মুক্তাগাছা ও ভালুকায় শোকের মাতম

ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছা ও ভালুকায় সেন্ট মার্টিনে সাগরে নেমে মৃত্যুমুখে পতিত নোমান ও বাপ্পীর বাড়িতে এখন শোকের মাতম চলছে। বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন কান্না ছাড়া আর সব ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন। ভাগ্যের অসহায় পরিণতির সামনে নিরুপায় স্বজনের আজ আর কিছুই করার নেই। সব শেষ, প্রকৃতি তাদের সব আশা-প্রত্যাশা নিমেষেই শেষ করে দিয়েছে। আজ তাই কান্নাই ভরসা তাদের। মুক্তাগাছা (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা জানান, লাশ হয়ে ফেরা শাহরিয়ার ইসলাম নোমানের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। মুক্তাগাছা শহরের লক্ষ্মীখোলায় গিয়ে দেখা যায় নোমানের বাড়িতে হূদয় বিদারক দৃশ্য। নোমান মুক্তাগাছা উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলামের ছেলে। পরিবারে দুই সন্তানের মধ্যে বড় নোমান ছিল মেধাবী ছাত্র। আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হন নোমান। ফাইনাল পরীক্ষা শেষে রবিবার বন্ধুদের সাথে শাহরিয়ার ইসলাম নোমান সেন্ট মার্টিনে বেড়াতে যান। স্বজনরা কয়েকদিন আগের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘সেন্ট মার্টিনে শামুক-ঝিনুকের তৈরি সুন্দর সুন্দর মালা আর অলংকার পাওয়া যায়। তোদের জন্য সুন্দর দেখে ঝিনুকের মালা নিয়ে আসবো। চিন্তা করিস না। আমরা অনেক বন্ধুরা মিলে বেড়াতে এসেছি। আব্বু-আম্মুকে দোয়া করতে বলিস।’ এভাবেই ছোট বোনের সাথে মোবাইল ফোনে কথা বলেছিল সেন্ট মার্টিনে বেড়াতে গিয়ে শাহরিয়ার ইসলাম নোমান। ছোট বোন নুসরাত জাহান নিশির সাথে নোমানের কথা হয় সাগরে নামার কিছু সময় আগে। ছোট বোনের দাবি ছিল, ভাইয়্যা তোমার মোবাইল ফোন যেন খোলা থাকে। বোনকে শান্ত্বনা দিয়ে নোমান বলে, চিন্তা করিস না। তোর জন্য ঝিনুকের মালা আর অন্য গয়না নিয়ে আসবো। সেখানে যাবার আগে বাবা নজরুল ইসলামকে বলেছিল, ‘আব্বু তোমার কাছে আর টাকা চাব না। এবারই তোমার কাছ থেকে শেষবারের জন্য টাকা চেয়ে নিচ্ছি। লেখাপড়া শেষ করেছি। চাকরি করে তোমার সব টাকা শোধ করে দেবো। তুমি টাকা দিলে বন্ধুদের সাথে শেষবারের জন্য সেন্ট মার্টিনে যাব। এভাবেই কথাগুলো বললেন সেন্ট মার্টিনে সাগরে লাশ হওয়া নোমানের বাবা নজরুল ইসলাম। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে তিনি এখন শোকে স্তব্ধ। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমার ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভেবে চাকরির উপার্জনের সব টাকা তার পেছনেই খরচ করেছি। সেন্ট মার্টিনে যাওয়ার আগেরদিন রবিবার ডাচ-বাংলা মোবাইল ব্যাংকিং-এর মাধ্যমে ৮ হাজার টাকা পাঠাই ছেলের কাছে। ছোট বোন নিশি একমাত্র ভাইকে হারিয়ে শোকে পাথর হয়ে গেছে। মা শামসুননাহার সবার দিকে শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। কারো সাথে কথা বলছেন না। গতকাল বুধবার দুপুরে শাহরিয়ার ইসলাম নোমানের বাড়ি মুক্তাগাছা শহরের লক্ষ্মীখোলায় গিয়ে দেখা যায় হূদয় বিধারক দৃশ্য। গতকাল বুধবার লাশ হিসাবে খোঁজ পাওয়া গোলাম রহিম বাপ্পীর বাড়ি ময়মনসিংহের ভালুকায়। বুধবার বাপ্পীর বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, ভালুকা উপজেলার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাড়িটিতে কান্নার রোল চলছে। অবসরপ্রাপ্ত উপজেলা পরিসংখ্যান অফিসার শামছুদ্দিন ও শামছুন্নাহার আহমেদ দম্পতির ৫ ছেলে-মেয়ের মাঝে বাপ্পী চতুর্থ। পরিবারের সবার আদরের এ সন্তানের না ফেরার দেশে চলে যাবার সংবাদ তারা কোনভাবেই মেনে নিতে পারছেন না। বাবা-মায়ের আর্তনাদ ‘আমার সোনার ধন বাপ্পীকে এনে দাও। আর কিছুই চাই না। আমার বুকের মানিকরে আমার কাছে ফিরিয়ে দাও।’ বাপ্পীর পরিবার ভালুকায় থাকলেও তার লাশ যাবে ত্রিশাল উপজেলার কানহারি ইউনিয়নের সরস্বতী কান্দায় নিজ গ্রামে। সেখানেই তাকে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করা হবে বলে জানিয়েছে পারিবারিক সূত্র। স্বজনরা জানিয়েছেন, ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর গত ১০ এপ্রিল বাড়িতে আসে বাপ্পী। সবার সাথে দেখা করে বন্ধুদের নিয়ে সেন্টমার্টিন বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে শনিবার সকালে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। সেখানে গিয়ে মোবাইলে বাবা-মাকে এসএমএস করে নববর্ষের শুভেচ্ছাও জানায়। কিন্তু এই শুভেচ্ছাই তার জীবনের শেষ শুভেচ্ছা তা কেউ বুঝতে পারেনি। টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহ মুজাহিদ উদ্দিন বলেন, বুধবার সকালে আরো দুইজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। লাশ কক্সবাজার মর্গে প্রেরণ করা হয়েছে। ওখান থেকে তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে । শিক্ষা সফর ও পিকনিকে কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ সেন্ট মার্টিন সমুদ্র সৈকতের দুর্ঘটনায় আহছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর মৃত্যু ও নিখোঁজ হওয়ায় শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। গতকাল দুপুরে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. এম সফিউল্লাহসহ অন্য শিক্ষকদের সাথে দেখা করে সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও শিক্ষকদের সাথে আলোচনাকালে উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, এখন থেকে কোনো শিক্ষার্থী বা দলকে এধরনের শিক্ষা সফরে বা পিকনিকে বা পরিদর্শনে যাবার পূর্বে স্ব স্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানের অনুমতি গ্রহণ করতে হবে। সফরের স্থান সম্পর্কে ভালোভাবে জানা ও সফররত শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। সফর সম্পর্কে স্থানীয় প্রশাসনকে আগে থেকে জানাতে হবে। এ বিষয়ে শীঘ্রই শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে একটি নির্দেশনা জারি করা হবে। শিক্ষামন্ত্রী এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেন। তিনি নিহত ও নিখোঁজ শিক্ষার্থীদের শোক- সন্তপ্ত পরিবারের সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সহপাঠীদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জ্ঞাপন করেন।