চট্টগ্রামে পথশিশুর সংখ্যা বাড়ছেই

চট্টগ্রাম মহানগরীতে পথশিশুর সংখ্যা বাড়ছেই। নগরীর প্রায় অর্ধশতাধিক বস্তি, নগরীর নানা স্থানে অস্থায়ী ছাউনিতে বসবাসকারী এসব পথশিশুর সংখ্যা কতো তার সঠিক পরিসংখ্যান মিলে না সরকারি-বেসরকারি কোনো সংস্থার কাছেই। টোকাই হিসাবে পরিচিত এসব পথশিশু প্রতিদিন নগরীর সর্বত্র ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে, সিটি কর্পোরেশনের ডাস্টবিনের আশেপাশে পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বোতল, লোহালক্কড়, পলিথিনের সামগ্রী, ভাঙ্গা টিন, কৌটো এবং পুনরুত্পাদনশীল নানা গৃহস্থালী পণ্য কুড়িয়ে দিন শেষে ভাঙ্গারির দোকানে কিলোগ্রাম পরিমাপে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছে। শ্রম অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, সরকার শ্রমজীবী শিশুদের কাজের প্রকার ভেদে শ্রমের যে প্রকার নির্ধারণ করেছেন, সে অনুসারে ভাগাড়ে-ডাস্টবিনে প্লাস্টিক, লোহা ও অন্যান্য পরিত্যক্ত সামগ্রী সংগ্রহকারী শিশুদের শ্রমকে ‘বিপজ্জনক’ শ্রম হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।দেশের নানা স্থান থেকে চট্টগ্রাম মহানগরীতে রিক্সা চালনা, ঠেলাগাড়ি চালনা এবং নানা বাণিজ্যিক এলাকায় অস্থায়ী শ্রমিক হিসাবে কাজ করার জন্য প্রাপ্তবয়স্ক যে বিপুল সংখ্যক মানুষের আগমন ঘটেছে, তার পাশাপাশি অপ্রাপ্তবয়স্ক পথশিশু তথা শিশু শ্রমিকের আগমনের সংখ্যা নেহায়েত্ কম নয় বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন। এসব শিশুর অনেকে এসেছে তাদের পরিবারের সাথে। কারো বা জন্ম বস্তি কিংবা পথের পাশের ঝুপড়িতে। নগরীতে বিদ্যমান এবং চলমান শিশু উন্নয়নমূলক সরকারি-বেসরকারি বহু কর্মসূচিতেই এসব শিশুর সিংহভাগ অন্তর্ভুক্ত নয়। পরিসংখ্যান এবং হিসাবের বাইরের এই শিশুরা একদিকে যেমনি নিজের জন্য পরিবারের জন্য বিপজ্জনক টোকাইয়ের পেশায় নিয়োজিত, অন্যদিকে মাদক-পাচারসহ নানা ধরনের সমাজবিরোধী কাজেও এদের ব্যবহার করছে নগরীর দুর্বৃত্তরা। এসব শিশুর অনেকে নানা ধরনের মাদকে আসক্ত বলেও জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো। চট্টগ্রামের যুগ্ম শ্রম পরিচালক রুহুল আমিন ‘ইত্তেফাক’-কে বলেন, আইএলও কনভেনশন এবং বাংলাদেশের শিশুশ্রম নীতি অনুসারে এখানে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ। তবে ২০০৬ সালে প্রণীত বাংলাদেশ শ্রম আইনে শিশু ও কিশোর শ্রমিকদের নিয়োগের ব্যাপারে কিছু নীতিমালা সুনির্দিষ্ট করা আছে। এই আইনের ৪৪ ধারায় তার কিছু ব্যতিক্রম বিশেষ কিছু শর্তে শিশু ও কিশোর শ্রমকে অনুমোদন করে। এই আইনে ১৪ বছরের নীচে সব ছেলেমেয়েকে শিশু হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। যাদের বয়স ১৪ থেকে ১৮ তারা কিশোর-কিশোরী হিসাবে ঘোষিত হয়েছে। সে অনুসারে লেখাপড়ায় নিয়োজিত ১২ থেকে ১৪ বছরের শিশুদের হালকা কাজে নিয়োজিত করা যাবে। আর লেখাপড়ায় নিয়োজিত ১৪ থেকে ১৮ বছরের কিশোর-কিশোরীদের ৫ ঘণ্টার বেশি কোনো শ্রমে নিয়োজিত করা যাবে না। যুগ্ম শ্রম পরিচালক আরো জানান, যেসব শিশু ইট ভাঙ্গা কিংবা ভাগাড়-ডাস্টবিন থেকে পরিত্যক্ত সামগ্রী সংগ্রহ করে জীবিকায় নিয়োজিত তাদের শ্রমকে শ্রম আইনে ‘বিপজ্জনক’ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তার মতে, এসব শিশুকে উদ্ধার এবং পুনর্বাসন প্রয়োজন। চট্টগ্রামে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে নিয়োজিত এনজিও বাংলাদেশ ইন্টিগ্রেটেড সোশ্যাল এডভান্সমেন্ট প্রোগ্রাম (বিশাপ)-এর নির্বাহী পরিচালক এসএম তারেক জাওয়েদ ইত্তেফাক-কে বলেন, সারাদেশে পথশিশুর সংখ্যা কতো—এ বিষয়ে একটি সার্ভে রিপোর্ট সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। চট্টগ্রামসহ সারাদেশে এখনো বিপুলসংখ্যক শিশু পুনর্বাসন ও উন্নয়ন কর্মসূচির বাইরে রয়েছে। এনজিওগুলো যা করছে তা বিভিন্ন ক্যাচমেন্ট এলাকায় সীমিতভাবে। সরকার যদি সরকারি-বেসরকারি সংস্থাসমূহের সমন্বয়ে বড় কোনো উদ্যোগ না নেয় তাহলে এসব পথশিশুকে কিছুতেই জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় আনা যাবে না। আর তা করা না গেলে দেশের একটি বিরাট সম্ভাবনাকে অপচয়ের দিকে ঠেলে দেয়া হবে বলে তিনি মনে করেন। তিনি জানান, তার সংস্থা বিশাপ পাহাড়তলীসহ চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে ১৪টি সেন্টারের মাধ্যমে সাড়ে চারশ’ শিশুকে নানা ধরনের কারিগরি প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। যাতে করে তারা বেরিয়ে গিয়ে মেকানিক, ইলেক্ট্রিশিয়ান, ওয়েল্ডার এবং ‘সেলফোন ইঞ্জিনিয়ার’ হিসাবে নিজেরাই দোকান খুলে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। নগরীর নাসিরাবাদ এলাকার ভাঙ্গারির দোকানের কিশোর ম্যানেজার আরমান জানালো, এই দোকানে ৭ জন প্রাপ্তবয়স্ক কর্মচারী আছে যারা সারাদিন নগরীর ডাস্টবিন, ভাগাড় ও আবর্জনা ঘেঁটে প্লাস্টিকের বোতল ও পরিত্যক্ত গৃহস্থালি সামগ্রী সংগ্রহ করে থাকে। তাদেরকে সংগৃহীত সামগ্রীর মূল্য কেজি দরে পরিশোধ করা হয়ে থাকে। অন্যদিকে ৬/৭ জন শিশুশ্রমিকও পরিত্যক্ত সামগ্রী নিয়ে এসে থাকে। তাদের কাছ থেকে ১ কেজি প্লাস্টিকের বোতল কেনা হয় ২৭ টাকায়। পরিত্যক্ত লোহা কেনা হয় ১ কেজি ২৬ টাকায়। ভাঙ্গা টিন কৌটা কেনা হয় প্রতি কেজি ২৩ টাকায়। এসব শিশু দিনে ৯০ টাকা থেকে ১০০ টাকা আয় করে থাকে।