তিনিও মুক্তিযোদ্ধা
প্রকাশ : ১৫ এপ্রিল ২০১৪, ১৯:৫৫
ভাবনাটা মাঝে মাঝে ফাহিমকে খুবই অস্থির করে তোলে। বিষয়টা কাউকে বলা যায় না। বললেও কেউ বিশ্বাস করবে না। ফাহিম নিজের মনটাকেও বিশ্বাস করাতে পারে না কিন্তু বাস্তব চিরটাকালই সত্য। যা উপেক্ষা করা যায় না। জটিল রহস্য উদঘাটন করা যেমন কঠিন, তাদের রহস্য উদঘাটন করাটা আরো বেশি কঠিন। যদিও এখন আর ভাবতে ইচ্ছে করে না কিন্তু না ভেবে থাকতেও পারে না।
ফাহিম মাকে একদিন জিজ্ঞেস করে জানতে চাইলো, তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন, এ ব্যাপারে আমাকে আর কখনো কোনো প্রশ্ন করো না। আর নিজেও এক ফোঁটা চিন্তা করো না। কারণ এর কোনো কূল-কিনারা পাবে না। তোমার বাবাও বিষয়টা নিয়ে অনেক ভেবেছেন। অনেকের কাছে গিয়েছেন। কারো কাছ থেকেই সঠিক কোনো তথ্য বের করতে পারেননি। মৃত্যুর আগে তিনি আমাকে দিব্যি দিয়ে বলেছিলেন— আমার পরে দায়িত্বটা পড়বে ফাহিমের ওপর। তখন তাকে সাফ জানিয়ে দেবে। তাই তোমাকে জানিয়ে দিচ্ছি। ব্যাপারটা মাথায় রেখো।
প্রতি মাসের তিন তারিখ পোস্ট অফিসে যায় ফাহিম। এবার গেলে পোস্ট মাস্টার তাকে জিজ্ঞেস করলেন, শোনো ফাহিম, তোমাদের কেউ কি ঢাকায় চাকরি করেন? অথবা ধনী কোনো আত্মীয়-স্বজন আছে?
ফাহিম প্রশ্নটা সঠিকভাবে বুঝে উঠতে পারেনি। তাই বোকা বোকা চোখে ওনার দিকে তাকায়।
আমি কি বলছি? তা কি তুমি বুঝতে পারোনি?
ফাহিম মনে মনে ভাবে, বুঝতে কি আর বাকি আছে? এই প্রশ্নটা তো তারও প্রশ্ন। মনে হয় বাবারও ছিল। তিনি জানতে পারলে নিশ্চয় মাকে বলে যেতেন। বরং তিনি নিষেধ করে গেছেন। ফাহিমকে নীরব ও ম্লান হয়ে থাকা মুখটার দিকে তাকিয়ে পোস্ট মাস্টার আবার বললেন, প্রতিমাসেই তোমাদের নামে টাকা পাঠাচ্ছেন। যিনি পাঠাচ্ছেন, তিনি তোমাদের কি হন?
ব্যাপারটা গোপন না রেখে, ফাহিম সরাসরি বলল, আমি ঠিক বলতে পারব না।
বাবা, তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ো। তোমার কাছ থেকে এই ধরনের উত্তর আমি আশা করিনি।
স্যার, এই প্রশ্নটা আর কোনোদিন করবেন না।
ঠিক আছে। যাও। তবে এই বিষয়ে জানতে চাওয়াটা আমার ঠিক হয়নি। মনে হয় ভুল করে ফেলেছি।
মুজিবুল হক সাহেব একজন বৃদ্ধ মানুষ। তবে বয়সের তুলনায় এখনো একজন শক্ত-সামর্থ্য মানুষ। মুখটা দাড়ি-গোঁফে একাকার হয়ে আছে, যেন মুখে এসবের চাষ করছেন তিনি। তবে মাথার চুল, দাড়ি, গোঁফ সব সাদা পাটের মতো ধবধবে। তার চোখে পাওয়ারফুল চশমা। কাঁধে ঝুলানো ব্যাগ, হাতে একটা লাঠি যা চলার পথে, সময়-অসময়ে তাকে সাহায্য করে।
তিনি ট্রেন থেকে কাওরাইদ স্টেশনে নেমে একটা রিকশায় ওঠেন। মাখল প্রাইমারি ইস্কুলের কাছাকাছি গিয়ে রিকশা থেকে নামলেন। এমন সময় একটা বাচ্চা ইস্কুলে যাচ্ছে। তার কাঁধে ঝুলানো ইস্কুল ব্যাগ, যদিও পরনে ইস্কুল ড্রেস নেই। বাচ্চাটি মুজিবুল হক সাহেবের দিকে রহস্যপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায়। বাচ্চাটির ধারণা লোকটা একজন পাগল মানুষ।
এবার মুজিবুল হক সাহেব বললেন, এই ছেলে! তুমি কোন ক্লাসে পড়ো? কোন ইস্কুলে পড়ো?
