ব্যাংকিং খাতে জালিয়াতি অর্থনীতির দুশ্চিন্তার কারণ

নিরাপদ বিনিয়োগের সহজ মাধ্যম ব্যাংক। ব্যাংকে টাকা রাখলে মাস শেষে বা বছর শেষে নিশ্চিত সুদ বা মুনাফা পাওয়া যায়। তাই সঞ্চিত অর্থ নিরাপদে বিনিয়োগের জন্য এখনও মানুষ ব্যাংককেই সর্বোত্তম পন্থা বলে বিবেচনা করে। বিনিয়োগের উদ্দেশ্য ছাড়া অনেকে শুধু নিরাপত্তার জন্যই ব্যাংকে অর্থ ও সম্পদ গচ্ছিত রাখেন। অর্থাত্ নিজের ঘরের থেকেও ব্যাংককে মানুষ নিরাপদ হিসেবে বিবেচনা করে। এ আস্থার ভিত্তিতেই ব্যাংক আমানত সংগ্রহ করে। ব্যাংকের অর্থের মূল উত্সও এই আমানত। এ অর্থ থেকে ব্যাংকগুলো ঋণ দেয়। যা দেশের শিল্পায়ন, কৃষি ও সেবা খাতসহ সব খাতকেই উন্নতির দিকে নিয়ে যায়। অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি তীব্রতর হয়। ব্যাংকিং খাত যদি ক্ষতিগ্রস্ত হয় তবে গোটা অর্থনীতিই ফ্যাকাসে হয়ে যাবে। তাই এ খাতটিকে শক্তিশালী রাখতে হবে। এজন্য আমানতকারীদের আস্থা অটুট ও অবিচল রাখার কোনো বিকল্প নেই। কারণ আমানতকারীদের অর্থ ছাড়া ব্যাংক এক মুহূর্তও টিকে থাকতে পারবে না। কিন্তু মানুষের বিশ্বাসে যদি চিড় ধরে যায় তবে মানুষ ব্যাংকবিমুখ হয়ে পড়তে পারে। তাছাড়া একবার মানুষ কোনো ব্যাংকের উপর আস্থা হারিয়ে ফেললে তা ফিরিয়ে আনাও খুব কঠিন। তাই আস্থা থাকতেই তা চিরস্থায়ী করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং সেক্টরে যেভাবে চুরি ও জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে তাতে ব্যাংকগুলো আস্থার সঙ্কটে পড়া খুব অস্বাভাবিক নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আস্থার সঙ্কটে পড়ে বহু ব্যাংক দেউলিয়া পর্যন্ত হয়েছে। সে উদাহরণগুলো ভুলে গেলে চলবে না। তা স্মরণে রেখে মানুষের আস্থা ধরে রাখতে পদক্ষেপ নিতে হবে। তাছাড়া যে কোনো মূল্যে চুরি ও জালিয়াতির ঘটনা বন্ধ করতে হবে। বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় ব্যাংক সোনালী ব্যাংক। আমানত সংগ্রহ, ঋণ প্রদান, গ্রাহকের সংখ্যা এবং শাখার সংখ্যাসহ সবদিক থেকেই সোনালী ব্যাংক বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ব্যাংক। সারা দেশের আনাচে-কানাচে এ ব্যাংকের শাখা ছড়িয়ে আছে। এ ব্যাংকটি সরকারের ব্যাংক হিসেবে কাজ করে। যেসব জায়গায় বাংলাদেশ ব্যাংক নেই, সেসব জায়গায় এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করে। বিভিন্ন ব্যাংকের অতিরিক্ত টাকা জমা রাখা এবং প্রয়োজনীয় সময়ে টাকা উত্তোলনের ব্যবস্থা করে সোনালী ব্যাংক। জেলা শহরে এটি আন্তঃব্যাংক লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বৃহত্ এ ব্যাংকটি মানুষের আস্থা অর্জন করে চলতে সক্ষম হয়েছে। যুগ যুগ ধরে মানুষ এই ব্যাংকের ওপর তাদের আস্থা অক্ষুণ্নও রেখেছে। এখনও নানা দুর্ঘটনার পরও মানুষ সোনালী ব্যাংকের উপর আস্থা রাখছে। তবে আস্থা কখনই চিরস্থায়ী বিষয় নয়। এতটাই ক্ষণস্থায়ী ও পরিবর্তনশীল যে একবার আস্থার ঘাটতি দেখা দিলে তা ধরে রাখা কঠিন। দেশের সবাই সোনালী ব্যাংক আস্থা ধরে রেখেই গ্রাহক সেবা দিয়ে যাবে এমনটাই কামনা করে। তবে ব্যাংকটি যদি কোনো ধরনের বিপদের মধ্যে পড়ে তবে দেশের গোটা ব্যাংকিং খাত ও অর্থনীতি মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হবে। এসব দিক বিবেচনায় রেখে এ ব্যাংকটির নিরাপত্তার বিষয়ে সরকারের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। সাম্প্রতিক সময়ে সোনালী ব্যাংকে ঘটে যাওয়া বেশ কিছু চুরি ও জালিয়াতির ঘটনায় ব্যাংকটি নিয়ে মানুষের মনে ভয় সৃষ্টি হয়েছে। কয়েক মাস আগে কিশোরগঞ্জে সোনালী ব্যাংকের শাখায় যেভাবে দীর্ঘ সুড়ঙ্গ খুঁড়ে দুর্বৃত্তরা ১৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা লুট করেছিল, ঠিক একই কায়দায় বগুড়ার আদমদীঘিতে সোনালী ব্যাংকের ট্রেজারি শাখা থেকে প্রায় সাড়ে ৩২ লাখ টাকা লুট হয়। অবশ্য এর মধ্যে প্রায় পৌনে ৯ লাখ টাকা সুড়ঙ্গে পড়ে থাকা অবস্থায় পাওয়া গেছে। মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে একই ব্যাংকের টাকা লুটের ঘটনায় ব্যাংকটির গ্রাহক ও সব মানুষের মধ্যে নানা ভয় উঁকি ঝুঁকি মারছে। এর আগে এ ব্যাংকটিতে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহত্ দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে। হলমার্কের ওই ঘটনার পরও মানুষ এ ব্যাংকটির উপর আস্থা রাখতে চায়। তবে মানুষের আস্থায় যেন চিড় না ধরে এজন্য ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনায় নানা উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। ব্যাংকের কাঠামোগত ত্রুটি দূর করতে শাখা ব্যবস্থাপকদেরকে সঠিক দায়িত্ব পালনে ব্রতী করতে হবে। এজন্য কেন্দ্র থেকে উদ্যোগ নিতে হবে। শাখা ব্যবস্থাপকরা যদি তার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন, তবে ব্যাংকের শাখায় যে কোনো ধরনের অনিয়ম ও অঘটন রোধ করা সম্ভব হবে। তাছাড়া ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যাংকের কর্মকর্তাদের জন্য বেতন কাঠামো সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন করে তা বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। অন্যথায় ভালো মানের কাজ আদায় করা সম্ভব হবে না। তবে ব্যাংকারদের দুর্নীতি ও অনিয়মের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করলে পুনরায় দুর্নীতির আশঙ্কা কমবে। আর চুরির বিষয়ে ব্যাংকের প্রহরী নিয়োগ প্রক্রিয়া তাদের দেখভালের বিষয়ে কেন্দ্র থেকে ভালোভাবে নরজরদারি করা প্রয়োজন। এদিকে সোনালী ব্যাংকের পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত আরেক ব্যাংক বেসিক ব্যাংক নিয়েও নানা কথা হচ্ছে। এ বিষয়গুলো ভালোভাবে নজরে নেয়া উচিত। বিভিন্ন মিডিয়াতে এ ব্যাংকটি নিয়ে যেসব প্রতিবেদন হচ্ছে তার সত্যতা সরকারকে ভালোভাবে বিবেচনা করা উচিত। যদি এ ধরনের কোনো ঘটনার সত্যতা থাকে তবে সরকারকে কঠোর হতে হবে। অন্যথায় সব রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের উপরই মানুষের আস্থায় ঘাটতি দেখা দিতে পারে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতেই শুধু অনিয়ম আর জালিয়াতি হচ্ছে তা নয়। গোটা ব্যাংকিং খাত জুড়েই জালিয়াতির ঘটনা বেড়েছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোতেও নানা ধরনের জালিয়াতি ও দুর্নীতির ঘটনা ঘটছে। এ ধরনের ঘটনা ব্যাংকিং খাতের জন্য ভয়ানক চিন্তার কথা। কারণ এ ব্যাংকগুলোতে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের একটি বড় অংশগ্রহণ রয়েছে। তাই ব্যাংকগুলোর কিছু হলে অনেকেই বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হবে। সবচেয়ে বড় ক্ষতির শিকার হবে দেশের অর্থনীতি। কারণ একটি দেশের অর্থনীতি সে দেশের ব্যাংকিং খাতের উপর নির্ভর করে চলে। যে দেশের ব্যাংকিং খাত যত শক্তিশালী সে দেশের অর্থনীতিও তত বেশি শক্তিশালী। কোনো উদ্যোক্তা যখন টাকার জন্য শিল্প স্থাপন করতে পারবে না তখন এ ব্যাংকগুলোই অর্থের যোগান দেয়। ফলে অর্থনীতি গতিশীল হয়। মানুষের কর্মসংস্থান হয়। নানা দিক থেকে জিডিপির যোগফল বড় হয়। তাই সব ব্যাংকের অনিয়ম, জালিয়াতি বন্ধে সরকারের কঠোর হওয়া প্রয়োজন। যেন সময় থাকতে ব্যাংকিং খাতের উপর মানুষের আস্থা অটুট রাখা সম্ভব হয়।