মঙ্গলময় শোভাযাত্রা
প্রকাশ : ১৩ এপ্রিল ২০১৪, ২০:৫৯
বাঙালির বর্ষবরণের আনন্দ আয়োজনে মিশে আছে মঙ্গল শোভাযাত্রার নাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে প্রতিবছরই পহেলা বৈশাখে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়। এই শোভাযাত্রায় বিভিন্ন ধরনের প্রতীকী শিল্পকর্ম বহন করা হয়। থাকে বাংলা সংস্কৃতির পরিচয়বাহী নানা প্রতীকী উপকরণ, রং-বেরঙের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিলিপি। এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল বক্তব্য হচ্ছে—‘জাগ্রত করো উদ্যত করো নির্ভয় করো হে’। ঐতিহ্যবাহী এই শোভাযাত্রার পটভূমি নিয়ে লিখেছেন নাজনীন শিমু
চৈত্রের প্রখর রোদের নিচে মুহূর্তের জন্য দাঁড়িয়ে থাকাও কঠিন, যেন শরীরটাই ঝলসে যাচ্ছে! তপ্ত রোদের তেজে যেন ঝলসে ওঠছে পিচ ঢালা পথ। হঠাত্ করেই উড়ে এসে জুড়ে বসা দমকা হাওয়ায় উড়ছে ধুলোবালি। কোথা থেকে নীলাকাশে ভেসে আসে মেঘের ভেলা। আর বিদ্যুতের আচমকা ডাক-চিত্কারে ভিজে যায় বাংলাদেশ! বাংলার এমন প্রাকৃতিক চিত্রই বলে দেয় আজ পহেলা বৈশাখ। বর্ষবরণ বাঙালি সংস্কৃতির গভীরে থাকা এক সার্বজনীন প্রাণের উত্সব। বাংলার কৃষক-বণিকসহ সব ধরনের পেশা-ধর্ম-বর্ণের মানুষ একাত্ম হওয়ার এই উত্সবে কালে কালে যোগ হচ্ছে নতুন নতুন মাত্রা। বর্ষবরণ উপলক্ষে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ এই নতুন মাত্রার উজ্জ্বল সংযোজন।
শুরুর কথা
বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা সর্বপ্রথম শুরু হয়েছিল যশোরে এবং এর মূল উদ্যোক্তা ছিলেন মাহবুব জামাল শামীম এবং হীরন্ময় চন্দ! শামীম এবং তার বন্ধুরা মিলে যশোরে চারুপীঠ নামের প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন। ১৯৮৫ সালের কথা, তত্কালীন রাজনৈতিক অস্থিরতার চাপাকলে বাংলা সংস্কৃতি হুমকির সম্মুখীন, সেই সময়ে তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বাংলার ঐতিহ্যবাহী সব নিদর্শনের পাপেট, মুখোশ ইত্যাদি নিয়ে তারা একটা শোভাযাত্রা করবেন। চারুপীঠ নামের প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করা সেই শোভাযাত্রাটিই ছিল বাংলাদেশের প্রথম নববর্ষের শোভাযাত্রা, এর নাম ছিল আনন্দ শোভাযাত্রা। এর আগে এই উপমহাদেশে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে শোভাযাত্রার কোনো ইতিহাস নেই। ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ নামে ১৯৮৯ সালে চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা ঢাকায় শোভাযাত্রা বের করে, পরে দ্বিতীয়বার উত্সবের সময় শিল্পী ইমদাদ হোসেন এর নামকরণ করেন ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। ১৯৯০ সালে বরিশাল ও ময়মনসিংহ শহরে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হয়। এর চার বছর পর ১৯৯৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁও শহরে ও শান্তিনিকেতনে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা হয়। গত কয়েক বছর ধরে নববর্ষ উপলক্ষে দেশব্যাপী মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা হচ্ছে।
১৯৮৯ সালে প্রথম আনন্দ শোভাযাত্রায় ছিল পাপেট, ঘোড়া, হাতি। ১৯৯০-এর আনন্দ শোভাযাত্রায়ও নানা ধরনের শিল্পকর্মের প্রতিকৃতি স্থান পায়। ১৯৯১ সালে চারুকলার শোভাযাত্রা জনপ্রিয়তায় নতুন মাত্রা লাভ করে। চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী, শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিল্পীদের উদ্যোগে হওয়া সেই শোভাযাত্রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্কালীন ভাইস চ্যান্সেলর, বিশিষ্ট লেখক, শিল্পীরাসহ সাধারণ নাগরিকরা অংশ নেয়। শোভাযাত্রায় স্থান পায় বিশালকায় হাতি, বাঘের প্রতিকৃতির কারুকর্ম। কৃত্রিম ঢাক আর অসংখ্য মুখোশখচিত প্ল্যাকর্ডসহ মিছিলটি নাচে গানে উত্ফুল্ল পরিবেশ সৃষ্টি করে। ১৯৯২ সালের আনন্দ শোভাযাত্রার সম্মুখে রং-বেরঙের পোশাক পরিহিত ছাত্র-ছাত্রীদের কাঁধে ছিল বিরাট আকারের কুমির। বাঁশ এবং বহু বর্ণের কাপড় দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল কুমিরটি। ১৯৯৩ সালে ‘১৪০০ সাল উদযাপন কমিটি’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের সামনে থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করে। শোভাযাত্রার আকর্ষণ ছিল বাঘ, হাতি, ময়ূর, ঘোড়া, বিভিন্ন ধরনের মুখোশ। তারই পরিক্রমায় এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রায় একটি বৃহত্ হাঁসকে প্রাধান্য দেওয়া হতে পারে। তবে হাঁসকে প্রাধান্য দেওয়া হলেও বরাবরের মতো বাংলা সংস্কৃতির সব কিছুই থাকছে এবারের আয়োজনে। সরাচিত্র, খেলনা, পুতুল, মা ও শিশু, বাঘ, হরিণ, মাছ, মাছের ঝাঁক, মুখোশ, হাত পাখা, শখের হাঁড়ি, বিড়াল, লক্ষ্মী পেঁচাসহ আরও নানা ধরনের শিল্পকর্ম থাকছে। ২৬তম এই আয়োজনে বাংলার লোক ঐতিহ্য তুলে ধরা ছাড়াও শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের শততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এবারের শোভাযাত্রাকে আরও বর্ণাঢ্য করে সাজানো হবে। এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার মূল বক্তব্য ‘জাগ্রত করো উদ্যত করো নির্ভয় করো হে’। এবার মঙ্গল শোভাযাত্রার দায়িত্বে রয়েছেন চারুকলা অনুষদের ১৩, ১৪ ও ১৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। বৈশাখে চারুকলা অনুষদের সামনের দেয়ালের বাইরের দিকটাও সাজবে নতুন সাজে। আবহমান বাংলার দৃশ্য ফুটে উঠবে তাতে। চারুকলা অনুষদের সাজ সাজ রবে বৈশাখে এক অন্য রূপ ফুটে উঠবে আজ। বাংলা নতুন বছরের প্রথম দিনে বাঙালি সাজবে তার আপন ঢঙে। আর দিনটি জুড়ে পুরো নগরীই হয়ে উঠবে উত্সবের নগরী।