কবি অসীম সাহার মধুবাবুর পাঠশালা
প্রকাশ : ১৫ এপ্রিল ২০১৪, ১৯:৩৪
মাদারীপুর শহরে মধুবাবুর পাঠশালায় আমার হাতেখড়ি । বাবার হাত ধরেই সেখানে যাওয়া। আমাদের বাড়ির পেছনে কালিবাড়ির মাঠে আট চালা টিনের ঘর। চারদিক ফাঁকা। কোনো দেয়াল বা টিন দিয়ে ঘেরা নেই। বলতে গেলে টিনের ছাদওয়ালা মস্ত বড় একটি কক্ষে প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত ভাগ করা। শিক্ষকরা ক্লাশ নিচ্ছেন। বড় বড় কাঠের খাম দিয়ে আট চালা ঘরটি সাজানো। দেখতে দারুণ চমত্কার।
প্রথম পাঠশালাতে যাওয়ার সেই মধুর স্মৃতিটুকু আজও আধো আধো মনে পড়ে। আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো প্রধান শিক্ষক মধুসূদন চক্রবর্তীর কাছে। তাঁর চেহারাটা খুব বেশি মনে পড়ে। ধুতি পাঞ্জাবী পরা শ্যামলা বরণ প্রধান শিক্ষক ছিলেন রাশভারী।
স্কুলে খুব উচ্চস্বরে শিক্ষকরা পড়াতেন। যেহেতু কক্ষগুলোর মধ্যে কোনো ভাগ ছিলো না, সেহেতু একজনের উচ্চকণ্ঠ অন্যের পাঠদানকে বাধাগ্রস্ত করতো। কিন্তু বাড়ির পরিবেশ ছিলো সাংস্কৃতিক আবহ সমৃদ্ধ। বাবা ছিলেন কলেজের অধ্যাপক মা গৃহিনী হলেও খুব ভালো গান গাইতে পারতেন। সে সময়ে ভারত থেকে আমাদের বাড়িতে সাপ্তাহিক দেশ, দৈনিক স্টেটসম্যান, মাসিক নবকল্লোল, মাসিক সন্দেশ প্রভৃতি পত্রিকা আসতো। বাবা যেহেতু দর্শনের অধ্যাপক ছিলেন, সেহেতু অবসর পেলেই দর্শনের বই যেমন পড়তেন, তেমনি অন্যান্য ভারি ভারি বিষয়ের বইও পড়তেন। তিনটি ভাষায় তাঁর অসামান্য দক্ষতা ছিলো- বাংলা, ্ইংরেজি, সংস্কৃত। মা অল্প শিক্ষিত হলেও দুপুরের পর বারান্দায় মাদুর পেতে শুয়ে উপন্যাস পড়া তাঁর নিয়মিত অভ্যেস ছিলো। বড় বোন গান গাইতেন। সেই পরিবেশে পড়াশোনার পরিবেশ শুধু অনুকূল ছিলো না, ছিলো অনেক বেশি ব্যাপ্তিসম্পন্ন।
তবে মধুসূদন স্যারের কথাই বারবার মনে পড়ে, গম্ভীর, সিরিয়াস এই শিক্ষক খুব ভালো পড়াতেন। কিন্তু কেউ অপরাধ করলে বেত দিয়ে খুব পেটাতেন। পাঠদান এবং বেতের প্রহারের কারণে শিক্ষকের কথা মনে হলেই তাঁর মুখটিই স্মৃতির ক্যানভাসে ভেসে ওঠে।
কালিবাড়ির স্কুলের সামনে কিছুটা প্রশস্ত মাঠ ছিলো। সাধারণত পাড়ার ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে খেলা করতাম। আমাদের বাড়ির অবস্থান ছিল শহরের কেন্দ্রস্থলে তার সামনেও বিস্তর খোলা জায়গা ছিলো। সেখানেও আমরা সকলে মিলে কানামাছি, গোল্লাছুট কিংবা দাড়িয়াবান্ধা খেলতাম আর অনাবিল আনন্দে মেতে উঠতাম। যেহেতু তখন আমি বয়সের দিক থেকে সবচেয়ে ছোট ছিলাম বেশির ভাগ সময় বসে বা দাঁড়িয়ে ওদের খেলাই দেখতে হতো । আর ওর মধ্যেই আমার আনন্দের উপাদান খুঁজে নিতে হতো।
স্কুল যে আমার খুব ভালো লাগতো তা নয় প্রকৃতির সান্নিধ্যে থাকতেই বেশি ভালো লাগত। কিন্তু যখন আমি পাঠশালায় ভর্তি হই,তখন বাবা- মা’র চাপ মানে যেটা বোঝায়, তা টেরই পেতাম না। বই খাতা নিয়ে বাবা অথবা বড় বোনের হাত ধরে নির্বাক হয়েই স্কুলে যেতাম
আমার পাশের বাড়ির অনাদি, জিল্লু, সোহরাব, শশাঙ্ক ও খোকন এদের কথা মাঝে মাঝে মনে পড়ে। বিশেষ করে অনাদির কথা। হঠাত্ করে একরাতে অনাদির বাবা অনাদিকে নিয়ে ভারতে চলে গেলে আমার ছোট বুকে কষ্টের পাথর অনেকদিন পর্যন্ত চেপে ছিলো। অনেক বছর পরে যখন আমি কলেজে পড়ি, তখন ভারত থেকে আমার মামা অনাদির সন্ধান দিলে আমি তার ঠিকানায় চিঠি লিখেও কোনো উত্তর পাইনি। এরপর আজ পর্যন্ত তার আর কোনো সন্ধান জানি না। খোকন ভারতীয় সেনাবাহিনীতে গিয়েছিলো, জিল্লু সরকারি চাকরি থেকে অবসরে, সোহরাব বাংলাদেশ রেলওয়ে থেকে অবসরে গিয়ে এখন ঢাকায় বসবাস করছে।
নাগরিক জীবনের বহুমাত্রিক ব্যস্ততার মধ্যে ছেলেবেলার সেইসব খেলার সাথীদের সঙ্গে এখন আর আগের মতো যোগাযোগ কিংবা খোঁজ-খবর রাখা সম্ভব হয়ে ওঠে না। মনে হয় হাজার বছর ধরে কারো কারো সঙ্গে দেখাই হয় না। চলার পথে অথবা কোনো অনুষ্ঠানে-পার্বণে কদাচিত্ কখনও কারো সঙ্গে ক্ষণিকের দেখা হলেই মনটা নৈঃশব্দে ডুকরে কেঁদে ওঠে।শৈশব-কৌশরের সেইসব স্মৃতি আমার আমৃত মনে থাকবে।