ঝিমিয়ে পড়েছে মাঝিরঘাট
মুহাম্মদ নিজাম উদ্দিন, চট্টগ্রাম অফিস
প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০১৪, ২২:৪৫
বন্দরনগরীর অন্যতম বাণিজ্যিক এলাকা মাঝিরঘাট। এই এলাকায় আমদানি করা পণ্য খালাস, গুদামজাত ও পরিবহন হয়ে থাকে। কিন্তু নানা কারণে কয়েক বছর ধরে ঝিমিয়ে পড়েছে মাঝিরঘাট। আগের তুলনায় অর্ধেক পণ্যও খালাস হয় না এখন। ১৬টি ঘাটের মধ্যে অধিকাংশই প্রায় সময় ফাঁকা থাকে। এক সময় দেশে আমদানি করা সকল পণ্য মাঝিরঘাট দিয়ে খালাস হতো। এখন নোয়াপাড়া, নগরবাড়ি, বাঘাবাড়ি, নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর এলাকায় পণ্য খালাস হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে মাঝির ঘাট এলাকার ঘাট ও গুদাম শ্রমিকদের হয়রানির কারণে পণ্য গুদামজাত ও খালাস অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
মাঝিরঘাটে কর্ণফুলী নদীর তীরসংলগ্ন ১৬টি ঘাট রয়েছে। এ এলাকায় গড়ে উঠেছে কয়েকশ পণ্য মজুদের গুদাম। পণ্য পরিবহনের সাথে জড়িত পরিবহন সংস্থাগুলোর অসংখ্য বুকিং কাউন্টার ও কমিশন এজেন্টগুলোর কার্যালয় রয়েছে মাঝিরঘাটে। এখানকার ব্যবসায়ী ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতারা জানান, চট্টগ্রাম থেকে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্রমশঃ সরে যাওয়ার কারণে মাঝিরঘাটের সেই জৌলুস আর নেই।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মাঝিরঘাটের ব্যবসা অন্যত্র সরে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করে লাইটারেজ জাহাজে করে মাঝিরঘাটের বিভিন্ন ঘাট দিয়ে পণ্য খালাস হয়ে থাকে। এই কাজের সাথে জড়িত রয়েছে প্রায় ৮ হাজার ঘাট ও গুদাম শ্রমিক। শ্রমিকরা সংগঠিত হয়ে সংগঠন গড়ে তুলেছে। রাজনৈতিক দলের শ্রমিক সংগঠনগুলো এসব শ্রমিক সংগঠন নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে এক পর্যায়ে শ্রমিকদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ছে আমদানিজাত পণ্য। পণ্য খালাস ও সরবরাহ নিয়ে শ্রমিকদের বাড়তি টাকা আদায়, পণ্য পরিবহনে বাধা, গুদামে বস্তা থেকে পণ্য চুরি হওয়াসহ নানা কারণে ব্যবসায়ীরা মাঝিরঘাট থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করেছেন। এছাড়া পরিবহন খরচ কমাতে ব্যবসায়ীরা দেশের অন্যান্য স্থানে নৌপথে পণ্য নিয়ে খালাস করছেন।
মাঝিরঘাটের পরিবর্তে এখন কালুরঘাট, নাসিরাবাদ, কুমিরা, অলংকার মোড় এলাকায় অসংখ্য উন্নতমানের গুদাম নির্মিত হয়েছে। চট্টগ্রামের বাইরের ব্যবসায়ীরা ঢাকায়, নারায়ণগঞ্জে, নোয়াপাড়া, ঝালকাঠিতে নতুন করে গুদাম নির্মাণ করেছেন। চট্টগ্রামের বাইরের ব্যবসায়ীরা আউটার থেকে পণ্য খালাস করে লাইটারেজ জাহাজে করে নিয়ে যাচ্ছে। যার কারণে মাঝিরঘাটের একক আধিপত্য এখন নেই। আগে প্রতিটি ঘাট দিয়ে প্রতিদিন ৭০০ থেকে ৮০০ টন পণ্য খালাস হতো। এখন অনেক ঘাট ফাঁকা পড়ে থাকে। চালু থাকা ঘাটগুলোতে দৈনিক ৪০০ থেকে ৫০০ টনের বেশি পণ্য খালাস হয় না।
এ প্রসঙ্গে ঘাট শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবদুল খালেক ইত্তেফাককে বলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে ব্যবসা সরে যাওয়ায় মাঝিরঘাটে মন্দা চলছে। একজন শ্রমিক যেখানে দৈনিক ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা মজুরি পেতেন এখন ৩০০ থেকে ৪০০ টাকার বেশি পায় না। অনেকেই বিকল্প হিসাবে রিক্সা ভ্যান চালাচ্ছে। মাঝিরঘাটের অনেক ঘাট ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মেরামত করা হচ্ছে না। প্রতিদিন পণ্য খালাসে দুর্ঘটনা ঘটছে। শ্রমিকরা হতাহত হচ্ছে।’
মাঝিরঘাটের মন্দা পরিস্থিতি সম্পর্কে আন্তঃজিলা পণ্য পরিবহন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক দ্বীন মোহাম্মদ বলেন, মাঝিরঘাটের গুদাম ও ঘাট শ্রমিকদের কাছে ব্যবসায়ীরা জিম্মি হয়ে পড়েছে। প্রতিটি গাড়ি লোড করতে নির্ধারিত মজুরির চেয়ে এক হাজার থেকে ১৫০০ টাকা বেশী আদায় করা হচ্ছে। গুদামে বস্তা থেকে কয়েক কেজি করে পণ্য চুরি হয়ে যায়। অনেক শ্রমিক নেতা গুদাম ভাড়া নিয়ে পণ্য নিয়ন্ত্রণ করছে। এসব কারণে ব্যবসায়ীরা অন্যত্র সরে যাচ্ছে। মাঝিরঘাটে ৫০ শতাংশ ব্যবসা কমে গেছে।’
অন্যদিকে চট্টগ্রাম ঠিকাদার ও কমিশন এজেন্ট এসোসিয়েশন সভাপতি নেয়াজুর রহমান বলেন, ‘আমদানি কমে যাওয়ায় ঘাটে পণ্য নেই। অনেক গুদাম খালি পড়ে রয়েছে। তাছাড়া মাঝিরঘাটে গুদামগুলো ছোট আকৃতির ও উন্নতমানের নয়। অন্যান্য স্থানে আধুনিক উন্নতমানের অনেক গুদাম নির্মিত হয়েছে।’
লাইটারেজ শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক শাহাদাত হোসেন বলেন, পরিবহন খরচ কমাতে ঢাকাসহ অন্যান্য অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা নগরবাড়ি, বাঘাবাড়ি, নোয়াপাড়া, চাঁদপুর, নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন ঘাটে পণ্য খালাস করছে। এতে খরচও মাঝিরঘাটের চেয়ে কম।
মাঝিরঘাটের ঘাট ইজারাদার রতন সিকদার জানান, বন্দর কর্তৃপক্ষ থেকে এক বছরের জন্য ঘাটগুলো ইজারা নেয়া হয়। এখন ব্যবসায় চরম মন্দা চলছে। অনেক ঘাট ১৫ দিন বন্ধ থাকে। পণ্য আউটার থেকে নৌপথে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। ঘাট ইজারাদাররা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।