অমঙ্গলের বিরুদ্ধে নির্ভীক পথচলার অঙ্গীকার

মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নেয়া এখন নববর্ষ উদযাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে পড়েছে। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। রঙ-বেরঙের মুখোশ, শোলার পাখি, পেঁচা, প্রজাপতি, খরগোশ ও টেপা পুতুল, ঢাক-ঢোল-বাঁশি, লাঠি-বর্শা, তীর-ধনুক নিয়ে চারুকলা ইনস্টিটিউটের সামনের সড়কে সবাই জমায়েত হয়েছিলেন। উদ্দেশ্য একটাই— মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নেয়া। ছেলেদের পরনে নানা রঙের পাঞ্জাবি-ফতুয়া আর নারীদের লাল পেড়ে সাদা শাড়ি, শিশু-কিশোরদের রঙ-বেরঙের পাঞ্জাবিতে বর্ণিল হয়ে ওঠে চারুকলার আশপাশ এলাকা। সাম্প্রদায়িক শক্তি এবং অশুভকে বিতাড়নের অঙ্গীকারে বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি বহন করা হয় শোভাযাত্রার অগ্রভাবে। ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠান শেষে শোভাযাত্রায় যোগ দেন হাজারো মানুষ। বাঘের মুখোশ, হাতপাখা, একতারা-দোতারা হাতে নিয়ে নানা বয়স ও শ্রেণী-পেশার মানুষ অংশ নেয় এ মঙ্গলযাত্রায়। অশুভ শক্তিকে বিনাশ করে বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ ও সম্প্রীতির আবাস ভূমি হিসাবে গড়ে তুলবার প্রত্যয় ছিল সবার কণ্ঠে। দেশীয় বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রের পাশাপাশি ভুভুজেলার আওয়াজে গর্জে ওঠে শাহবাগ। ‘জাগ্রত করো, উদ্যত করো, নির্ভয় করো হে’- এই প্রতিপাদ্য নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ আয়োজন করে মঙ্গল শোভাযাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক সকাল সোয়া নয়টায় চারুকলা অনুষদ প্রাঙ্গণে এ শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন। এ সময় চারুকলা ইনস্টিটিউটের ডিন আবুল বারাক আলভীসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন। এবার নববর্ষ এসেছে ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। জাগ্রত চিত্তে সকল অমঙ্গলের বিরুদ্ধে নির্ভীক পথচলার অঙ্গীকার নির্যাস হয়ে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বব্যাপী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের মঙ্গল শোভাযাত্রার পুরোভাগেই ছিল সেসব অনুষঙ্গ। ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণী-পেশা নির্বিশেষে সববয়সী মানুষ এতে অংশ নিয়ে প্রাণের উত্সবে মেতে উঠেন এই শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের শততম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এবারের শোভাযাত্রাজুড়ে ছিল তার স্মৃতির উদ্দেশে নানা অনুষঙ্গ। শোভাযাত্রার শুরুতেই ছিল মঙ্গলের প্রতীক লক্ষ্মীপেঁচা। এর পাশেই সুখ-সমৃদ্ধির বার্তাবহ ‘মা ও শিশু’ শীর্ষক শিল্প-কাঠামোটি। ১৭ ফুট উচ্চতার এই শিল্পকর্মে মায়ের এক হাতের বন্ধনে শিশু আর অপর হাতে কলসি। পবিত্রতা ও সরলতার প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে হরিণ শাবকের কাঠামো। সমৃদ্ধির বার্তা বয়ে এগিয়ে চলা শোভাযাত্রায় বিশালাকৃতি মা মাছের পাশে দেখা গিয়েছে সন্তানতুল্য দুইটি ছোট মাছকে। লোকজ গল্প কিংবা রূপকথার আবহ নিয়ে উদ্ভাসিত হয়ে বাঘের পিঠে চড়ে বসা গাজী। গাঢ় হলুদ রংয়ের ভেতর ডোরাকাটা কালো রং দিয়ে সাজানো বাঘটি। আর গাজীর পোশাকে আছে নীল, সাদা, হলুদ ও লাল রংয়ের আবহ। আরো ছিল শখের হাঁড়ি, বিশালাকৃতির দুইটি বাঘের মুখোশ, হাঁস, সৌন্দর্যের প্রতীক ময়ূর। এছাড়াও মুখোশের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয় রাজা-রানী, উজির-নাজির, বাঘ, পেঁচা, টেপা পুতুলসহ আরো কত কিছু! এসব কিছুই প্রদর্শন করা হয় শোভাযাত্রায়। চারুকলার বকুলতলা থেকে শুরু হয়ে রূপসী বাংলা হোটেলের মোড় ঘুরে টিএসসি চত্বর হয়ে চারুকলায় এসে শেষ হয় বর্ণিল এ আনন্দযাত্রা।