জাতীয় শিল্পকলা একাডেমিতে কাজী সালাহউদ্দীন আহমেদের একক চিত্রপ্রদর্শনী

অবচয় আর অবক্ষয়ের আধুনিকতা!

শিল্পশাস্ত্রে আধুনিকতা দুই রকমের। মূর্ত আর বিমূর্ত। দুই-ই বস্তুকেন্দ্রীক। একপদে বস্তুগত জীবনের বাস্তব রূপ, অপরপদে বস্তুগত জীবন হতে বিচ্ছিন্ন রূপ। বস্তু মাত্রই বাস্তব। ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য দৃশ্যমান বস্তু শিল্পে হাজির হয় অপর বস্তু রূপে। আর বস্তুর বিচ্ছিন্নতা হচ্ছে অধরা রূপের বস্তু। মানে বস্তুকে অধরা রূপে হাজির করা। দুই ধারাই পুঁজিকেন্দ্রীক সমাজের চিরচেনা কাঠামোর বিচ্ছিন্নতার ভেতর অবচয় আর অবক্ষয় রূপে শিল্প আকারে জারি থাকে। বস্তু ভোগ আর অভোগের উত্পাদন প্রক্রিয়া মানুষকে যুক্তির দৌড় গোড়ায় পৌঁছায়। দর্শনশাস্ত্র বলছে, যুক্তির অবচয় মানে বিমূর্ত ভাবের উপায়। ফলে শিল্পে আধুনিকতা বস্তুগত ভাবকে কেন্দ্র করে বিকশিত হয়েছে। কাজী সালাহউদ্দীন একজন আধুনিক শিল্পী। কারণ, আধুনিক শিল্পের অন্যতম বৈশিষ্ট্য মাত্রই বস্তুনির্ভরতা। বস্তুই ভাব নির্দেশক। মানে বস্তুই ভাবকে শাসন করে। শাসিত ভাব-বস্তু আধুনিক সমাজে অপর অর্থে দেখা দেয়। ফলে ভাবই বস্তুর আকার ধারণ করে। বস্তু ভাবের আকার লয় না। তবে বস্তুর অনুপস্থিতি এখানে মূখ্য নয়, গৌণ। বস্তুর উপস্থিতি ভাব বাস্তব হয়ে ওঠে। বাস্তব মানে সত্য নয়। সত্য মানে যা স্থিত। যার অতীত বর্তমান আর ভবিষ্যত্ নাই। যা সকল কালেই বিরাজিত। কিন্তু বাস্তবের ইতিবাচক আর নেতিবাচক বদলের ভেতর আধুনিকতা চিহ্নিত। এই চিহ্নিত রূপেই সালাহউদ্দীন আধুনিক শিল্পী হিসেবে হাজির হন। সালাহউদ্দীনের শিল্পের ইতিবাচকতা হচ্ছে ‘স্মৃতিনির্ভর অতীত’। যে ‘স্মৃতিনির্ভরতা’ ঐতিহ্যকেন্দ্রীক। যেমন তিনি শিল্পে হাজির করেন ঢাকা নগরের প্রাত্যহিকতার বস্তু উপাদান। জীবনধারণের সংস্কৃতি এই ঐতিহ্যকে বহন করে চলেছে। প্রাণের সঙ্গে খাদ্যবস্তুর সম্পর্ক নেহাইত ভোগের নয়। রুচি আর উত্পাদন সম্পর্ক-কাঠামো তাকে এক করে রেখেছে। কারণ, খাদ্যবস্তু তার শিল্পবস্তুতে পরিণত হয়েছে। খাদ্যবস্তু হিসেবে ‘বাখরখানি’, ‘টোস্ট’ কিংবা ‘পাউরুটি’ নগরকেন্দ্রীক মানুষের নিত্যদিনের সংস্কৃতির অংশ। এটা যখন শিল্পবস্তু হিসাবে দেখা হয় তখন দুই অর্থ সামনে আসে। এক অর্থে, দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য যখন সংস্কৃতির পুনরুত্পাদনের পন্থায় থাকে, সেটা প্রথা আকারে প্রচলিত হয়। আর প্রচলিত প্রথাই তখন সেটা স্মৃতিনির্ভরতার জন্ম দেয়। মানে একই বাস্তবতা বারবার বাস্তব রূপে হাজির হয়ে আধুনিক রূপ ধারণ করে। অন্য অর্থে, পুঁজির পুনরুত্পাদন দিক। কারণ, পুঁজি সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখতে চায়। সংস্কৃতির রূপান্তর ঘটায়। কেননা, সংস্কৃতির রূপান্তর মানে সংস্কৃতির ধ্বংস নয়। অন্য আরেক সংস্কৃতিতে বদল। কারণ, সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে পুঁজি টিকে থাকতে পারে না। ফলে সালাহউদ্দীন এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হন, যেটা স্মৃতিনির্ভর বাস্তবতা। শিল্পের এই বাস্তব অতীত নহে। বস্তু স্মৃতি রূপেই বর্তমান। ‘বিপর্যস্ত বর্তমান’ তার শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ দিক। সেটা কেমন? নগরকেন্দ্রীক আধুনিকতার দৃশ্য। দৃশ্য বলতে আমরা নগরের ইমেজ বা ছবিকে বোঝাচ্ছি। আমাদের আধুনিকতা পাশ্চাত্যশাসিত। এটা আমাদের প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্যহীন। ফলে সেটা চিন্তাহীনতার দশায় পর্যবসিত হয়েছে। যে আধুনিকতা প্রকৃতিকে শাসন করে শর্তহীনভাবে। ফলে নগরের যে স্বাভাবিক গঠনপ্রক্রিয়া সেটা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। সালাহউদ্দীন শিল্পকর্মে সেই দৃশ্য ধারণ করেছেন। ক্যানভাসে তাকালে মনে হয়, নগর মানে ‘হিজিবিজি গিজগিজ’। ‘হিজিবিজি গিজগিজ’ ভাবের অপর অর্থ ‘হ-য-ব-র-ল’। মানে স্থানের সাথে শূন্যতার সৌন্দর্যের যে সম্পর্ক সেটা নগরে অনুপস্থিত। কেননা, দালানের পর দালান জাগছে ঠিকই, কিন্তু প্রকৃতিতে পা ফেলার জায়গা সংকুচিত হচ্ছে ক্রমশ। এই অস্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে স্বাভাবিক শিল্পে হাজির করেছেন তিনি। ফলে রং আর ফর্মের দিক থেকে নন্দনতাত্ত্বিক। কেননা, বস্তুর উপস্থিতি বস্তুর ভাব প্রকাশে শিল্পে নন্দন ক্রিয়া হিসাবে হাজির হয়। প্রশ্ন জাগতে পারে, ‘অস্বাভাবিক’ দৃশ্য কি শিল্প? অস্বাভাবিকতা একধরনের বাস্তবতার অবক্ষয়। এটা আধুনিকতা লক্ষণ। অস্বাভাবিকতা এখানে বাস্তব। ক্যানভাসে এটা যখন দৃশ্য আকারে হাজির হয়, তখন অপর বাস্তবতার গুণ রূপেই দৃশ্যমান হয়। কারণ, তার শিল্প কথিত নগরসভ্যতার অস্বাভাবিকতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। যেন বস্তুতে বস্তুতে সংঘাত, বাস্তব বাস্তবকে হরণ করে! নগর মানে কি স্থানহীন বা কাঠামোহীন গন্তব্য? শিল্পী ক্যানভাসে রেখা আর ফর্মের যে কোলাজ করেছেন, সেটা ইঙ্গিতময়। ছবি পাঠ করলে দেখা যাবে, নানা জ্যামিতিক ক্ষেত্র ক্যানভাসের পাটাতনে। উল্লম্ব, সম, বিষম ত্রিভুজ বা চতুর্ভুজ কিংবা অর্ধ, সরল, অসরল বৃত্ত নগর কাঠামোর উপমাই সৃষ্টি করে। যাকে আমরা বলছি ইঙ্গিতময় শিল্প। কেননা বস্তুর ভাবই বস্তুকে শিল্পে রূপান্তর করতে বাধ্য। ফলে অস্বাভাবিক দৃশ্যই তার শিল্প হয়ে ওঠে। দর্শনশাস্ত্রে অর্থের ভূমিকা দুই ধরনের। ধরনের একদিক, বস্তুর বিনিময়মূল্য নির্ধারণ। আর অন্যদিক অভিধান বা সমার্থকতা সৃষ্টি করা। ফরাসি দার্শনিক রলাঁ বার্ত বলেন, নতুন মাত্রই চটক নয়, এটা মূল্য বটে। শিল্পী সালাহউদ্দীনের মাধ্যম হিসেবে অপাঙেক্তয় বস্তুকে ব্যবহার করেছেন। যেমন কাঠের গুঁড়া, ফেলে দেয়া কাটুন, চাটাই, চট, পুরানা খবরের কাগজ ইত্যাদি। এই উপাদান শিল্পের বেলায় চটক নয়, মূল্যই নির্ধারণ। মানে শিল্পী অর্থহীনতাকেই অর্থ দিয়েছেন। বস্তুর প্রকৃতিই বস্তুর ভাব। উপযোগিতাই সেই ভাবের অর্থদাত্রী। উপযোগহীন বস্তু মাত্রই বস্তুর প্রকৃতির অভাব। কিন্তু অনোপযোগী বস্তুকে রূপ দেয়াকে বলছি ‘বস্তুর প্রকৃত স্বভাব’। ফলে বস্তুর অ-ভাবকে ভাবে আনাকে আমরা নাম দিয়েছি শিল্প। সালাহউদ্দীনের শিল্পকর্মও দুই অর্থে তা-ই। [নোট :কাজী সালাহউদ্দীন আহমেদের ইন(সাইট) নামের শিল্পপ্রদর্শনীটি শুরু হয়েছে ১৭ এপ্রিল ২০১৪ থেকে। জাতীয় শিল্পকলা একাডেমিতে এই প্রদর্শনী চলবে ২৭ এপ্রিল ২০১৪ নাগাদ।] তত্ত্বপারা :Roland Barthes (1915-1980), French semiologist. “Modern,” The Pleasure of the Text (1975).