পাসের হার বাড়লেও পড়ালেখার মান বাড়েনি

বিগত বছরগুলোতে এসএসসি ও এইচএসসিতে পাসের হার বাড়লেও বেশিরভাগ স্কুল-কলেজের পড়ালেখার মানের তেমন কোনো উন্নয়ন হয়নি। দক্ষ ইংরেজি শিক্ষকের ঘাটতি থাকার কথা ব্যাপকভাবে আলোচিত। অনেক স্কুল-কলেজে বিভিন্ন বিষয়ে ঠিকভাবে ব্যবহারিক ক্লাস না-করানোর ব্যাপারটি কখনোই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয় না। বেসরকারি স্কুল-কলেজগুলোতে এই সমস্যা অনেক বেশি। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, গণিত, কমপিউটার, সাচিবিক বিদ্যা—এসব বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের জন্য তত্ত্বীয় শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহারিক শিক্ষা অর্জনও খুব জরুরি। বেশিরভাগ স্কুলে মানসম্মত গবেষণাগার নেই। ঢাকা ও চট্টগ্রামের অনেক স্কুলে বিজ্ঞান বিভাগে দুই শ জনের বেশি শিক্ষার্থী থাকলেও একটি ছোট কক্ষকে নামমাত্র গবেষণা বা ব্যবহারিক শিক্ষার জন্য ব্যবহার করা হয়। বেসরকারি বিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির সময় নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৮০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত ব্যবহারিক শিক্ষার খরচ হিসেবে নেওয়া হয় আর কলেজগুলোতে এই ফি ২০০০ থেকে ৪০০০ টাকা। কিন্তু পাঠ্যবইয়ে নির্দেশিত ব্যবহারিক কোর্সের শতকরা ৫০ ভাগই পড়ানো হয় না। এর ফলে তরুণ শিক্ষার্থীদের কাছে পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের মতো মজার বিষয় খুব কঠিন মনে হয়। ঢাকা বোর্ডের ২০টিরও বেশি কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেশিরভাগ কলেজেই প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষার আগে এবং পরবর্তী সময়ে টেস্ট পরীক্ষার আগে বা পরে দু-তিনটি ব্যবহারিক ক্লাস করানো হয়। তত্ত্বীয় শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে পড়াতে এবং অনেক শিক্ষার্থী নিজের হাতে যন্ত্রপাতি ও উপকরণ ব্যবহারের সুযোগ না পাওয়ায় এই ব্যবহারিক শিক্ষা কোনো কাজে আসে না। বোর্ড পরীক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকদের দ্বারা ব্যবহারিক খাতা স্বাক্ষর করাতে হয়। এই সুযোগে অনেক শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করেন। আবার যারা ঐ অসত্ শিক্ষকদের কাছে অন্তত ৩ মাস প্রাইভেট পড়ে তাদের খাতা যাচাই না করেই স্বাক্ষর করা হয়। স্কুল-কলেজগুলোতে ব্যবহারিক ক্লাস ঠিকমতো না হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী এক্ষেত্রে পর্যাপ্ত দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। এই সুযোগে এসএসসি ও এইচএসসির ব্যবহারিক পরীক্ষার সময় একশ্রেণির শিক্ষক ফেল করানোর ভয় দেখিয়ে আবার কখনো সম্পূর্ণ নম্বর প্রদানের আশা দিয়ে শিক্ষার্থী প্রতি দুই-তিন হাজার করে টাকা আদায় করেন। জানা যায়—যে সব ছাত্রছাত্রী শিক্ষকদের চাহিদা মতো টাকা দেয় তাদেরকে মৌখিক পরীক্ষাতে শুধু নাম পরিচয় জিজ্ঞাসা করা হয় এবং ব্যবহারিকের প্রদত্ত প্রজেক্টের লিখিত পরীক্ষায় কোনো রকম একপাতা লিখলেই সম্পূর্ণ নম্বর দেওয়া হয়। সার্বিক অবস্থা পর্যালোচনা করে বলা যায়—মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের বিভিন্ন বিষয়ের ব্যবহারিক পরীক্ষার পদ্ধতি বদলানো প্রয়োজন। নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক দ্বারা ব্যবহারিক খাতা স্বাক্ষর করানো শুধুমাত্র স্কুল ও কলেজের টেস্ট পরীক্ষার জন্যই প্রযোজ্য করা হোক। শিক্ষাবোর্ড কর্তৃক প্রতি বিষয়ে অন্তত ৭টি ব্যবহারিক প্রজেক্ট করানোর ব্যাপারে কঠোর নির্দেশ দেওয়া যেতে পারে। মাধ্যমিক পর্যায়ে উচ্চতর গণিতে ব্যবহারিক পরীক্ষা বাদ দিয়ে সেই নম্বরের নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্ন দেওয়া যেতে পারে এবং এই অংশে জ্যামিতি ও ত্রিকোণমিতির প্রশ্ন বেশি দিলে শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে সহায়ক হয়। কলেজগুলোতে বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে ব্যবহারিক ক্লাসে সর্বোচ্চ ৫ জন শিক্ষার্থী নিয়ে একটি প্রজেক্ট সম্পন্ন করার নিয়ম করা হোক। বেশিরভাগ কলেজেই ১৫ জনের গ্রুপ করে একটি এক্সপেরিমেন্ট দেখানো হয়—এতে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরই সমস্যা হয়। আর এসএসসি ও এইচএসসি উভয় পরীক্ষার ব্যবহারিক অংশের মৌখিক পরীক্ষার জন্য শিক্ষাবোর্ড কর্তৃক প্রতি বিষয়ে ৪টি প্রশ্ন প্রদান করা হোক এবং ঐ ৪টির যে কোনো ১টি পারলেই শিক্ষার্থীকে সম্পূর্ণ নম্বর দেওয়ার নির্দেশনা থাকা উচিত। শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতির স্বার্থে শীঘ্রই এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। ঢাকা