আমরা কবে বদলে যাব বদলে দেব

 

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুেকন্দ্রের গ্রিনসিটি প্রকল্পের ১১০ ফ্ল্যাটের জন্য আসবাবপত্র কেনা ও ওঠানোর কাজে অস্বাভাবিক ব্যয় নিয়ে দেশজুড়ে যখন তোলপাড় চলছে, সেখানকার প্রতিটি বালিশের দাম ৫৯৫৭ টাকা আর বিভিন্ন ভবনের ২০ তলায় একটি বালিশ ওপরে ওঠানোর জন্য ৭৬০ টাকা ব্যয়ের ঘটনাটি যখন আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তখন জাপানের তিন নির্মাতা কোম্পানি তিনটি সেতুর নির্মাণ ব্যয় থেকে বেঁচে যাওয়া ৭৩৮ কোটি টাকা সরকারকে ফেরত দিয়ে চমক দেখিয়েছে। সততা, নিষ্ঠা, পরিশ্রম, আত্মনিবেদন, দায়বদ্ধতা ও অঙ্গীকার দিয়ে  দেশ ও জাতির উন্নতির জন্য কিভাবে কাজ করতে হয় তা শিখিয়ে দিয়েছে। সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টজনের তথ্যানুসারে, জাপানের তিনটি নির্মাতা কোম্পানি কাঁচপুরের দ্বিতীয় সেতু যা এর মধ্যে উদ্বোধন করা হয়েছে, মেঘনা-গোমতী দ্বিতীয় সেতু নির্মাণ এবং মেঘনা-গোমতী পুরাতন সেতু পুনঃনির্মাণের কাজ পেয়েছিল। কিন্তু হলি আর্টিজানের ঘটনায় প্রায় ছয় মাস কাজ বন্ধ রাখার কারণে এ প্রকল্পের মেয়াদ আরো ছয় মাস বাড়ানোর জন্য আবেদন করেছিল এবং বাড়ানোও হয়েছিল। তবে সেই ছয় মাস তো দূরের কথা, আগের এক মাস হাতে থাকতেই তারা নির্মাণকাজ শেষ করেছে। শুধু তাই নয়, তিন সেতুর নির্মাণ ব্যয় থেকে বেঁচে যাওয়া টাকা সরকারকে ফেরতও দিয়েছে।

আমাদের দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যখন নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করে বরং দফায় দফায় প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে নিজের পকেটে টাকা রাখার ধান্দায় থাকে, তখন নির্ধারিত সময়ের আগে কাজ শেষ করে বেঁচে যাওয়া টাকা ফেরত দিয়ে জাপানি নির্মাণ কোম্পানি সততা ও নিষ্ঠার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এর মধ্য দিয়ে তারা আমাদের বুঝিয়ে দিল, একটি দেশ ও জাতিকে উন্নতির শিখরে পৌঁছতে হলে প্রয়োজন পরিশ্রম, সততা, নিষ্ঠা, অঙ্গীকার এবং দায়বদ্ধতা। তারা যে অঙ্গীকার করেছিল, তারা সেই অঙ্গীকার রক্ষা করেছে। অঙ্গীকার রক্ষা করতে গিয়ে তারা অসদুপায় অবলম্বন করেনি।

আমাদের দেশে এই গুণাবলির বড়োই অভাব। দেশীয় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেই  বোঝা যায়। অনেক রাস্তা আছে নির্মাণের কিছুদিন পরেই খানাখন্দ তৈরি হয়ে যায়, ইট-বালি-সিমেন্ট পরিমাণমতো না দেওয়ায় এবং গুণগত মান রক্ষা না করায় সেগুলো অল্প দিনের মধ্যে উঠে যায়। অনেক সেতু আছে যেগুলো বছর বছর নির্মাণ করতে হয় কিংবা নির্মাণের কাজ দেখাতে হয়, অনেক রাস্তা ও সেতু আছে যেগুলো খাতা-কলমে নির্মাণ হয়ে আছে কিন্তু বাস্তবে এর অস্তিত্ব নেই। অনেক বাসস্থান নির্মাণেও রয়েছে টাকা আত্মসাত্, প্রতারণা ও দুর্নীতির মতো নানা ছলচাতুরী। এ অবস্থায় কী করে আমাদের দেশ উন্নতি করবে? উন্নতি করলেও কতদিন উন্নয়নের সেই ধারা টেকসই হবে? আমাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ, দেশপ্রেম, সততা, পরিশ্রম ও নিষ্ঠার অভাব আছে। সবকিছুতেই এখন দুই নম্বরি কারবার। খাদ্যে ভেজাল আর ফরমালিন মেশানো, সেতু-ঘর নির্মাণে রডের পরিবর্তে বাঁশ, অফিস-আদালতে ঘুষের কারবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষায় নকল ও প্রশ্নফাঁস প্রভৃতি। এ দেশকে উন্নতি করলে হলে প্রথমত দেশের মানুষকে উন্নত করতে হবে। শিক্ষা-দীক্ষায়, আচার-ব্যবহারে, স্বভাব-চরিত্রে মানুষকে উন্নত হতে হবে। তবেই এ দেশ যথাযথভাবে উন্নতি লাভ করবে। আমার-আপনার এই দেশ উন্নতি করুক—এটাই কামনা।

ঢাকা