ঐতিহাসিক তথ্যসহ বর্তমান পরিস্থিতির মূল্যায়ন

প্রিয় আওয়ামী লীগ অপ্রিয় আওয়ামী লীগ সুভাষ সিংহ রায় প্রচ্ছদ :ধ্রুব এষ প্রকাশক :অন্বেষা প্রকাশন, বইমেলা ২০১৪ মূল্য :২৪০ টাকা। ছাত্রজীবনে জগন্নাথ হলের ভিপি নির্বাচিত হওয়া এবং ক্রমান্বয়ে নিজেকে ফার্মাসিস্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা মেধাবী সুভাষ সিংহ রায়ের অন্যতম কীর্তি। রাজনীতি করেছেন প্রকাশ্যে, মাঠে-ময়দানে, বিচরণ করেছেন আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের সঙ্গে। স্বাভাবিক কারণে মনে হতে পারে, তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং তত্সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গুণকীর্তন গাইতে অভ্যস্ত। কিন্তু তিনি যে বিজ্ঞানের যুক্তিবাদী দৃষ্টিতে দলকে দেখেন, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মূল্যায়ন করেন, তা স্পষ্ট হলো ‘প্রিয় আওয়ামী লীগ অপ্রিয় আওয়ামী লীগ’ গ্রন্থটি পাঠ করে। গ্রন্থটির শেষ নিবন্ধের নাম ‘আমার দল আওয়ামী লীগ’। সেখানে তিনি অকপটে লিখেছেন—‘লিডারশিপ হঠাত্ করে বিকশিত হয় না। নেতৃত্বের জন্যে প্রয়োজন হয় ভিশন, পরিকল্পনা ও দক্ষতা। প্রয়োজনীয় শিক্ষা ছাড়া এই গুণগুলো অর্জিত হয় না। বর্তমান আওয়ামী লীগে কোনো পর্যায়ে তার তাগিদ দেখা যায় না। এবারের কাউন্সিলে যেন বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জগুলো গ্রহণ করা ও তা মোকাবেলার কর্মসূচী প্রণয়ন করা হয়। সেই আওয়ামী লীগকে মানুষ দেখতে চায় যেখানে সাধারণ মানুষের চিন্তা-ভাবনার মূল্যায়ন হয়। সমালোচকদেরকেও যেন বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা হয়।’ (পৃ. ১৫৭)। এই নিবন্ধটিতে সুভাষ সিংহ রায় বেশকিছু দিকনির্দেশনামূলক মতামত উপস্থাপন করেছেন। তিনি লিখেছেন, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার সহজলভ্য হওয়ায় মানুষ রাজনীতি-সচেতন হয়েছে বেশি। কেবল কথায় কথায় ছাত্রলীগকে দোষ দেবার প্রবণতা পরিহার করতে হবে। কারণ, তাদের তৈরি করার জন্য রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ দরকার। তাঁর মতে, বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যাকাণ্ডের পর একমাত্র শেখ হাসিনা ছাড়া ছাত্রলীগের জন্যে কোনো নেতা কিছু করেননি। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দুর্বলতাও অন্বেষণ করেছেন তিনি। ইদানিং বছরব্যাপী জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ইত্যাদি নানাস্তরে সাংগঠনিক কার্যক্রম লক্ষ করা যায় না। কেবল শেখ হাসিনা ৩২ বছর দলটির হাল ধরে রেখেছেন বলেই বাংলাদেশে গণতন্ত্র রক্ষা পেয়েছে। মূলত ২৯টি নিবন্ধের সংকলন রয়েছে ‘প্রিয় আওয়ামী লীগ অপ্রিয় আওয়ামী লীগ’ গ্রন্থটিতে। সুভাষ সিংহ রায়কে যাঁরা চেনেন কিংবা বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে তাঁর টকশো শোনেন, তারা সকলেই জানেন যে এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব দেশ-বিদেশের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক ঘটনাধারা সম্পর্কে সম্যক ওয়াকিবহাল। তিনি টকশো’র আলোচনাতে প্রাসঙ্গিক তথ্য-প্রমাণ দিয়ে কথা বলেন; এক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের উদ্ধৃতি প্রয়োগ একটি স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু একইসঙ্গে বিশ্বের বিখ্যাত রাষ্ট্রনায়কদের রাজনৈতিক অভিমতসমূহ নিজের যুক্তিকে প্রতিষ্ঠা করতে ব্যবহার করেন সাবলীলভাবে। ঠিক অনুরূপভাবে পত্রিকার কলামে সাহিত্য-সংস্কৃতি বিজড়িত হয় রাজনৈতিক প্রসঙ্গ বিশ্লেষণে। তিনি অকপটে বিখ্যাত সব কবিদের কবিতার চরণ উদ্ধৃত করেন এবং যুক্তি দিতে গিয়ে চিকিত্সাবিজ্ঞান থেকে শুরু করে প্রযুক্তির নানান অনুষঙ্গ তুলে ধরেন। তিনি যখন বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চ ভাষণ নিয়ে কলাম লেখেন তখন নির্মলেন্দু গুণের বিখ্যাত কবিতার পঙিক্ত ব্যবহার করেন। আবার ‘বাঙালির বিনিদ্র চোখে প্রতিশোধ জ্বলে’ শীর্ষক ১৫ আগস্ট স্মরণে নিবন্ধ লেখার জন্য বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখিত বিভিন্ন কবির কবিতার চরণ দিয়ে লেখক তাঁর নিজের অনুভূতিকে প্রকাশ করেন। শেখ মুজিব যে বাংলাদেশের সমগ্র ইতিহাস, সেই তথ্যটি তিনি চয়ন করেন হয়তো বা কোনো লেখকের খ্যাতনামা বই থেকে; নিজের মতামতের সপক্ষে। এভাবে আলোচ্য গ্রন্থের প্রতিটি নিবন্ধ ধরে ধরে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, সুভাষ সিংহ রায় পরিশ্রমী লেখক। রাজনীতির ভেতর-বাইরের খবর তাঁর জানা। এজন্য প্রতিটি বিষয় উপস্থাপনে তাঁর মুন্সিয়ানা রয়েছে। গ্রন্থটিতে শেখ হাসিনাকে নিয়ে পাঁচটি নিবন্ধ আছে : ‘শেখ হাসিনার রাজনীতির তিন দশক’, ‘শেখ হাসিনা দেশে ফিরে এসেছিলেন বলেই’, ‘১৫ আগস্ট এবং তারপর শেখ হাসিনা’, ‘কারা শেখ হাসিনাকে অপছন্দ করে...’, ‘শেখ হাসিনার অসুস্থতা ও চিকিত্সা’। লেখকের একটি বাক্য এরকম—‘কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শেষের কবিতায় লিখেছেন, আমার বন্ধুভাগ্য ঈর্ষাযোগ্য, শত্রুভাগ্য শোচনীয়। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে কবিগুরুর এই কথা অক্ষরে অক্ষরে সত্য। তাঁকে পছন্দ করেন এমন লোকের সংখ্যা অসংখ্য, আবার অপছন্দ করার লোকও কম না।’ (পৃ. ১০১)। অপছন্দের কারণ ব্যাখ্যায় তিনি লিখেছেন, ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকেও অনেকেই অপছন্দ করত দলীয় অনেকের কার্যকলাপের কারণে; ঠিক তেমনি অন্যজনের দায়ভার শেখ হাসিনার ওপর বর্তায়। ফলে তাঁকে অনেকেই অপছন্দ করে। ‘আওয়ামী লীগ প্রগলভ কর্মীদের দল’ শীর্ষক প্রথম নিবন্ধ থেকে শুরু করে ‘নব্য আওয়ামী লীগারদের দরকার নেই’, ‘আওয়ামী লীগের শত্রু-মিত্র’, ‘প্রিয় অপ্রিয় আওয়ামী লীগ’, ‘আওয়ামী লীগ আপনজন চিনতে পারে না’, ‘তারপরও আওয়ামী লীগ’, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের কাজ অনেক’, ‘আওয়ামী লীগের সামনে কঠিন পরীক্ষা-১’, ‘আওয়ামী লীগের সামনে কঠিন পরীক্ষা-২’ প্রভৃতি নিবন্ধে সুভাষ সিংহ রায় কখনো বিস্তৃত পরিসরে আবার কখনো বা অল্প কথায় ঐতিহাসিক তথ্যসহ বর্তমান পরিস্থিতিকে মূল্যায়ন করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে, তৃণমূল কর্মীরা দলের সভানেত্রীকে অন্তর দিয়ে ভালোবাসে। অন্যদিকে একদল সুবিধাবাদী সুশীল সমাজ শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিদ্বেষপ্রসূত বক্তব্য দিয়ে, পত্রিকায় লিখে নিজেদের পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে এসেছে। দলটির বিরুদ্ধে অপপ্রচার এবং মিথ্যা ও নোংরা কথা লিখে যারা দেশের গণতন্ত্রকে নস্যাত্ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও কলম ধরেছেন সুভাষ সিংহ রায়। তিনি প্রমাণ করেছেন, ১৫ আগস্টের ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। কারণ, আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার চিরশত্রুরা এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধু হতে পারেনি। বরং জাতির জনকের উত্তরসূরিদের ধ্বংস করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছে অনেক নতুন শত্রু। তবে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে দায়িত্ব বহন করার ইচ্ছে জাগ্রত করা গেলে দেশের অধিকাংশ মানুষ সবসময়ই এই দলের সাথে থাকবে। সুভাষ সিংহ রায়ের লেখনিও সেই দায়িত্ব পালন করছে। মানুষকে জাগ্রত করা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে রাখার অক্লান্ত প্রচেষ্টা রয়েছে তাঁর লেখনি সত্তায়। সুভাষ সিংহ রায়ের গদ্য গতিশীল; সহজ-সরল। তাঁর লেখাগুলো স্বচ্ছন্দে পড়ার মতো এবং চিন্তার খোরাক জোগায়।