আবু বকর উদ্ধার, জানা গেল না অপহরণ রহস্য

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিককে অপহরণের ৩৫ ঘণ্টা পর অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা গেলেও কি কারণে তাকে অপহরণ করা হয়েছিল তা রহস্যই রয়ে গেল। কী ছিল অপহরণকারীদের উদ্দেশ্য- তা এখনও রয়ে গেছে অন্ধকারে। তবে সরকার এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর চাপেই অপহরণকারীরা আবু বকর সিদ্দিককে মুক্ত করে দিয়েছে বলে দাবি করেছেন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা। আবু বকরের পরিবারও তাই মনে করছেন। বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে আবু বকরকে মিরপুর আনসার ক্যাম্পের কাছে চোখ বাঁধা অবস্থায় ফেলে রাখা হয়। এরপর তিনি রিকশায় করে কাজীপাড়ায় যান এবং সেখান থেকে সিএনজিতে করে যাবার সময় পুলিশ তাকে সনাক্ত করে। বৃহস্পতিবার ব্র্যাক সেন্টারে সুশীল সমাজের সাংবাদিক সম্মেলনের পর অপহূত আবু বকরকে উদ্ধারের জন্য সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর নির্দেশনা আসে। তাকে উদ্ধারের জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তাকে উদ্ধারের দাবি জানিয়ে আইনজীবী, মানবাধিকার সংগঠন ও গার্মেন্টস শ্রমিক সংগঠনগুলো আল্টিমেটাম দিয়ে কর্মসূচি ঘোষণা করে। সন্ধ্যার পর পুলিশ ঢাকার মিরপুর, সাভার ও গাজীপুরের কোনাবাড়ী এলাকায় থাকতে পারে এমন সম্ভাব্য স্থান চিহ্নিত করে। পুলিশের একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, সোর্সের দেয়া তথ্যমতে বৃহস্পতিবার রাত ১০টা থেকে মিরপুর ও আশপাশ এলাকায় তল্লাশি করা হয়। ডিবির একজন অতিরিক্ত উপ-কমিশনারের নেতৃত্বে একটি টিম মিরপুর এলাকায় অভিযান চালায়। যেভাবে মুক্ত হলেন বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত সোয়া একটার দিকে কলাবাগান স্টাফ কোয়ার্টারের সামনে মিরপুর রোডে পুলিশের চেকপোস্টে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা থামার নির্দেশ দেয় পুলিশ। এএসআই বাবুল রহমান অটোরিকশার যাত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। অটোরিকশার যাত্রী নিজেকে বেলা’র নির্বাহী পরিচালক সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী বলে পরিচয় দেন। তিনি আরো জানান যে, তাকে অপহরণ করা হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে ঐ এএসআই অপহূত আবু বকরকে দেখে চিনতে পারেন। তিনি ধানমন্ডি থানার ওসি (তদন্ত) অশোক চৌহানকে মোবাইল ফোনে বিষয়টি জানান। ২/৩ মিনিটের মধ্যে ওসি (তদন্ত) ঘটনাস্থলে আসার পর বিষয়টি বুঝতে পারেন। তিনি ডিএমপি’র অতিরিক্ত কমিশনার শেখ মারুফ হাসানকে অবহিত করেন। অতিরিক্ত কমিশনার তাকে রিজওয়ানা হাসানের মোবাইল নম্বর দেন। এরপর অশোক চৌহান ঐ নম্বরে ফোন করে মোবাইল ফোনটি আবু বকরের কাছে এগিয়ে দেন। আবু বকর কথা বলতেই হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। আবু বকরকে নিয়ে যাওয়া হয় ধানমন্ডি থানায়। এ সময় আবু বকরের পরনের জামা ছেঁড়া ছিল। পায়ে স্যান্ডেল বা জুতা ছিল না। দুই চোখের মাঝখানের নাকের ঢালু অংশে লাল চিহ্ন ছিল। দুই হাতের কনুইয়ের ওপর ছিল দড়ি দিয়ে বাঁধার দাগ। কিছু সময় পর ধানমন্ডি থানায় ছুটে আসেন আবু বকরের মা মঞ্জুরা জলিল ও স্ত্রী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। ছেলে ও স্বামীকে ফিরে পেয়ে তারা তাকে জড়িয়ে ধরেন। থানার ভিতরে এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়। ছেলে ফিরে আসায় আবু বকরের মা হাত তুলে দোয়া করেন। রাত আড়াইটার দিকে থানায় আসেন ডিএমপি’র অতিরিক্ত কমিশনার শেখ মারুফ হাসান ও নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার সৈয়দ নূরুল ইসলাম। তারা প্রথমে আবু বকরের সাথে একান্তে কথা বলেন। রাত সাড়ে ৩টার দিকে পুলিশ প্রহরায় তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ধানমন্ডির সেন্ট্রাল রোডের ৫৭/২ নম্বর বাড়িতে। আবু বকরের উদ্ধারের খবর পেয়ে রাতেই স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষী ও মানবাধিকার কর্মীরা ভিড় করেন তার বাড়িতে। শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় তাকে ধানমন্ডির বাসা থেকে পুলিশের গাড়িতে করে নারায়ণগঞ্জ নেয়া হয়। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী। নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার কার্যালয়ে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর নেয়া হয় আদালতে। সেখানে ম্যাজিস্ট্রেটের খাস কামরায় তিনি এই অপহরণ ও উদ্ধারের ব্যাপারে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। দুপুর ৩টার দিকে ফতুল্লায় তার কর্মস্থল হামিদ ফ্যাশনে যান। সেখানে শ্রমিকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেয়ার পর ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন। ফেরার সময় অপহরণের ঘটনাস্থল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের দেলপাড়াস্থ ভুঁইয়া ফিলিং স্টেশনের সামনে নেমে কিভাবে অপহূত হয়েছিলেন-তার বর্ণনা দেন। এ সময় নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার উপস্থিত ছিলেন। ঢাকায় ফেরার পর অপহরণ ও উদ্ধারের ঘটনা শেষ হয়। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল উদ্ধার সম্পর্কে ইত্তেফাককে বলেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক তত্পরতার কারণে আবু বকর সিদ্দিককে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। সব ধরনের ক্লু মাথায় নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অভিযান চালায়। কিন্তু কারা অপহরণ করেছিল তাদের কী সনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে-এমন প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এটা পুলিশ সঠিকভাবে তদন্ত করে দেখবে। তদন্তের পরই এ ব্যাপারে বিস্তারিত বলা সম্ভব হবে।’ ঘটনা তদন্তে গঠিত উচ্চতর অনুসন্ধান কমিটির প্রধান ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার শেখ মোহাম্মদ মারুফ হাসান ইত্তেফাককে বলেন, ‘কারা অপহরণ করেছিল, কী জন্য অপহরণ করেছিল তা বলার এখনও সময় আসেনি।’ অপরদিকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (গোয়েন্দা) মনিরুল ইসলাম বলেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তত্পরতার কারণে অপহরণকারীরা বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে মিরপুর পাইক পাড়া আনসার ক্যাম্পের কাছে চোখ বাঁধা অবস্থায় ফেলে যেতে বাধ্য হয়েছে। তিনি বলেন, ভিকটিমকে (অপহূত আবু বকর সিদ্দিক) অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। এখন তদন্তের বাকি ধাপগুলো অনুসন্ধানে পুলিশ কাজ করছে। এরমধ্যে রয়েছে কী কারণে অপহরণ করা হয়েছিল, কারা অপহরণ করেছিল, অপহরণের সময় প্রর্দশিত অস্ত্র ও অপহরণে ব্যবহূত মাইক্রোবাস উদ্ধার। অপর এক প্রশ্নের জবাবে এ গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, কী উদ্দেশে অপহরণ এ নিয়ে ধারণা করার মত কোন অবস্থা নেই। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিছু বলা সম্ভব নয়। আবু বকর নির্দিষ্ট করে জানাতে পারেননি অপহরণকারীদের সম্পর্কে কোন তথ্য বা অপহরণের পর যেখানে তাকে আটক করা হয়েছিল তার অবস্থান। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপহরণকারীরা মুক্তিপণ দাবি করে থাকে। এ ক্ষেত্রে অপহরণকারী নিজেদের মধ্যে দু’একবার বলেছে (জোরালো ভাবে নয়) ৪ লাখ, কখনো এক লাখসহ বিভিন্ন ধরনের কথা। তবে অপহরণকারীরা সরাসরি আবু বকর সিদ্দিকের কাছে কোন টাকা দাবি করেনি। আবু বকর সিদ্দিককে অপহরণের পরপরই তার চোখ বেঁধে ফেললেও তার সঙ্গে কোন খারাপ ব্যবহার করেনি। ফলে অপহরণকারীদের ব্যাপারেও কোন ধারণা পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, ঘটনার পর থেকে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ও র্যাব একত্রে কাজ করেছে। কয়েকটি সূত্র ধরে তদন্ত কাজ চালানো হয়েছে। প্রশাসনের অব্যাহত তত্পরতা এবং মিডিয়ার সার্বক্ষণিক প্রচারের কারণে অপহরণকারীরা চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি। তবে ঠিক কী কারণে তাকে অপহরণ করা হয়েছিল সে বিষয়টি ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। উদ্ধার অভিযানে অংশ নেয়া ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, অপহরণের পর তাকে উদ্ধারে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের পাশাপাশি মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) অভিযান শুরু করে। বৃহস্পতিবার মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের সিসিটিভিতে ধারণ করা মাইক্রোবাসের ছবি ও বিভিন্ন উপাত্ত সংগ্রহ করেন। এগুলো যাচাই-বাছাই করে প্রথমে মাইক্রোবাসটি সনাক্ত করার চেষ্টা করে। এ অবস্থায় একই ধরনের তিনটি মাইক্রোবাসের সন্ধান পান। এরমধ্যে খিলগাঁয়ে একটি ও মিরপুরে দুইটি। যাচাই-বাছাই করে এ তিনটির সঙ্গে অপহরণের সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অপহরণ সম্পর্কে তিনি বলেন, অপহরণের পর থেকে অপহরণকারীরা কোন ধরনের মোবাইল ফোনে কারো সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। ফলে অপহরণকারীদের অবস্থান বা তাদের পরিচয় কিছু জানা সম্ভব হয়নি। ফতুল্লার হামিদ ফ্যাশন লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক আবু বকর সিদ্দিক। বুধবার কারখানা থেকে বের হয়ে প্রাইভেটকার যোগে ঢাকায় ফিরছিলেন। পৌনে তিনটার দিকে নারায়ণগঞ্জ-লিংক রোডের দেলপাড়া ভুঁইয়া ফিলিং স্টেশনের সামনে থেকে দুর্বৃত্তরা তাকে অস্ত্রের মুখে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। ঘটনার ৩৫ ঘন্টা পর বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে মিরপুর আনসার ক্যাম্পের কাছে চোখ বাঁধা অবস্থায় তাকে ফেলে রাখা হয়। পরে সিএনজি অটোরিকশাযোগে ধানমন্ডির সেন্ট্রাল রোডের বাসায় ফেরার পথে কলাবাগানে পুলিশের চেকপোস্টে পরিচয় নিশ্চিত করে পুলিশ তাকে ধানমন্ডি থানায় নিয়ে যায়।