বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জন

বাঙালির জীবনে এসেছে পরিবর্তনের হাওয়া। উত্সব উদযাপন থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত জীবনে এ পরিবর্তন স্পষ্টভাবে বিদ্যমান। এ পরিবর্তন নিয়ে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের মত। হয়েছে তর্ক-বিতর্ক। তারপরও এ পরিবর্তন হচ্ছে নিজ গতিতে। এমন অবস্থায় বাঙালির কর্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন প্রফেসর এমিরেটরস ড. আনিসুজ্জামান। সম্প্রতি ভারত সরকারের পদ্মভূষণ পুরস্কারে সম্মানিত আমাদের দুর্দিনের শিদারী ড. আনিসুজ্জামান। নতুন বাংলা বছর ১৪২১ শুরু হওয়ার আগেরদিন গতকাল রবিবার তার বাসায় ইত্তেফাকের পক্ষ থেকে সাক্ষাত্কার নিয়েছেন আশফাকুর রহমান— ইত্তেফাক:পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ। ৬০ বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হয়েছে। বাঙালির জীবনে কোন পরিবর্তনটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ার মতো বলে আপনি মনে করেন? আনিসুজ্জামান:গত ৬০ বছরের কথা যদি বলা হয়, তাহলে বলতেই হবে যে, জাতীয়তাবাদের ধারা পাকিস্তানের কাঠামো থেকে বাংলাদেশের মুক্তিকে সম্ভবপর করে তোলে। এটি সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। আরেকটি পরিবর্তন খুব চোখে পড়ার মতো তা হলো—এ দেশে নারীর অগ্রগতি। নানারকম নির্যাতনের ঘটনা সত্ত্বেও সামগ্রিকভাবে নারীর যে অগ্রগতি হয়েছে শিক্ষা ক্ষেত্রে, কর্মক্ষেত্রে—জনজীবনে তা যে কোনো মানদণ্ডেই অহংকার করার মতো। ইত্তেফাক:আবার বাঙালিত্বের সঙ্গে রাষ্ট্রেরও একটি সম্পর্ক রয়েছে। রাষ্ট্রের সঙ্গে বাঙালির এই সম্পর্ককে অনেকে দ্বান্দ্বিক বলে মনে করেন। বিষয়টি আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন? আনিসুজ্জামান:বাঙালিত্বের সঙ্গে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কেননা বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল। তবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরে আমাদের দেশের অন্যান্য নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী নিজেদের স্বাতন্ত্র্যকে সামনে তুলে ধরছে। সুতরাং বাংলাদেশকে এককভাবে বাঙালির রাষ্ট্র বলার উপায় নেই। সকল নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর সমান অধিকারের ভিত্তিতেই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিকাশ ঘটতে হবে। ইত্তেফাক:প্রতিনিয়ত বাঙালির জীবনাচরণ বদলে যাচ্ছে। হারিয়ে যাচ্ছে বাঙালির বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি। এ প্রবণতাকে আপনি কীভাবে দেখেন? আনিসুজ্জামান: বাঙালির জীবনাচরণ যে বদলে যাচ্ছে তা সময়ের স্বাভাবিক পরিবর্তনের ফলে। কোন না কোনভাবে সারাবিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ এখন সহজ হয়েছে। এর প্রভাব এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং জীবনাচরণের বদল ঘটবে। সাংস্কৃতিক জীবনাচরণের বদল ঘটবে। সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য কিছু যে হারিয়ে যাচ্ছে এ কথাও সত্য। যেমন—আমাদের দেশে একসময় যত রকম ধান হতো তার অনেকগুলোই এখন আর হয় না। এখন বিদেশি খাদ্যে নাগরিক বাঙালি অনেক অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। মেয়েরাও এখন ঐতিহ্যবাহী শাড়ির বিকল্প খুঁজে পাচ্ছে। আমি মনে করি, এসবই কালের পরিবর্তনের সঙ্গে অনিবার্য পরিবর্তন। ইত্তেফাক: বললে ভুল হবে না, এর ফলে বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতি অন্য সংস্কৃতির সাথে মিলে-মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। তৈরি হচ্ছে নতুন এক জীবন ব্যবস্থা... আনিসুজ্জামান:হ্যাঁ,এর ফলে বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির সঙ্গে অন্য সংস্কৃতির মিশ্রণ ঘটছে। তবে মনে রাখতে হবে, বিচ্ছিন্নভাবে বাস না করলে কোন জাতির পক্ষেই অন্য সংস্কৃতির সঙ্গে লেনদেন অস্বীকার করা সম্ভবপর হয় না। ইত্তেফাক:আবার অপর পক্ষে বাঙালি সংস্কৃতি রক্ষায় আবেগ প্রকাশে আমাদের কোনো মাত্রা থাকে না। এর কারণ কী বলে আপনি মনে করেন? আনিসুজ্জামান:বাঙালির সংস্কৃতি বিষয়ে আমরা মাত্রাতিরিক্ত আবেগ প্রকাশ করি। যতক্ষণ না পর্যন্ত এই আবেগ অন্য সংস্কৃতির অধিকারে হস্তক্ষেপ করছে ততক্ষণ এ আবেগ ক্ষতিকর নয়। আসলে সকল ক্ষেত্রেই আবেগ প্রকাশের ভারসাম্য থাকা দরকার। সংস্কৃতি সম্পর্কে আবেগের ক্ষেত্রে সে কথা সত্য। ইত্তেফাক:এমন সব প্রবণতার পরিপ্রেক্ষিতে কী বলা যায় বাঙালি নিজস্বতাকে বজায় রাখতে যথাযথভাবে এগিয়ে যাচ্ছে? আনিসুজ্জামান:বাঙালির নিজস্বতা বজায় রাখা বাঙালির কর্তব্য। তবে আমরা কেউ কূপমণ্ডুক হতে চাই না। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মিলন ঐতিহাসিকভাবেই অনিবার্য। সামনের দিকে এগুতে হলে নতুন কিছু গ্রহণ করতে হবে। পুরোনো কিছু আপনিই ঝরে পড়বে। ইত্তেফাক:সেক্ষেত্রে তো অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থার উন্নতির প্রয়োজন রয়েছে। কীভাবে এই উন্নতি সম্ভব বলে আপনি মনে করেন? আনিসুজ্জামান:যে কোনো অবস্থায় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উন্নতির প্রয়োজন। আমরা এখন একটি মিশ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে আছি। গণতন্ত্রের বিকাশের ক্ষেত্রও আমাদের বেশি নয়। এসব ক্ষেত্রে অনেক কিছু করার রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে ভালো বলতে পারবেন। ইত্তেফাক:এমন বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে আপনার কাছে কোনটি বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জন বলে মনে হয়? এই অর্জনকে আজকের দিনে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? আনিসুজ্জামান:বাঙালির শ্রেষ্ঠ অর্জন মনে হয় সাহিত্যে, সঙ্গীতে ও মরমীবাদে। চিত্রকলায় আমাদের অগ্রগতি অপেক্ষাকৃত সাম্প্রতিক অর্জন। যেখানে আমরা পিছিয়ে আছি বলে মনে হয় তা বিজ্ঞান ও গণিতের ক্ষেত্রে। এসব ক্ষেত্রে এগিয়ে যেতে যথাযথ প্রয়াসের প্রয়োজন। ইত্তেফাক:আপনার মূল্যবান সময় দেয়ার জন্য ধন্যবাদ। আপনাকে বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা। আনিসুজ্জামান:তোমাকেও ধন্যবাদ।