ছেলেটি ডান হাত উঁচিয়ে বলল, এই হেথা।
হেথা যে কোথায়? তা আর জানার প্রয়োজন বোধ করেননি। তিনি আবার বললেন, মুক্তিযোদ্ধা শেখ আবদুর রহমানের বাড়ি কোনটা তাকে কি তুমি বলতে পারো?
আমাদের গ্রামে শেখ আবদুর রহমান নামে কোনো লোক নেই। বলেই ছেলেটি চলে গেল।
মুজিবুল হক সাহেব ভাবলেন, সত্যি তার ভুল হয়ে গেল। একজন বয়স্ক লোকের কাছে জিজ্ঞেস করাটা উচিত ছিল। তিনি এদিক-ওদিক তাকিয়ে একজন বয়স্ক লোক খুঁজতে লাগলেন। খানিকটা এগোতেই দেখলেন রাস্তার ডানপার্শ্বে আমগাছটার নিচে একজন বৃদ্ধ লোক বসে আছেন। লোকটা মাটিতে বসা। তার মাথাটা যেন দুই হাঁটুর মাঝখানে ঝুলে আছে।
তিনি একদম কাছে গিয়ে বললেন, ভাইজান আমি একটা ঠিকানা জানতে চাই।
লোকটা অনেক চেষ্টা করে মাথাটা ওপরের দিকে তুললেন এবং মিটমিট করে তাকালেন কিন্তু কিছু বললেন না।
মুক্তিযোদ্ধা শেখ আবদুর রহমানের বাড়িটা কোনিদকে?
বৃদ্ধের দু’চোখের পাতা পানিতে ভিজে ওঠে। অনেক কষ্টে ফিসফিস করে বললেন, যুদ্ধের সময় ওই যে গেল আর তো ফিরে এল না। যাক, আপনি ওই রাস্তা ধরে যান। পুকুরের পাড়ের যে বাড়িটা ওটাই শেখ আবদুর রহমানের বাড়ি। তবে তাঁর ছেলে আতাউর রহমান সেও মাস তিনেক আগে মারা গেছেন। তার ছেলে ফাহিম খুবই মেধাবী ছাত্র। শুনেছি ঢাকায় পড়াশোনা করে। ছুটি হলেই বাড়িতে চলে আসে। ও খুবই ভালো ছেলে।
আতাউর রহমানের মৃত্যুর সংবাদটা সয়ে নিতে খুবই কষ্ট হচ্ছে মুজিবুল হক সাহেবের। শেখ আবদুর রহমানের আদরের একমাত্র ছেলেকে দেখার বড় ইচ্ছে ছিল তার কিন্তু তা আর হয়ে উঠল না। তিনি বুকভরা আশা নিয়ে এসেছিলেন। অনেক ভালো খবর নিয়ে ফিরে যাবেন। কিন্তু প্রথমেই দুঃসংবাদ শুনতে হল। তবে মৃত্যুর ওপর তো কারো হাত নেই। এই ভেবে মনটাকে একটু শান্ত করে হাঁটা ধরলেন। হাঁটতে হাঁটতে পুকুরটার পাড়ে গিয়ে দাঁড়ালেন। যেন কোথাও কেউ নেই ঠিক এমনই একটা নির্জনতা। তিনি চারদিকেই ভালো করে তাকান। দৃষ্টির সীমানায় কাউকেই দেখা যাচ্ছে না। ব্যাপার কি? সরাসরি বাড়িতে গিয়ে ঢোকাটাও ঠিক হবে না। তিনি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন অনেকক্ষণ। হঠাত্ বড় সড়কটার দিকে চোখ যেতেই দেখেন, একটা ছেলে এদিকে আসছে। তার পরমে শার্ট-প্যান্ট। কাঁধে ঝুলানো ব্যাগ। বেশ স্মার্ট। ছাত্র বলে মনে হচ্ছে। তিনি ওদিকেই তাকিয়ে থাকেন। ছেলেটি একদম কাছে এসে তাঁকে সালাম দেয়।
মুজিবুল হক সাহেবের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে ফাহিম। এমন বেশ ধরে চলার লোক এদেশে নাই বললেই চলে। তাকে কোথাও কখনো দেখেছে বলেও মনে হয়নি তার।
মুজিবুল হক সাহেব হতাশামিশ্রিত গলায় বললেন, তোমার নাম ফাহিম। কথাটা ঠিক বলিনি।
ফাহিম রীতিমতো চমকে উঠে বলল- জ্বী। বেয়াদবি মাফ করবেন। আপনাকে কিন্তু চিনতে পারিনি।
আমাকে তুমি কেন? তোমার এই জেলার একজন লোকও চিনবে না। আমি তোমার দাদু মুক্তিযোদ্ধা শেখ আবদুর রহমানের বন্ধু। তাঁকে কি তুমি দেখেছ?
