আলাউদ্দিন চৌধুরী
আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে বাস্তবায়নের জন্য ৬২টি প্রকল্প তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে দেশের যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে সড়ক বিভাগ, সেতু কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ রেলওয়ের বেশকিছু প্রকল্পে সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ খুঁজে বের করতে চায় সরকার। বাজেটে সরকারি তহবিলের ওপর চাপ কমাতে বিকল্প অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এজন্য প্রতিবছর পিপিপিতে বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্পের তালিকা এডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু এই খাতে এখনো সফলতা আসেনি। অর্থনীতিবিদরা মনে করে করেন, পিপিপিতে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না আসার অন্যতম কারণ হলো বেসরকারি অংশীদারদের সঙ্গে নেগোসিয়েশনের দক্ষতার অভাব। এজন্য পিপিপি কর্তৃপক্ষকে আরো কার্যকর করতে হবে।
উল্লেখ্য, পিপিপি প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নে কার্যকরী উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ রয়েছে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোকে মোট বিনিয়োগ প্রকল্পের ৩০ শতাংশ পিপিপির আওতায় বাস্তবায়নের নির্দেশনা রয়েছে। সরকারের সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার হিসাব মতে, রূপকল্প ২০২১ ও ২০৪১ সালের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে দেশের অবকাঠামো ও সেবা খাতে প্রতিবছর বিনিয়োগ প্রয়োজন মোট দেশজ উত্পাদনের (জিডিপি) ৬ শতাংশ বা প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার, যেখানে পিপিপির মাধ্যমে পূরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে জিডিপির ১ দশমিক ৮ শতাংশ বা প্রায় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার, যা অবকাঠামো ও সেবা খাতের মোট বিনিয়োগের ৩০ শতাংশ।
আসছে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের জন্য ২ লাখ ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকার নতুন বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি)। এডিপিতে সর্বোচ্চ এক-পঞ্চমাংশের বেশি প্রায় ৫২ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা (২৬.০৫%) বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে পরিবহন খাতে। এছাড়াও পরিবহন খাতে পিপিপির প্রকল্পেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আগামী অর্থবছরে এডিপিতে পিপিপি প্রকল্প তালিকায় রয়েছে বেশ কয়েকটি বিদ্যমান সড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ প্রকল্প। এর মধ্যে রয়েছে টঙ্গী-কালীগঞ্জ-ঘোড়াশাল-পাঁচদোনা আঞ্চলিক মহাসড়ক, ভাঙ্গা-বরিশাল মহাসড়ক, খুলনা-মংলা (দিগরাজ) মহাসড়ক, রাজশাহী-নবাবগঞ্জ-সোনামসজিদ মহাসড়ক, কাশিনাথপুর-পাবনা-দাশুরিয়া-বনপাড়া মহাসড়ক, ঢাকা (কাঁচপুর)-ভৈরব-জগদীশপুর-শায়েস্তাগঞ্জ-সিলেট-তামাবিল-জাফলং মহাসড়ক চার লেনে উন্নীতকরণ ছাড়াও যাত্রাবাড়ী-মাওয়া-ভাঙ্গা-বরিশাল-পটুয়াখালী মহাসড়কের ভাঙ্গা সার্ভিস এরিয়া নির্মাণ প্রকল্প উল্লেখযোগ্য।
রাজধানী ঢাকার সঙ্গে বন্দর নগরী চট্টগ্রামের যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করতে এ পথে একটি এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। দেশের অর্থনৈতিক লাইফলাইন হিসেবে বিবেচিত প্রায় ২২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ রুটে এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে বাস্তবায়নের কথা চিন্তা করছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। বেশ কয়েকবছর ধরে এটি পিপিপিতে বাস্তবায়নের জন্য তালিকাভুক্ত থাকলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।
রাজধানী ঢাকাকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে চার পাশে আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল নির্মাণ করার প্রকল্প রয়েছে পিপিপিতে। এছাড়া সেতু কর্তৃপক্ষের প্রকল্প হচ্ছে—ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রকল্প, এম আরটি লাইন-২, লাইন-৪ প্রকল্প। পিপিপিতে বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ের বেশ কিছু প্রকল্প রয়েছে। এরমধ্যে ঢাকা শহরের চারদিকে বৃত্তাকার রেললাইন নির্মাণ, ঢাকা-বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন ও ঢাকা কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে মাল্টিমোডাল হাব নির্মাণ, চট্টগ্রামে ও খুলনায় রেলওয়ের জমিতে শপিংমল কাম গেস্ট হাউস নির্মাণ উল্লেখ্যযোগ্য। এছাড়া রেলওয়ের জায়গায় বেশ কয়েকটি হাসপাতাল নির্মাণে পিপিপি প্রকল্পও রয়েছে। এছাড়া পিপিপির জন্য বিবেচ্য রয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সাতটি, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের ছয়টি, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের ১৬টি প্রকল্প। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে— খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণ, মিরপুর ৯নং সেকশনে স্যাটেলাইট সিটি নির্মাণ প্রকল্প, মহাখালীতে ৪ হাজার ৬৬২টি ফ্ল্যাট সংবলিত বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট ভবন নির্মাণ প্রকল্প, শান্তিনগর থেকে চতুর্থ বুড়িগঙ্গা ব্রিজ হয়ে ঢাকা-মাওয়া রোডের ঝিলমিল প্রকল্প পর্যন্ত ফ্লাইওভার নির্মাণ এবং মংলা পোর্ট টাওয়ার নির্মাণ ইত্যাদি।