১৬৪ ধারায় অপহরণের শ্বাসরুদ্ধকর বর্ণনা

‘অস্ত্র ঠেকিয়ে আমাকে তোলার পর গাড়িটি চলতে শুরু করে। এর মধ্যে মুখ, হাত-পা বেঁধে ফেলে। মাথায় পরিয়ে দেয় জমটুপি। শুইয়ে দেয় গাড়ির নিচে। ঘন্টাখানেক চলার পর নির্জন এলাকার মধ্যে দিয়ে চলে মাইক্রোবাসটি। প্রায় সাড়ে তিন ঘন্টা চলার পর একটি বাড়ির নিচতলার ফ্লোরে নিয়ে রাখে। সব সময় চোখ বেঁধে রাখত। খাওয়ার সময় খুলে দিত হাত।’ গতকাল শুক্রবার দুপুর ১২-৪০ মিনিটে নারায়ণগঞ্জের জ্যেষ্ঠ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট চাঁদনী রূপমের খাসকামরায় ১৬৪ ধারায় দেয়া জবানবন্দিতে অপহূত হয়ে থাকা ৩৫ ঘন্টার এমনই শ্বাসরুদ্ধকর বর্ণনা দেন আবু বকর সিদ্দিক। তিনি বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী। দুপুর ২-৩৫ মিনিট পর্যন্ত আদালতে তার জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়। আদালতে জবানবন্দি শেষে তিনি নিজ কর্মস্থল ফতুল্লার হামিদ ফ্যাশন পরিদর্শন করেন। এরপর পুলিশ পাহারায় যেখান থেকে তিনি অপহূত হয়েছিলেন সেখানে গিয়ে পুলিশের কাছে বর্ণনা দেন অপহূত হওয়ার ঘটনা। আমাদের নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, জবানবন্দি শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শংকিত। আদালতেও আমি এ শংকার কথা বলেছি। অপহরণকারীদের কবল থেকে বেঁচে আসবো ভাবতেও পারিনি।’ আদালত সূত্র জানায়, জবানবন্দিতে আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘বুধবার দুপুরে ফতুল্লার হামিদ ফ্যাশন থেকে বের হওয়ার পর নিজের গাড়িতে ঢাকায় ফেরার পথে ফতুল্লার ভুঁইগড় এলাকায় পৌঁছলে একটি নীল রঙের মাইক্রোবাস আমার গাড়ির পেছনে ধাক্কা দেয়। নেমে গাড়ির ক্ষতি হয়েছে কি-না তা দেখার সময় পাঁচ থেকে ছয় জন ওই মাইক্রোবাস থেকে নেমে আমাকে জোর করে তাদের গাড়িতে তুলে নেয়। এ সময় একজন পেছন থেকে পিস্তলও ধরেছিল। পরে মাইক্রোবাসে তুলে হাত, পা, চোখ বেঁধে নিচে শুইয়ে দেয়। তখনও গাড়ি যানজটের মধ্যে দিয়ে চলছিল। ঘন্টাখানেক চলার পর গাড়িটি নিরিবিলি রাস্তা দিয়ে চলতে থাকে। রাস্তার মধ্যে দু’টি ফেরিও পার হয়েছে মাইক্রোবাসটি। প্রথম ফেরি পার হওয়ার পর গাড়ি বদল করা হয়। দু’টি ফেরির মধ্যে দূরত্ব আধা কিলোমিটারের মতো। এভাবে তিন থেকে সাড়ে তিন ঘন্টা চলার পর গাড়িটি থামে। সেখানে একটি বাড়ির নিচতলার মেঝেতে আমাকে রাখা হয়।’ আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘অপহরণকারীরা আমাকে গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়ার সময় চাঁদার কথা বলাবলি করেছে। তবে পরিবারের কারো ফোন নাম্বার চায়নি। আবার যে ঘরে আটকে রেখেছিল সেখানে এসে বস মতো একজন বললো, তোর পরিচয় কি? তোকে নিয়ে সারাদেশে হুলস্থূল শুরু হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ওরা আমাকে যে ঘরে আটকে রেখেছিল ওই ঘরে আগেও লোকজনকে আটকে রাখা হয়েছে বলে আমার মনে হয়। ওদের ফিসফিসানিতেও সেরকম মনে হয়েছে। অপহরণকারীরা কাউকে নাম ধরে ডাকেনি। ওরা শুধু বাথরুমে যাওয়ার সময় চোখ খুলে দিত। আর খাওয়ার সময় হাত খুলে দেয়া হতো। তবে ওই ঘরের দৃশ্য দেখার সুযোগ ছিল না।’ আবু বকর বলেন, ‘বৃহস্পতিবার রাত ১০টা থেকে সোয়া ১০টার দিকে একজন এসে বলেন, তোকে মেরেও কোন লাভ নেই, বাঁচিয়ে রেখেও কোন লাভ নেই। তবে বাঁচিয়ে রেখে ছেড়ে দিলে কিছু লাভ হতে পারে। তখনই আমাকে একটি গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে রওনা দেয় তারা। রাত সোয়া ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে মিরপুরের পাইকপাড়ায় আনসার ক্যাম্পের সামনে ফেলে দেয়। এর আগে ওরা আমাকে ৩০০ টাকা পকেটে ভরে দেয় - সিএনজিতে করে বাসায় ফেরার জন্য। সেখানে কোন সিএনজি না পেয়ে রিক্সায় করে কাজীপাড়া যাই। এরপর সেখান থেকে সিএনজি নিয়ে বাসায় ফেরার সময় ধানমন্ডি মাঠের উল্টোদিকে পুলিশ চেকপোষ্টে ঘটনা খুলে বলি। এরপর পুলিশ সদস্যরা থানায় নিয়ে যান, পরিবারের লোকজনও থানায় আসেন। সেখান থেকে রাত সোয়া তিনটার দিকে বাসায় ফিরি।’ রাজধানীর কলাবাগান চেকপোষ্টে দায়িত্ব পালনকারী এএসআই বাবুল রহমান জানান, রাস্তায় যানবাহন তল্লাশি চালানোর সময় তারা সিএনজিটিকে থামান। যাত্রীর পরনে ছেঁড়া জামা দেখে তিনি তার পরিচয় জিজ্ঞাসা করেন। এ সময় আবু বকর তার অপহরণের বিষয়টি পুলিশকে খুলে বলেন। এএসআই বাবুল আরও জানান, আবু বকরের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তিনি বিষয়টি একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে জানান। এরপর ধানমন্ডি থানার অফিসার ইনচার্জ (তদন্ত) অশোক কুমার চৌহান ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তাকে থানায় নিয়ে যান। আর আবু বকরকে বহনকারী সিএনজি চালক হাফিজুর রহমান জানান, তিনি রাত পৌনে একটার দিকে মিরপুর কাজীপাড়া থেকে আবু বকরকে তার সিএনজিতে তোলেন। এ সময় তিনি (আবু বকর) মিরপুর ১০ নম্বরের দিক থেকে রিকশা করে আসছিলেন।