‘সব রোগীর মৃত্যুর জন্য যেন চিকিত্সকই দায়ী’

চিকিত্সাধীন কোন রোগীর মৃত্যু হলেই স্বজনেরা অভিযোগ করেন, ভুল চিকিত্সা কিংবা চিকিত্সকের অবহেলায় রোগীর মৃত্যু হয়েছে। স্বজনেরা বলে থাকেন, এই মৃত্যুর জন্য চিকিত্সকই দায়ী। এরপর শুরু হয় হাসপাতালে ভাঙচুর, চিকিত্সকের ওপর হামলা-মারধর। চিকিত্সক পুরুষ কি নারী সেটা তখন মুখ্য বিষয় নয়। মারটাই প্রধান। শুধু দেশের প্রত্যন্ত এলাকার হাসপাতালেই নয়, খোদ রাজধানীর সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালেও এই ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটে থাকে। এ ব্যাপারে দেশের বিভিন্ন পর্যায়ের চিকিত্সকের সঙ্গে আলাপকালে তারা বলেন, চিকিত্সার সময় রোগীর অনেক কারণে মৃত্যু হতে পারে। তার মানে এই নয় যে, চিকিত্সক রোগীকে মেরে ফেলছেন। যে কোন চিকিত্সকের কাছে রোগী আসলে চিকিত্সক আগে ভাবেন, তাকে কিভাবে সুস্থ করে তোলা যায়। একই সঙ্গে তারা এও বলেন, চিকিত্সক-নার্সের ভুলে কিংবা অবহেলায়ও রোগীর মৃত্যু হতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের দল বিষয়টি তদন্ত করে দেখে তারপর মতামত দিবেন। কারণ একজন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকই বলতে পারেন, ওই চিকিত্সক ভুল করেছেন কিনা। তদন্তে যদি বেরিয়ে আসে- চিকিত্সক বা নার্সের ভুলে কিংবা অবহলোয় রোগীর মৃত্যু হয়েছে তাহলে তার সর্বোচ্চ শাস্তি হওয়া উচিত। বিদেশের হাসপাতালেও রোগী মারা যায়; কিন্তু সেখানে চিকিত্সকদের ওপর হামলা ও ভাঙচুর হয় না। অথচ দেশের চিত্রটা এমন দাঁড়িয়েছে, সব রোগীর মৃত্যুর জন্য যেন চিকিত্সকই দায়ী। চিকিত্সকদের জাতীয় সংগঠন বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) এবং প্রাইভেট হসপিটাল এন্ড ক্লিনিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের কর্মকর্তারাও দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছেন। তারা বলেন, দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই রোগীর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে চিকিত্সক-নার্সের উপর হামলা কোনভাবেই কাম্য নয়। কারণ এখন সারাদেশের চিকিত্সকরা একটা আতঙ্ক নিয়ে রোগী দেখেন। এরকম আতঙ্ক নিয়ে কখনই ভাল চিকিত্সা দেয়া সম্ভব নয়। চিকিত্সকরা হামলার শিকার হলে তারা চিকিত্সা সেবা দেয়ার উত্সাহ হারিয়ে ফেলবেন। পরিণামে রোগীরাই চরম দুর্ভোগের শিকার হবেন। একের পর এক হামলার ঘটনায় চিকিত্সকদের মধ্যে চরম হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। মুমূর্ষু রোগী হাসপাতালে আসলে ডাক্তার চিকিত্সা দিতে ভয় পাচ্ছেন। চিকিত্সকরা কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তারা বলেছেন, যদি তা না করা হয়, তাহলে দেশব্যাপী চিকিত্সা সেবা দেয়া থেকে বিরত থাকা ছাড়া আর কোন বিকল্প থাকবে না। সর্বশেষ গত রবিবার রাজধানীর ডায়াবেটিক হাসপাতালে এক রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় নারী চিকিত্সকসহ চারজন চিকিত্সকের ওপর হামলা ও হাসপাতাল ভাঙচুর করা হয়। প্রতিবাদে চিকিত্সা সেবা বন্ধ করে দেন চিকিত্সকরা। স্বাস্থ্য মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. দীন মোহাম্মদ নূরুল হকসহ বারডেমের শীর্ষ কর্মকর্তাদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করার