সমগ্র ভারতবাসীর দীর্ঘ উত্তেজনাকর অপেক্ষার অবসান হয়েছে গতকাল। সাত দফার ভোট গ্রহণ শেষে গতকাল ঘোষিত লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল যেন আলোচিত বুথ ফেরত সমীক্ষার প্রতিচিত্র। ইতোমধ্যে সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে প্রত্যাশার চাইতেও বেশি আসন জিতে "্বিতীয়বারের মতো ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন নরেন্দ্র মোদি। সর্বশেষ ফলাফলে দেখা যাচ্ছে বিজেপি এককভাবেই টপকে গেছেন ম্যাজিক ফিগার ২৭২। বিজেপি একাই জিতেছে ৩০২ আসন। সবমিলিয়ে তাদের জোট এনডিএ পেয়েছে ৩৫৩ আসন। অন্যদিকে কংগ্রেসের নেতৃত্বে সম্মিলিত ২২ দলীয় জোট বুথে ফেরত সমীক্ষাকে উড়িয়ে দিলেও তাদের ভরাডুবি হয়েছে। ফলাফল স্পষ্টভাবেই বলে দিচ্ছে যে, মোদি-অমিত শাহ তথা বিজেপির বিরু"ে বিরোধীদের আনীত অভিযোগ এককথায় প্রত্যাখ্যান করেছেন ভোটাররা। তার প্রতিফলন দেখা যায় উত্তর প্রদেশে। অখিলেশ যাদব সমীক্ষা পরবর্তী প্রতিক্রিয়াও ব্যর্থ হয়ে যায়। অখিলেশের দাবি মতো উত্তরপ্রদেশে তাদের জোট ৫০-এর বেশি আসনে জিততে পারেনি উল্টো বিজেপি ও তার মিত্ররা ৫৮ আসন জিতে নিজেদের জয়যাত্রা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে ভোটের পরেও বিরোধী ঐক্যের ধারাবাহিকতা রক্ষায় অন্রের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডুর ভ"মিকা কার্যত লজ্জার কারণ হয়ে উঠেছে। অবিজেপি সরকার গঠন করার এই প্রক্রিয়া সাফল্য পেতো যদি লোকসভার ফলাফল ত্রিশঙ্কু হতো। যেমনটি অনেকেই বুথ ফেরত সমীক্ষাকে বাগাড়ম্বর ভেবে আঞ্চলিক দলগুলোর দিকে তাকিয়েছিল। সবার মধ্যেই এমন একটি ধারণা ছিল যে বিজেপি বিরোধী এই তৃতীয় জোট পূর্বের চাইতে ভালো ফল করবে। ঐ আলোকেই কেন্দ্রে বিজেপিকে ঠেকানোর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু ফলাফলে বিজেপি, কংগ্রেসে ও তৃতীয় জোটের আসন বিন্যাস যা দাঁড়াবে তাতে বিরোধীদের অস্তিত্বই হুমকির মুখে। এমতাবস্থায় মোদি বিজেপির অব্যাহত জয়যাত্রা ভারতের আগামী সরকারকে আরো শক্তিশালী করবে বলে ধরে নেয়া যাচ্ছে।
২৯টি রাজ্য ও ৭টি ইউনিয়ন টেরিটরি নিয়ে গঠিত ফেডারেল ভারতের রাজনৈতিক প্রশাসনের কাঠামো অত্যন্ত জটিল। এখানে একটু উল্লেখ করা দরকার যে, ইন্ডিয়ান ইউনিয়নের অংশ ২৯ রাজ্যেরই আছে নিজস্ব সরকার ও সংসদ। অন্যদিকে ৭টি ইউনিয়ন টেরিটরি বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মধ্যে শুধুমাত্র দিল্লি ও পদুচেরির আছে নিজস্ব সংসদ ও সরকার। মূলত রাজ্য সংসদ বিধানসভার জয়ী দল সংশ্লিষ্ট রাজ্যে প্রাদেশিক সরকার গঠনের ম্যান্ডেট পেয়ে থাকেন। অন্যদিকে "্বিকক্ষবিশিষ্ট ভারতীয় সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভা উচ্চকক্ষের নাম রাজ্যসভা। ৫৪৩ আসনবিশিষ্ট লোকসভার সদস্যরা সরাসরি জনগণের ভোটে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হয়ে থাকেন। সরাসরি ভোটে জয়ী দলই সমগ্র ভারতের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ফেডারেল আইনের আওতায় কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালনার ম্যান্ডেট পেয়ে থাকেন। তাই লোকসভা নির্বাচন হচ্ছে ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। বহুসংখ্যক রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহনে এবারের নির্বাচনী আবহ ছিলো অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ ও অনিশ্চতায় ভরপুর। এক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষে প্রগতিশীল শক্তি জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ এলায়েন্স ও হিন্দু জাতীয়তাবাদী ক্ষমতাসীন বিজেপির নেতৃত্বেও ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স ক্ষমতার প্রধান প্রতি"্বন্"্ব্বী। পাশাপাশি দুই জোটের বাইরে অসংখ্য আঞ্চলিক দল এরমধ্যে উত্তর প্রদেশের সমাজবাদী পার্টি, বহুজন সমাজবাদী পার্টি, পশ্চিম বাংলায় বামফ্রন্ট ও তৃণমূল কংগ্রেস, বিহারে রাষ্ট্রীয় জনতা দল ও সংযুক্ত জনতা দল, মহারাষ্ট্রে এনসিপি ও শিবসেনা, কেরালায় বামফ্রন্ট, কর্ণাটকে জনতা দল সেক্যুলার, তামিলনাড়ুতে ডিএমকে ও এআইএডিএমকে, উড়িস্যায় বিজেডি, অন্রপ্রদেশে টিডিপি ও ওয়াইএসসিপি উল্লেখযোগ্য। এই ছোট দলগুলো আগামী সরকার গঠন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভাবা হয়েছিল। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী এই আঞ্চলিক দলগুলোর বিজেপি ঠেকানোর প্রক্রিয়ায় উত্তর প্রদেশের অখিলেশ যাদব, মায়াবতী ও বাংলার মমতা নির্বাচনী মাঠে প্রায় যু" শুরু করেছিলেন। যে কারণে তৃতীয় শক্তির এই দলগুলো নিজেরা সরকার গঠনের মতো প্রয়োজনীয় আসন না জিতলেও তাদের সঙ্গে নিয়ে কংগ্রেস বিজেপি ঠেকাতে চেয়েছিল। এক্ষেত্রে বিজেপি প্রায় বন্ুশূন্য করতেও সক্ষম হয়েছিল বিরোধীরা। একই সঙ্গে ভোট শেষ হতে না হতেই বিজেপির কাশ্মির নীতির বিরোধিতা করেছেন এনডিএ জোটের অন্যতম শরিক নেতা বিহারের মুখ্যমন্ত্রী নিতিশ কুমার। সংবিধানের ৩৭০ ও ৩৫ ধারা সংক্রান্ত নিতিশের সর্বশেষ বক্তব্য অনেকটাই রহস্যজনক এবং বিজেপির অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কিন্তু কোনো কিছুই কাজে আসেনি। মোদি ঝড়ে একেবারে উড়ে গেছে বিরোধীরা। এক্ষেত্রে কংগ্রেস ও তার জোট ইউপিএ আসন বেড়েছে। একই সঙ্গে কংগ্রেসের সঙ্গে আঞ্চলিক দলগুলোর জোটের কার্যকারিতা দেখা গেলো তামিলনাড়ু ও কেরালায়। এই দুই রাজ্যে বিজেপি পাত্তাই পায়নি বলা চলে। অন্যদিকে তৃতীয় জোট যেমন আসন বাড়াতে পারেনি তেমনি একেবারে নিঃশেষের পথে বামেরা।
আসন বিন্যাসে এগিয়ে থাকা রাজ্যগুলোর মধ্যে উত্তরপ্রদেশ অখিলেশ-মায়াবতী জোট অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছে। যদিও এখানে বিজেপির আসন কমেছে। কিন্তু তার প্রভাব পড়েনি। ৪৮ আসনের মহারাষ্ট্রেও আগের চেয়ে বেশি আসনে জয়ী হয়েছে বিজেপি ও শিবসেনা। একই অবস্থা অন্যান্য রাজ্যেও। ৪২ আসনের পশ্চিম বাংলা ১৭ আসন জিতেছেন বিজেপি। ৪০ আসনের বিহারে এনডিএ জোটের আসন ৩৮। একই সঙ্গে কর্ণাটক, রাজস্থান, গুজরাট, উড়িষ্যা, ছত্তিশগড়, মধ্যপ্রদেশ সব রাজ্যেই ২০১৪ সালেরই প্রতিচ্ছবি। সেবার প্রগতিশীল দলগুলোর মধ্যে অনৈক্য ছাড়াও মোদি ঝড়েই কাবু হয়েছিল বিরোধীরা। কিন্তু এবার একই অবস্থা কেন হলো?
