দল প্রস্তুত হলেই কঠোর আন্দোলন :খালেদা জিয়া
প্রকাশ : ১২ এপ্রিল ২০১৪, ২৩:২৬
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া সরকারের উদ্দেশে বলেছেন, দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিন। অন্যথায় করুণ পরিণতির জন্য আপনারাই দায়ী থাকবেন। তখন কারো কিছুই করার থাকবে না। জনগণের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যাচ্ছে। নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে বিএনপির চেয়ারপারসন বলেন, আসুন সময় হয়েছে, জুলুম-অত্যাচারে চোখের পানি ফেলে নয়, নির্যাতনের জবাব দিতে হবে প্রতিরোধ, প্রতিবাদ করে। সে প্রস্তুতি নিন। আন্দোলন কর্মসূচি নিয়ে যারা নানা কথা চলছে তাদের উদ্দেশে খালেদা জিয়া বলেন, যারা যাই মনে করুক, কারও কথায় আমরা চলি না। অনেকেই নিজস্ব চিন্তা ভাবনা থেকে বলেন, বিএনপি হতাশ, তারা আন্দোলনে যাচ্ছে কেন? আমরা কারো কথায় আন্দোলন করি না। আমরা যখন মনে করব তখন আন্দোলনে যাব। জনগণ প্রস্তুত হয়ে আছে। সংগঠনের প্রস্তুতি চলছে। সংগঠন প্রস্তুত হলেই আন্দোলন।
শনিবার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ঢাকা মহানগর শ্রমিক দলের ৬ষ্ঠ সম্মেলন ও কাউন্সিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সম্মেলন কেন্দে উপস্থিত আয়োজক সংগঠনের নেতাকর্মীরা তাকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান। এতে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা মহানগর শ্রমিক দলের সভাপতি মোঃ রেহান আলী। বক্তব্য রাখেন- বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি নজরুল ইসলাম খান, ড. মঈন খান, আবদুল্লাহ আল নোমান, সাদেক হোসেন খোকা, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, নুরে আরা সাফা, শিরীন সুলতানা প্রমুখ।
খালেদা জিয়া বলেন, সারা দেশে বিএনপির কমিটি পুনর্গঠনের কাজ শুরু হয়েছে। ঢাকা মহানগর বিএনপির কমিটিও পুনর্গঠন করা হবে। যাদের যোগ্যতা, দক্ষতা, মেধা আছে, সংগঠন গতিশীল করার স্বার্থে তাঁদের নেতৃত্বে নিয়ে আসা হবে। কমিটিগুলোতে থাকবে নবীন-প্রবীণের সমন্বয়। রাজপথে আন্দোলন গড়ে তুলতে পারবেন- এমন দক্ষ নেতৃত্ব নির্বাচন করা হবে।
নিবার্চনে না গিয়ে প্রমাণ করেছি আমরা সঠিক ছিলাম
খালেদা জিয়া বলেন, দেশে কোনো গণতন্ত্র নেই। গণতন্ত্র মৃত। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে এ সরকার গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছে। আমরা ৫ জানুয়ারি নিবার্চনে না গিয়ে প্রমাণ করেছি আমরা সঠিক ছিলাম। উপজেলা নিবার্চনে দেশের মানুষ তা দেখেছে। সংসদে দেশের স্বার্থ নিয়ে কোন কথা হয় না। জনগণের টাকা নষ্ট করে শুধু ঝগড়া আর গালি-গালাজ করা হয়। শীঘ্রই রাজপথে কঠোর আন্দোলনের মাধ্যমে এ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা হবে। দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বেগম জিয়া বলেন, ভয় পাবেন না। সরকারের পায়ের তলায় মাটি নেই। আওয়ামী লীগ আজ একা। ১৪ দলে কোন দল নেই, ছিল শুধু জাতীয় পার্টি। কিন্তু এরশাদের বেঈমানির কারণে জাতীয় পার্টিও আজ টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। সবাই তার দল থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। তার কিছু করার ক্ষমতা নেই।
খালেদা জিয়া বলেন, এ সরকারের অধীনে কোন সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। তারা বুঝতে পেরেছে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে কখনো ক্ষমতায় যেতে পারবে না। তাই মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করেছে।
