হানাদার বাহিনীর পদলেহীরা ইতিহাস বিকৃত করছে

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বৈধ প্রধানমন্ত্রী ছিলেন উল্লেখ করে এর পক্ষে ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ ও তথ্য-প্রমাণ তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন-সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তারাই প্রশ্ন তুলছে, যারা স্বাধীন বাংলাদেশ চায়নি ও এর অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না। যারা এখনো ওই পরাজিত শক্তি পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর পদলেহন করছে তারাই বিতর্ক সৃষ্টি করছে। তাদের উদ্দেশ্য একটাই- পাক হানাদার বাহিনীর গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাটসহ অপকর্ম ধামাচাপা দেয়া। কাজেই যারা স্বাধীন বাংলাদেশ চায়নি, তারা নানা কথা বলবে। এসব বিষয়ে বিভ্রান্ত না হতে তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। গতকাল দশম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বক্তব্যে একইসঙ্গে তিনি সংসদে দেয়া রাষ্ট্রপতির ভাষণের ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপরও আলোচনা করেন। রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর মোট ৫৬ ঘণ্টারও বেশি আলোচনা হয়। পরে সর্বসম্মতিক্রমে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাব গৃহীত হয়। শেখ হাসিনা বলেন, জিয়াউর রহমানকে মুক্তিযোদ্ধা, স্বাধীনতার ঘোষক ইত্যাদি বলে দাবি করা হয়। তাহলে তিনি কীভাবে রাজাকারদের এদেশের রাজনীতিতে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করলেন? ‘৭৫-এর ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের পর বেঈমান, মোনাফেক ও খুনি মোশতাকই জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান করেছিলেন। ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জিয়া জড়িত ছিলেন বলেই মোশতাক তাকে সেনাপ্রধান করেন। বিচারপতি সায়েমের কাছ থেকে অস্ত্রের জোরে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে জিয়া নিজেকে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন। বঙ্গবন্ধুর খুনের সঙ্গে জড়িতদের জিয়া বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দিয়ে তাদের পুরষ্কৃত করেন। জিয়ার সময় ১৯ বার সেনাবাহিনীতে ক্যু হয়। প্রতিবারই তিনি বহু মানুষকে ফাঁসি দিয়েছেন। জিয়া এবং পরে তার স্ত্রী (খালেদা জিয়া) রাজাকারদের মন্ত্রী বানিয়ে দেশকে খুন, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদের কবলে পতিত করা সহ ধ্বংসের শেষ প্রান্তে নিয়ে যান। প্রধানমন্ত্রী তার বর্তমান ও আগের সরকারের বিভিন্ন সফলতা তুলে ধরে বলেন, আমরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই। কারও কাছে ভিক্ষা চাই না। আমরা বিজয়ী জাতি, বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাই। তিনি বলেন, আজ (গতকাল) ১০ এপ্রিল। যে সংসদে বসে কথা বলছি, স্বাধীন দেশ হিসেবে মর্যাদা পেয়েছি। ’৭১ এর ১০ এপ্রিল, এর একটি তাত্পর্য রয়েছে। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা একত্রিত হয়ে এই ১০ এপ্রিল একটি সরকার গঠন করে। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। জনগণ অক্ষরে অক্ষরে তা পালন করে। ১৬ ডিসেম্বর মিত্রশক্তির সহযোগিতায় দেশ শত্রুমুক্ত হয়। এই মুক্তিযুদ্ধে ভারতসহ অনেকে আমাদের সহযোগিতা করেছে। বঙ্গবন্ধু ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে এসে পরদিন হেয়ার রোডে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনের বাসায় বৈঠক করেন। ’৭২ এর ১১ জানুয়ারি একটি আদেশ জারি হয়। এতে বলা হয়, এই আদেশ সাময়িক সংবিধান বলে গণ্য হবে। তিনি বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বানচাল করে বিএনপি-জামায়াত কী আনতে চেয়েছিল। তারা গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা নষ্ট করতে চেয়েছিল। তাদের শত উস্কানি সত্ত্বেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী ও প্রশাসন ওই নির্বাচন অনুষ্ঠানে দৃঢ়সংকল্প ছিল। আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক বাতিল হয়েছিল। তারপরেও আমি তত্কালীন বিরোধী নেতাকে ফোন করে আলোচনায় বসার আমন্ত্রণ জানাই। তিনি না এসে বসে থাকলেন। কোনো জায়গায় একটি ঘটনা ঘটলে তিনি শান্তি পান। গণতান্ত্রিক পন্থা তার পছন্দ নয়। পছন্দ না করাই স্বাভাবিক। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা বারবার গণতন্ত্র আনি। মাঝে মধ্যে এর সঙ্গে একটি হাইপেন (-) জুড়ে দেয়া হয়। কখনও সামরিক সরকার, কখনও সেনা নিয়ন্ত্রিত সরকার ইত্যাদি নামে অগণতান্ত্রিক শক্তি এসেছিল। এবারই প্রথম একটি নির্বাচিত সরকার আরেকটি নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে। তিনি বলেন, আজকে সংসদে বিরোধী দল আছে। আমরা ওয়েস্ট মিনিস্টার্স সিস্টেম গড়ে তুলতে চাই যেখানে সংসদ নেতা ও বিরোধী দলীয় নেতার সমন্বয়ে সংসদ চলে। সরকার খারাপ করলে বিরোধী দল সমালোচনা করবে। কিন্তু দেশের উন্নয়নে সরকারকে সহযোগিতা করাও তাদের দায়িত্ব। শেখ হাসিনা বলেন, কিছু লোক, বিশেষ করে কিছু বিদেশি আমাদের বিষয়ে নাক গলায়। বিদেশিদের কাছে ধর্না দেয়াও আমাদের একটি অভ্যাস। তারা যাদেরকে (বিএনপিকে) বিরোধী দল বলছে তারা তো সংসদেই নেই, বিরোধী দল হয় কী করে। তাদেরকে কী বিরোধী দল বলবো, তারা বিরোধী দলে থাকতে সংসদে আসতো না। শুধু সুযোগ-সুবিধা, বিদেশ সফর ও করমুক্ত গাড়ির জন্য সংসদে আসতো। কাজেই সেই বিরোধী দল থাকলেই বা কি, না থাকলেই কি। তাদের জন্য বিদেশিদের এত মায়াকান্না কেন?