ঘোষণা দিলে ডাক্তাররা গতকাল ধর্মঘট স্থগিত করেন। বিএমএ সূত্রে জানা যায়, গত এক বছরে চিকিত্সকদের উপর কয়েকশ হামলার ঘটনা ঘটেছে। এরমধ্যে ৫০টি ঘটনা গুরুতর। আহত হয়েছেন শতাধিক চিকিত্সক ও নার্স। এ সময় অনেক মূল্যবান যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়েছে। বিএমএর সভাপতি অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হাসান নিজেদের অসহায়ত্বের চিত্র তুলে ধরে বলেন, চিকিত্সকদের নিরাপত্তায় উচ্চ আদালতে আশ্রয় নিতে হয়েছে। বিএমএর পক্ষ থেকে সম্প্রতি হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হলে সর্বোচ্চ আদালত বিষয়টি আমলে নিয়ে স্বাস্থ্য সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব ও আইজিপিকে দুই মাসের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিতে বলেছে। হাইকোর্ট রোগী মারা যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিত্সকদের ওপর হামলা কেন বেআইনি হবে না ও হামলাকারীকে আইনের আওতায় কেন আনা হবে না তাও জানতে চান। স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, দেশব্যাপী কথায় কথায় চিকিত্সকদের উপর হামলা কোন অবস্থায় মেনে নেয়া হবে না। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। চিকিত্সক ও রোগী সুরক্ষায় দ্রুত আইন হচ্ছে। এজন্য কার্যক্রম চলছে। একটি ঘটনা নিয়ে পুরো হাসপাতালের চিকিত্সাসেবা বন্ধ হয়ে যাওয়া মেনে নেয়া হবে না। রোগীদের চিকিত্সা সেবার স্বার্থে হামলাকারীকে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে। যদি কোন চিকিত্সকের অবহেলা থাকে তা তদন্ত করে নিশ্চিত হয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে। ভুল চিকিত্সা কিংবা চিকিত্সকের অবহেলা হলে সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) মাধ্যমে দায়ী চিকিত্সকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এজন্য বিএমডিসিকে শক্তিশালী করা হচ্ছে বলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান। জানা গেছে, বেসরকারি নামিদামি হাসপাতালে হামলা ও ভাংচুর করার পেছনে কাজ করে মোটা অংকের চাঁদাবাজি। ধানমন্ডির ল্যাবএইড হাসপাতালে কয়েক দফা হামলা চালিয়ে মোটা অংকের চাঁদা আদায় করা হয়। একটি সংঘবদ্ধ দল নামিদামি হাসপাতাল এলাকায় ঘুরাফেরা করে। কোন রোগী মারা গেলে সংঘবদ্ধ দলের সদস্য রোগীর স্বজনদের বলে আপনারা শুধু বলবেন চিকিত্সকের অবহেলায় মারা গেছে। বাকি কাজ আমরা করব এবং ভাংচুর ও হামলার ঘটনা ঘটানো হবে। প্রাইভেট হসপিটাল অ্যান্ড ক্লিনিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মনিরুজ্জামান ভুঁইয়া বলেন, রোগীর মৃত্যুর অভিযোগে নামিদামি হাসপাতালে হামলা ভাংচুর করা হলে রোগীরা বিদেশমুখী হবে। এজন্য বেসরকারি নামিদামি হাসপাতালে হামলা হয়। এভাবে একের পর এক হামলা চলতে থাকলে চিকিত্সকদের পক্ষে চিকিত্সাসেবা সম্ভব হবে না। স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. দীন মো. নূরুল হক বলেন, সারাদেশে চিকিত্সকদের ওপর হামলা বন্ধে কঠোর আইন হচ্ছে। আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। এ বিষয়টি মনে রেখে কোন রোগী মারা গেলে বিষয়টি তদন্ত করে নিশ্চিত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।