খালেদা জিয়া বলেন, আওয়ামী লীগ সন্ত্রাসে বিশ্বাসী। তাদের প্রত্যেকের হাতে অস্ত্র। আর বিএনপির অস্ত্র জনগণ। এ জনগণকে সঙ্গে নিয়েই বিএনপি রাজপথে নামবে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন আর পড়ালেখা হয় না। সেগুলো অস্ত্রাগারে পরিণত হয়েছে। হলগুলোতে ছাত্রদলের কর্মী বা সাধারণ ছাত্ররা থাকতে পারেন না।
খালেদা জিয়া বলেন, আওয়ামী লীগের অধীনে দেশ ও জনগণ কেউ নিরাপদ নয়। দেশ আজ বন্ধুহীন হয়ে পড়েছে। বিদেশিরা এ দেশে বিনিয়োগ করছে না। গত ৫ বছর ৩ মাসে দেশে নতুন কোনো দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ হয়নি। দেশে কোন নতুন শিল্প কারখানা হয়নি। এ জন্য দায়ী আওয়ামী লীগ। একদিকে তারা দুর্নীতি করে, অন্যদিকে মিথ্যাচার করে। আওয়ামী লীগের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক নেয়া বন্ধ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, আমরা সন্ত্রাসে বিশ্বাস করি না। আওয়ামী লীগ প্রতিদিন মানুষ মারছে। প্রতিনিয়তই গুম, খুন বাড়ছে। ২৪ ঘণ্টায় ৩৬ লাশ পাওয়া গেছে।
এরশাদ হলো খাঁটি বেঈমান-মোনাফেক
খালেদা জিয়া বলেন, এরশাদ হলো খাঁটি বেঈমান-মোনাফেক। তাকে বিশ্বাস করা যায় না।
উনি কী উপদেশ দেবেন? তাকে দেশের কেউ বিশ্বাস করে না। বিদেশিরাও বিশ্বাস করে না। উনি কী দূতিয়ালি করবেন? এরশাদ অনেক দুর্নীতি করেছেন, অনেক মানুষ হত্যা করেছেন। তার বিচার হয়নি। তার সব পাপ জমা রয়েছে। খালেদা জিয়া বলেন, এরশাদের জাতীয় পার্টি তিন চার টুকরো হয়ে গেছে। এরশাদ নির্বাচনের আগে বলেছিলো সে রিজাইন করেছে, মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছে। তাহলে সে শপথ নেয় কী করে, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হয় কী করে?
প্রশাসন ‘দলীয় যন্ত্র’
প্রশাসনকে ‘দলীয় যন্ত্র’ উল্লেখ করে বেগম খালেদা জিয়া বলেন, প্রশাসনকে দলীয় যন্ত্র করে রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করা হচ্ছে। পাবলিক সার্ভিস কমিশনে (পিএসসি) যোগ্যতার ভিত্তিতে নয়, স্বজনপ্রীতি-দলীয় মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। তাদের দুর্নীতির কারণে পদ্মাসেতু হয়নি।
বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, কাদের স্বার্থে এই দাম বৃদ্ধি করা হচ্ছে। কুইক রেন্টালের নামে দুর্নীতি করে সব টাকা তাদের দলীয় ও পরিবারের লোকজনের পকেট ভারি করা হয়েছে। আর এই ঋণের বোঝা চাপানো হচ্ছে সাধারণ জনগণের কাঁধে।
অনুষ্ঠানে সাদেক হোসেন খোকা তারেক রহমানকে নিয়ে সংসদে তোফায়েল আহমেদের দেয়া বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, তিনি নাকি এতই ক্ষমতাধর ছিলেন জিয়াউর রহমান তাকে স্যার স্যার বলতে বলতে অস্থির হয়ে যেতেন। এখন তারেক রহমানের বক্তব্য খণ্ডন করতে না পেরে যাচ্ছে তাই বলছেন।
খোকা বলেন, জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক ও প্রথম ঘোষিত রাষ্ট পতি। সেটা একদিন হোক বা এক ঘণ্টার জন্য হোক। এটাই ইতিহাসের উপাদান।
তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করতে কথা বলবেন আর আমরা চুপ করে বসে থাকবো তা হবে না।
আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, তারেক রহমান ইতিহাসের বাইরে কোনো কথা বলেননি। তিনি বিভিন্ন উদ্ধৃতি দিয়ে কথা বলেছেন।
চোখ রাঙান কেন নোমান ভাই?
বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান ও শ্রমিক দলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আব্দুল্লাহ আল নোমানের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে বিএনপি চেয়ারপারসনের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক জাফরুল হাসান।
জাফরুল হাসান খালেদা জিয়ার উদ্দেশে বলেন, আপনাকে আমাদের ক্ষোভের কিছু কথা বলতে চাই। আপনাকে দুই মিনিট শুনতে হবে। বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে শ্রমিক দলের নেতা-কর্মীরা উপেক্ষিত হন, মন্ত্রীরা নেতা-কর্মীদের সময় দিতে চান না। কোনো নেতা-কর্মীর সমস্যার জন্য সুপারিশ করতে চান না। কেন?
খালেদা জিয়ার উপস্থিতিতে জাফরুল হাসান এমন বক্তব্য দিতে থাকলে মঞ্চে বসা বিএনপি’র ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল-নোমান রাগান্বিত হয়ে জাফরুলকে থামিয়ে দিতে চান। তখন জাফরুল হাসান নোমানকে উদ্দেশ করে বলে উঠেন, ‘চোখ রাঙান কেন নোমান ভাই? আমাকে বলতে দিন। এ সময় সভাস্থলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। তিনি বলেন, দল যখন ক্ষমতায় থাকে আমরা মন্ত্রীদের কাছে যেতে পারি না। কোনো সমস্যার কথা বলতে পারি না। মন্ত্রীরা কী চেয়ারম্যানদের ভয় পান?
কাউন্সিলে মারামারি
শ্রমিক দলের মহানগর কমিটির ষষ্ঠ কাউন্সিলে ‘মৃদু’ ধাক্কা-ধাক্কি ও চেয়ার ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। শ্রমিক দলের মহানগর কমিটিকে উত্তর ও দক্ষিণ দুইভাগে ভাগ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। কাউন্সিলরদের মতামতের ভিত্তিতে নেতারা যখন এ সিদ্ধান্ত নেবেন তখন হঠাত্ বাইরে থেকে ১০-১২টি ছেলে কিছুটা হৈচৈ করে মিলনায়তনে প্রবেশ করে। নেতাদের হস্তক্ষেপে তারা বের হয়ে যায়। এরপর তারাই বাইরে গিয়ে কয়েকটি প্লাস্টিকের চেয়ার ছোঁড়াছুঁড়ি ও ভাঙচুর করে। এ সময় শ্রমিক দলের নেতা-কর্মীরা তাদের নিবৃত্ত করে।
ভোটে কমিটি হবে শ্রমিক দলের
প্রার্থী বেশি থাকায় সিলেকশন প্রথায় না গিয়ে নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন নেতৃত্ব গঠন করবে মহানগর শ্রমিক দল। দিনভর কাউন্সিল হলেও মহানগর কমিটি গঠন করতে পারেননি নেতৃবৃন্দ।
দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক জাফরুল হাসান জানান, একাধিক প্রার্থী থাকায় গতকাল কমিটি গঠন করা যায়নি। আজ রবিবার তফসিল ঘোষণা করা হবে। সোমবার মনোনয়নপত্র গ্রহণ, যাচাই-বাছাই ও প্রত্যাহার করা হবে।