রেলওয়ের জমি

গ্রামাঞ্চলে একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ হলো— ‘গরিবের সুন্দরী বউ সকলের ভাবি’। সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভূ-সম্পত্তির অধিকারী রেলওয়ের জমি আজ সেই সুন্দরী বউয়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। গরিবের সুন্দরী বউয়ের ওপর যেমন সবার নজর পড়ে ঠিক তেমনি এই প্রতিষ্ঠানের ভূ-সম্পত্তির ওপর সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক ব্যক্তিসহ সকলের নজর। আরো একটি প্রবাদ আছে—‘সরকারি মাল, দরিয়া মে ঢাল’। এটি অবশ্য অনেক পুরনো কথা। আজকালকার মানুষ অনেক চালাক। তারা দরিয়ায় ঢালার পরিবর্তে সরকারি মাল নিজের পকেটে ঢালতে বা পুরতেই বেশি আগ্রহী। বাংলাদেশের বেশিরভাগ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে এবং তাদের সম্পত্তিতে এ চিত্র লক্ষ করা যায়। আর এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ রেলওয়ের অবস্থান শীর্ষ পর্যায়ে। রেলওয়ের জমি নিয়ে দেশজুড়ে চলছে দখল বাণিজ্য। ২০০৬ সালে প্রণীত গেজেট অনুসারে বাংলাদেশে রেলওয়ের ৩ ধরনের জমি রয়েছে— ১. যে জমি রেলের কাজে ব্যবহূত হচ্ছে এবং অচিরেই কাজে লাগবে; ২. যে জমি ভবিষ্যতে কাজে লাগবে; ৩. যে জমি কখনো রেলের কাজে আসবে না। বর্তমানে পূর্ব ও পশ্চিম জোন মিলে মোট ভূ-সম্পদের পরিমাণ ৬১,৬০৫.৮৪ একর। ওই ভূ-সম্পদের মধ্যে বর্তমানে রেলের অপারেশন কাজে ব্যবহূত হচ্ছে ৩১,৩১১.৫০ একর। রেলের দখলে অব্যবহূত জমি আছে ১৩,১০৭ একর, বেদখল অবস্থায় আছে প্রায় ৪,৪৬৫.৬২ একর। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চলে ১০৭৮.১৫ একর এবং পশ্চিমাঞ্চলে ৩,৩৮৭.২৭ একর। যার বাজার মূল্য ৫০ হাজার কোটি টাকা। রেল সেকশনের বিভিন্ন স্টেশন ও সংলগ্ন এলাকায় টিনসেড, পাকা ও আধা পাকা ঘর নির্মাণ করে আবার কিছু ‘অতিচালাক’ ব্যক্তি দখলকে ‘হালাল’ ও নিরঙ্কুশ করার জন্য দখলকৃত ভূমির একটি অংশে মসজিদ, মাদ্রাসা, মক্তব, জানাজা পড়ার স্থান ইত্যাদি ধর্মসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তাঁরা ভালো করেই জানেন, মসজিদ উচ্ছেদ করার সাহস কেউ পাবে না, কারণ তা করলেই জনগণের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগবে এবং মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠবে। আর এই সুযোগে বাকি অবৈধ সম্পত্তি ভোগ করতে তাঁদের কোনো অসুবিধাই হবে না। এভাবে ইজারা জালিয়াতি, ইজারা নিয়ে লাইসেন্স ফি বা মাশুল না দেওয়া, বছরের পর বছর ধরে জমি ফেলে রাখার কারণে জমি থেকে রেল কর্তৃপক্ষ যেমন কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আয় করতে পারছে না তেমনি এ সুযোগে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক ব্যক্তি ও সুযোগসন্ধানীরা হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। জমি উদ্ধারে আইনের জটিলতা : ১৯৭০ সালের ২৪ নম্বর অধ্যাদেশের ৯(১)২(বি) ধারা এবং ৫(২)(৬) ধারা অনুযায়ী বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তারা রেলওয়ের জমির অবৈধ দখলদারদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারেন। এ বিধিকেই অবৈধ দখলদার ও একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। ওই রসিদকে দখলদারেরা বলে ‘ক্ষতিপূরণ লাইসেন্স’। এরপর তারা উচ্ছেদের বিরুদ্ধে আদালতের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ভোগদখল অব্যাহত রাখে। আইনি জটিলতা ছাড়াও পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করা যায় না। জমি বিক্রয় সংক্রান্ত জটিলতা: ১৯৯২ সালের ১২ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর দফতরের নির্দেশনা অনুযায়ী রেলওয়ের অব্যবহূত জমি প্রকাশ্যে নিলামের মাধ্যমে বাজারের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ মূল্যে বিক্রি করা হয়। কিন্তু টেন্ডার ছাড়া জমি বিক্রির কারণে রেলওয়ের আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় অর্ধশত কোটি টাকা। বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকে অবৈধ দখলে থাকা জমি উদ্ধার ও এর সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করতে ২০০৭ সালে ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা (ল্যান্ড ইউজ প্ল্যান) তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। রেলের অব্যবহূত জমি ভবিষ্যতে কী কাজে ও কীভাবে ব্যবহার করা হবে — রেলওয়ের মোট জমির পরিমাণ ও ইজারা দেওয়া জমির পরিমাণ এ পরিকল্পনায় উল্লেখ থাকার কথা। রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি দেখাশোনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট বিভাগ রয়েছে। এদের দায়িত্ব হচ্ছে জমিজমা, ভবনাদি ও অন্যান্য সম্পত্তির সুরক্ষা, সংরক্ষণ, মেরামত, সমপ্রসারণ, উন্নয়ন প্রভৃতি কাজ করা। নিয়মিত খাজনা পরিশোধ, ভূমি জরিপ ও ভূমি রেকর্ড হাল নাগাদকরণ, জমিজমা ও ভবনাদি অবৈধ দখলমুক্তকরণ এবং সেগুলোকে ব্যবহারোপযোগী করে রাখা। কিন্তু যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করা হচ্ছে না। বরং অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি এই সংস্থাটির বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তারা রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা না করে এভাবে বিলিয়ে দিতে পারছেন কোন মানসিকতা থেকে? রাষ্ট্রীয় সম্পদের এমন অপব্যয় কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। দিনের পর দিন দখলদারদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এবং অপ্রতিরোধ্যভাবে জমি দখল করে যাচ্ছে। অবিলম্বে জমি বেদখল হওয়ার প্রক্রিয়াগুলো বন্ধ হওয়া দরকার। আমরা আশা করবো রেলের ভূ-সম্পত্তি অবৈধ দখলদারদের কবল থেকে মুক্ত করার জন্য সরকারের নেওয়া কর্মসূচি আরো জোরদার করা হবে। যা রেলের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। মানিকগঞ্জ