—তুষ্টি সাহা, সুজনের চরিত্রে—রকি, মাইনক্যা—মনির হোসেন জীবন, বেদের দলে—স্বপন, সিহাব, আরজু, শুভ, শামীম, রুপা, শাম্মী, সারা, মুনা, ছাইয়েদা এবং ছোট মহুয়ার চরিত্রে—অদিতি রায় সৃষ্টি। নাট্যটিতে এ.কে.এম শাহাবুদ্দিন খাঁ-এর সঙ্গীত পরিচালনায় কণ্ঠসঙ্গীতে ছিলেন—স্বপন সরকার, ফাল্গুনী দে টুম্পা, মারুফ হাসান ইমন, আরিফুল ইসলাম হাবীব, জয়ন্তী বিশ্বাস, রাজীব কুমার, নাদিরা বেগম ও শুভ্রা জোয়ার্দ্দার।