লাউয়াছড়ার প্রাণবৈচিত্র্য হুমকিতে
নূরুল মোহাইমীন মিল্টন, কমলগঞ্জ (মৌলভীবাজার) সংবাদদাতা
প্রকাশ : ১৭ এপ্রিল ২০১৪, ২২:৪৬
দেশের যে ১৭টি বনাঞ্চলকে সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়েছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান তার অন্যতম। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে প্রাকৃতিক পানি, খাবার ও নিরাপদ বাসস্থান সংকট, পর্যটকের আধিক্য ও যানবাহনের হুড়োহুড়ি, গাছ চুরি, বনবিভাগের লোকবল সংকট প্রভৃতি কারণে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে মিশ্র চিরহরিত্ এই বনের জীববৈচিত্র্য। শুধু ২০০৯ সালের ১ নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ৪ লাখ ২৮ হাজার ৪০২ জন দেশি পর্যটক এবং ৫ হাজার ৭২৮ জন বিদেশি পর্যটক লাউয়াছড়া ভ্রমণ করেছেন। যা প্রাকৃতিক এই বনের জন্য রীতিমত উত্কণ্ঠার বিষয়।
সরেজমিন অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লাউয়াছড়া বনের ভেতর দিয়ে রেল ও সড়কপথ, বৈদ্যুতিক লাইন, পর্যটকের হুড়োহুড়ি বনটির জীববৈচিত্র্যকে বিপন্ন করে তুলেছে। প্রতিনিয়ত পর্যটকের আগমন, মাইক, হল্লা-চিত্কার ও যানবাহনের হর্নের শব্দে জাতীয় উদ্যানের শান্ত পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে। এ অবস্থায় পূর্বের মতো জীবজন্তু ও পশু-পাখির দেখা পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
প্রাকৃতিক পরিবেশ সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যময় বন গবেষণা কেন্দ্র সম্বলিত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে ৪৬০ প্রজাতির প্রাণ-বৈচিত্র্যের ভেতর ১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৪ প্রজাতির উভচর প্রাণী, ৬ প্রজাতির সরিসৃপ, ২৪৬ প্রজাতির পাখি, ২০ প্রজাতির স্তন্যপ্রায়ী প্রাণী এবং ১৭ প্রজাতির পোকামাকড় রয়েছে। সূত্র মতে, লাউয়াছড়ায় ২০০৬ সালে ৬৯টি উল্লুক ছিল, যা কিনা বাংলাদেশের কোনো একটি জায়গায় উল্লুকের সর্বাধিক সংখ্যা। বনভূমিটি এক সময়ে বিশালাকৃতির বৃক্ষরাজি সমৃদ্ধ ঘন প্রাকৃতিক বন থাকলেও গাছ চোর চক্রের আগ্রাসী থাবায় এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। মূল্যবান প্রজাতির বৃক্ষ নিধনের ফলে পশু-পাখিরা হারিয়ে ফেলছে নির্ঝঞ্ঝাট জীবন যাপনের পরিবেশ। জঙ্গলের দুর্লভ প্রাণীগুলো খাবারের সন্ধানে জনপদে ছুটে এসে মারা যাচ্ছে।
এছাড়া লাউয়াছড়ায় কয়েকটি ইকো-কটেজ, স্টুডেন্ট ডরমিটরি, প্রকৃতি ব্যাখ্যা কেন্দ্র স্থাপনের ফলে দিন দিন পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে বনের ভেতরে দল বেঁধে মানুষের অবাধ বিচরণ বন্যপ্রাণীর জন্য খাবার সংগ্রহ ও চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। সাম্প্রতিক সময়ে লাউয়াছড়া থেকে ৫টি প্রধান প্রজাতি হারিয়ে গেছে।
এমন অবস্থায় লাউয়াছড়ায় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পরিকল্পিত উদ্যোগ নেয়া অত্যাবশ্যক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কমলগঞ্জের লেখক-গবেষক আহমদ সিরাজ, সাংবাদিক মুজিবুর রহমান রঞ্জু, কামরুল হাসান, আব্দুর রাজ্জাক, শ্রীমঙ্গলের পরিবেশ সাংবাদিক বিশ্বজিত্ ভট্টাচার্য বাপন জানান, বনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে ওই এলাকা দিয়ে সকল প্রকার যানবাহন চলাচল ও পিকনিক সেন্টার বন্ধ, কোলাহল মুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলা, কাটাতারের বেড়া দিয়ে উদ্যান এলাকা সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। গাছ চুরি রোধে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া দরকার।
লাউয়াছড়া উদ্যান নিয়ে গবেষণাকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক ড. তানজিম উদ্দিন আহমদ বলেন, বন্যপ্রাণীর যে ধরনের খাদ্যের প্রয়োজন সেদিকে খেয়াল না রেখে বনে দ্রুত লাভজনক গাছ লাগানো হচ্ছে। বন্যপ্রাণীর খাবার যোগান দেয়া গাছ পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকলে খাবার ও পানি সংকট দেখা দেবে না। তিনি বলেন, বন রক্ষায় স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ জরুরি এবং যারা বনের উপর নির্ভরশীল, তাদের বন নির্ভরতা কমানো উচিত। যারা সত্যিকারে বনের উপকার চান সেই সব মানুষকে চিহ্নিত করে এর ব্যবস্থাপনা কমিটিতে সম্পৃক্ত করা জরুরি।
শ্রীমঙ্গলস্থ বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন এর চেয়ারম্যান সিতেশ রঞ্জন দেব বলেন, লাউয়াছড়ায় জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গাছ চুরি বন্ধ, অধিক পরিমাণে ফলের গাছ থাকা, শুষ্ক মৌসুমে প্রাকৃতিক পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন।
বনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকারি উদ্যোগ বিষয়ে সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (বন্যপ্রাণী) মো. মাহবুবুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বাসস্থান সবচেয়ে বড় কাজ। সেজন্য সংরক্ষিত বনের মধ্যেই সরকারিভাবে কোরজোন, বাফারজোন করা হয়েছে। অর্জুন, চালতাসহ ওষধি জাতীয় নতুন গাছ লাগানো হবে। লাউয়াছড়ায় যাতে চাপ কমে সেজন্যে কালাছড়ায় সামাজিক বনায়ন করা হবে। তিনি বলেন, অসুস্থ বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে চিকিত্সার জন্য হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। উদ্যানে ৩টি ট্রেইলের দু’টিতেই পর্যটকদের চলাচলে নিরুত্সাহিত করা হচ্ছে। বনবিভাগের পর্যাপ্ত লোকবলের অভাব রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, উদ্যানের মাঝদিয়ে হাইওয়ে থাকায় অনেক সময় মাইক বাজানো হয়। সেসব বিষয়ে দায়িত্ব পালনে লোকের প্রয়োজন রয়েছে। গাছ চুরি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এখন অনেকটা কমে এসেছে। তবে মাঝে-মধ্যে গাছচোরদের হামলা ও প্রতিরোধের ঘটনা ঘটে।