বিভিন্ন কারণেই এবারের ফলে সামগ্রিক নির্বাচনের সমীকরণে ছিলো অনেকটাই ভিন্ন আমেজ। বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশ। এখানে মায়াবতী ও অখিলেশ যাদবের মহাজোটের আরো বেশি সাফল্যের প্রত্যাশা করেছিলেন সবাই কিন্তু তাদের জোট উত্তর প্রদেশের ৩৮ শতাংশ সংখ্যালঘু দলিত ভোট ব্যাংক থাকা সত্ত্বেও সাফল্য অনেক কম। দুই দল মিলে পেয়েছে ২০ আসন। স্মৃতি ইরানির কাছে রাহুলের ধরাশায়ী হওয়া বাদ দিলেও এখানে বিরোধীরা একেবারেই নিষ্প্রভ। এছাড়াও গতবছর অনুষ্ঠেয় আরো পাঁচটি রাজ্যের নির্বাচনে কংগ্রেসের কাছে হেরে তিন রাজ্যের ক্ষমতা হারায় বিজেপি। অন্যদিকে ২০১৭ সালে মোদির রাজ্য গুজরাটের বিধানসভা নির্বাচনেও ব্যাপক সাফল্য পেয়েছিল কংগ্রেস। কিন্তু লোকসভা নির্বাচনে তার কোনো প্রভাবই পড়লো না। এর আগে রাফায়েল যু"বিমান ক্রয় সংক্রান্ত অনিয়ম, কৃষকদের দুরবস্থা, ধর্মীয় বি"্বেষ ছড়ানো ইত্যাদি ইস্যুতে আগে থেকেই সোচ্চার হয়েছিলেন বিরোধীরা।
সবমিলিয়ে বিজেপি ও এনডিএ জোটের এই সাফল্য ছিল তাঁদের দীর্ঘ প্রচেষ্টা ও পরিশ্রমের ফল। বিশেষ ব্যক্তি মোদির একনিষ্ঠ প্রচেষ্টা সব বিতর্ক ও বাধা ছাপিয়ে প্রত্যাশিত জয়ের মাধ্যমে মোদি নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তার এই বিজয় ভারতকেই শক্তিশালী ও সমৃ" করবে। অন্যদিকে এক্ষেত্রে গত লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের শোচনীয় ফলাফলের হতাশা থেকে দলটি কিছুটা হলেও ঘুরে দাঁড়ালো। প্রায় একশ'র মতো আসন জিতে কংগ্রেস ও ইউপিএ জোট কিছুটা হলেও উজ্জীবিত। কারণ বিভিন্নভাবেই অনুমান করা গেছে যে কংগ্রেসের টার্গেট ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচন। তাই কংগ্রেসের এবারের সাফল্য ব্যর্থতা নিয়ে বেশি কিছু না বলাই শ্রেয়। কিন্তু এরমধ্যে যে কথাটি না বলেই নয় তা হচ্ছে আমেথি। এই আসনে রাহুলের পরাজয় কংগ্রেসের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। একই সঙ্গে উত্তর প্রদেশ নিয়ে কংগ্রেসকে ভাবতে হবে নতুন করে। অন্যদিকে তামিলনাড়ু ও কেরালায় কংগ্রেসের সঙ্গে আঞ্চলিক দলগুলোর ঐক্য এবং ঐ ভিত্তিতে তাঁদের সাফল্য সবারই নজর কাড়বে। বিশেষ করে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করতে নারাজ আঞ্চলিক দলগুলোর উপলবিগত পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে। এই নির্বাচনে কংগ্রেসের সাফল্য এইটুকুই। অন্যদিকে পশ্চিম বাংলা, উড়িষ্যার আরো বেশি সাফল্য পাওয়ার মধ্যদিয়ে মোদির বিজেপি সর্বভারতীয় মানুষের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। এখন দেখতে হবে তার "্বিতীয় মেয়াদে ভারত কতদূর যেতে পারে।
হ লেখক :বিশ্লেষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা