রাজশাহীতে পথে বসছেন ডিমের খামারিরা

এক মাস থেকে রাজশাহীর বাজারে ডিমের দাম কমেছে। খামারিরা যে দামে বাজারে ডিম বিক্রি করছেন, ডিমের উত্পাদন খরচ তার চেয়ে বেশি। এভাবে ক্রমাগত লোকসান টানতে ডিম উত্পাদনকারী (লেয়ার) অনেক খামারি পথে বসেছেন। কয়েক মাসের ব্যবধানে রাজশাহীতে লেয়ার খামারির সংখ্যা ৩০ থেকে ৪০ ভাগে নেমে এসেছে। খামারিদের তথ্যানুযায়ী ২/৩ মাস আগে রাজশাহীতে লেয়ার খামারির সংখ্যা ছিল ৯৫০ থেকে ১ হাজার। বর্তমানে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৫০ থেকে ৫শ’। নগরীর কাদিরগঞ্জের লেয়ার খামারি আরিফ বলেন, খামার থেকে বাজারে পাইকারদের কাছে তারা প্রতিটি ডিম ৪ টাকা ৭০ পয়সায় বিক্রি করছেন। অথচ তাদের উত্পাদন খরচ ৫ টাকা ৬৫ পয়সা থেকে ৬ টাকা। খামারিরা প্রতি ডিমে ১ টাকা থেকে দেড় টাকা লোকসান দিচ্ছেন। খামারিরা জানান, পাঁচ মাস আগে রাজশাহীতে ৯৫০ থেকে ১ হাজার লেয়ার খামারে ডিম উত্পাদনকারী মুরগির সংখ্যা ছিলো ২৭ থেকে ৩০ লাখ। তবে ডিমের দাম কমায় বর্তমানে লেয়ার খামারের সংখ্যা ৪৫০ থেকে ৫শ’তে নেমেছে। একইভাবে মুরগির সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ থেকে ১৪ লাখে। বাজারে ডিমের দাম কমলেও কমেনি উত্পাদন খরচ। উত্পাদন খরচ না কমায় লোকসানের মুখে পড়ছে খামারিরা। এছাড়া গ্রীষ্মের গরমের কারণে খামারগুলোতে ডিমের উত্পাদন কমেছে। সর্বোপরি বাজারে ডিমের দাম কমায় ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে। খামারে যদি ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ ডিম উত্পাদন হয় তাহলে একটি ডিমের পিছনে খরচ হয় ৪ টাকা ৬৫ পয়সা থেকে ৪ টাকা ৭০ পয়সা। কিন্তু তাপদাহের কারণে খামারগুলোতে ডিমের উত্পাদন হারও কমেছে। বর্তমানে ডিমের উত্পাদন হার নেমেছে ৭০ শতাংশে। এতে করে খামারগুলোতে ডিমের উত্পাদন খরচ আরো বেড়েছে। একটি ডিম উত্পাদন করতে খামারিদের বর্তমানে খরচ হচ্ছে প্রায় ৬ টাকা। নগরীর গ্রেটার রোডের ‘আদর্শ পোল্ট্রি অ্যান্ড ফিড’ কর্মচারী মিজানুর রহমান বলেন, রাজশাহীর বাজারে এখন লেয়ার মুরগির খাদ্য (পোল্ট্রি ফিড) প্রতি ৪০ কেজির এক বস্তা ১ হাজার ৪০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আবার মুরগির যে প্রোটিনের দাম ১ বছর আগে ৬০ টাকা ছিল, এখন তা ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মেহেরচণ্ডির লেয়ার খামারি কবির হোসেন বলেন, হাতেগোনা যে ক’জন খামারি রাজশাহীতে টিকে আছেন তাদের প্রায় ৩০ শতাংশ লোকসানের কথা ভেবে মাংস উত্পাদনের দিকে ঝুঁকছেন। তার সাড়ে ৪ হাজার লেয়ার মুরগি আছে। বর্তমানে তার খামারে ডিম উত্পাদনের হার ৭৮ থেকে ৮০ শতাংশ। এ হারে ডিম উত্পাদন করেও প্রতিদিন তাকে ১ হাজার ৮০০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা লোকসান দিতে হচ্ছে। এভাবে প্রতিদিনের লোকসান থেকে বাঁচতে কয়েকদিনের মধ্যে তিনি খামারের সব মুরগি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বাজারে ডিমের দাম কমার জন্য পোল্ট্রি ব্যবসায়ীরা বাচ্চা উত্পাদনকারী বিভিন্ন হ্যাচারি মালিককে দায়ী করেন। তাদের অভিযোগ, হ্যাচারি মালিকরা ডিম থেকে বাচ্চা উত্পাদনের জন্য লাখ লাখ ডিম নিয়ে থাকেন। কিন্তু বাজারে বাচ্চার দাম কমলে হ্যাচারি মালিকরা বাচ্চা উত্পাদন বন্ধ করে সংগৃহীত ডিম বাজারে বিক্রি করেন। ফলে বাজারে অতিরিক্ত ডিমের আমদানি হওয়ায় দাম কমে যায়। গত এক মাস বাজারে মুরগির বাচ্চার দাম কম থাকায় হ্যাচারি মালিকরা বাচ্চা উত্পাদন বন্ধ করে ডিম বাজারে ছাড়ছেন। আর তাতেই বিপদগ্রস্ত হচ্ছেন লেয়ার খামারিরা। খামারিরা অভিযোগ করেন, ডিমের দাম কমে যাওয়া ছাড়াও রাজশাহীতে ৭ বছরে সাড়ে ৩ হাজার পোল্ট্রি খামার বন্ধ হয়েছে। খাদ্যের অব্যাহত দাম বৃদ্ধির কারণে অনেক আগে থেকেই রাজশাহীর পোল্ট্রি শিল্প ধ্বংসের মুখে পড়েছে। মাঝে মাঝে রয়েছে এভিয়েন ইনফ্লুয়েঞ্জা বা বার্ড-ফ্লু আক্রমণ। এসব ধকলের পাশাপাশি বাজারে ডিমের দাম কমে যাওয়ায় অনেক বাধার মাঝেও টিকে থাকা হাতেগোনা খামারিরা চোখে সরষের ফুল দেখতে শুরু করেছেন।