জ্বী না। তবে বাবা-মায়ের মুখে উনার অনেক গল্প শুনেছি। তিনি নাকি ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন। নয় মাস যুদ্ধের পর দেশটা স্বাধীন হল কিন্তু তিনি আর ফিরে এলেন না। সময় অসময়ে বাবা খুবই কাঁদতেন। তিনিও কয়েক মাস আগে আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেলেন।
শোকটা যেন মুজিবুল হক সাহেব কিছুতেই ধরে রাখতে পারছেন না। খুবই কষ্ট হচ্ছে তাঁর। বুকটা যেন ফেটে যেতে চাচ্ছে। চোখে পানি অনেক কষ্টে চেপে রাখে। যাকে একবার দেখার জন্য এতো কষ্ট করে ছুটে এসেছিলেন সেই চলে গেল। মুজিবুল হক সাহেব নিজেকে বড় অপরাধী ভাবেন। অনেকবারই এখানে আসার পদক্ষেপ নিয়েছেন তিনি কিন্তু নানা কারণে আসা হয়নি। প্রসঙ্গটা পাল্টাতে গিয়ে তিনি বললেন, তোমার দাদু যুদ্ধকালীন সময় পুরোটাই আমার সঙ্গে ছিলেন। দু’জন এক ক্যাম্পে থেকেছি। একত্রে ট্রেনিং নিয়েছি। অস্ত্র হাতে দেশে প্রবেশ করেছি। নানা জায়গায় পাকসেনাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছি। একটা যুদ্ধে বন্ধুটি পাকসেনাদের গুলিতে গুরুতরভাবে আহত হয়ে পড়েন। ক্ষতস্থানে নামমাত্র ওষুধ ও ব্যান্ডেজ বাঁধা ছাড়া ভালো চিকিত্সার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তবু দিন পাঁচেক বেঁচে ছিল। মৃত্যুর সময় আমার কোলে মাথা রেখে বলেছিলেন, আমার স্ত্রী বেঁচে নেই। আমার একমাত্র ছেলে আতাউর রহমান। জানি না কি হালে আছে? আমার পরিবারিক অবস্থাও তেমন একটা ভালো নয়। খুব কষ্টে সংসার চলে। নিজ মনে করে খোঁজ-খবর নিও। পারলে কিছুটা সাহায্য করো। তোমার তো টাকা-পয়সা, ধন-সম্পদের কোনো অভাব নেই। তখন তাকে আমি কথা দিয়েছিলাম। দেশটা স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই আমি আমার কথা রক্ষা করে আসছি।
ক্রমেই আবেগঘন একটা পরিবেশের সৃষ্টি হয়। অতি আবেগে দু’জনের একজনও অনেকক্ষণ ধরে কথা বলেনি। এই বিশাল নীরবতা ভেঙে ফাহিম বলল, দাদু আপনিই কি আমাদের জন্য প্রতিমাসে টাকা পাঠাতেন?
সে আর তেমন কি? নামমাত্র কিছু টাকা। কতটুকু তোমাদের কাজে লেগেছে তা জানি না।
স্বাধীনতার আজ তেতাল্লিশ বছর চলল। এর মাঝে আমার খোঁজ নিতে আপনি একবারও আসতে পারলেন না। আর আপনি যদি টাকা না পাঠাতেন, আমি আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারতাম না। ছোটবোন ঝর্ণা কলেজে পড়তে পারত না।
মুজিবুল হক সাহেব আনন্দমিশ্রিত গলায় বললেন, আমার টাকা পাঠানো সার্থক হয়েছে জেনে নিজেকেও একজন সার্থক মুক্তিযোদ্ধা বলে মনে করছি।