পশ্চিমবঙ্গ

জোড়াফুল ঝরে ফুটছে পদ্ম!

ভারতের বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেসের একটা নির্বাচনী বিজ্ঞাপন প্রচার হচ্ছে। দিকে দিকে যাচ্ছে দেখ তৃণমূল... দেশটা জুড়ে ফুটছে শুধু জোড়া ফুল। জোড়া ফুল তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রতীক। মমতা নিজের কণ্ঠে ভোটারদের কাছে আহ্বান জানিয়েছেন জোড়াফুলে ভোট দেয়ার জন্য। বিজ্ঞাপনে মমতাকে বলতে শোনা যায়, এবারের লোকসভা নির্বাচন অনেক দিক দিয়েই ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। তাই ভোট দেয়ার আগে অনেক ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করতে অনুরোধ করেন তিনি। মমতা দাবি করেছেন ভারত জুড়ে এবার কেবলই জোড়াফুল ‘ফুটছে’। অর্থাত্ তার দল তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গের গন্ডি ছাড়িয়ে পৌঁছে গেছে এ রাজ্য থেকে ও রাজ্যে। ভোটাররা ইচ্ছা করলে সোনিয়া গান্ধীর দল কংগ্রেসকে ‘গুডবাই’ জানিয়ে, তৃণমূলকে লোকসভার চাবিকাঠি তুলে দিতে পারে। ভারতবাসী এবার কংগ্রেসকে বিদায় জানানোর জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে, এটা মোটামুটি বিভিন্ন জরিপে পরিষ্কার। কিন্তু তার বদলে তৃণমূল কংগ্রেসকে বরণ করতে চাইছে এমন আলামতও তেমন মিলছে না। খোদ মমতা ব্যানার্জির রাজ্য পশ্চিমবঙ্গেই দেখা যাচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেসের জোড়াফুল সমর্থকরা মোদী হাওয়ায় উড়ছে। ভারতের বিভিন্ন মিডিয়ার রিপোর্ট অনুযায়ী, গোটা পশ্চিমবঙ্গে মমতা অসংখ্য তৃণমূল সমর্থক এবারের লোকসভা নির্বাচনে হাত থেকে ফেলে দিচ্ছে ‘জোড়াফুল’। পরিবর্তে তুলে নিচ্ছে ‘পদ্মফুল’ (বিজেপির নির্বাচনী প্রতীক)। তবে মমতা ব্যানার্জিকে যে তারা পরিত্যাগ করেছেন তেমন নয়। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, পশ্চিমবঙ্গে চালানো একাধিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, রাজ্যবাসীর কাছে যদি প্রশ্ন করা হয় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে কাকে চান? তখন বেশিরভাগ উত্তরদাতা মমতা ব্যানার্জির নাম বলবেন। আর যদি বলা হয়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কাকে চান? তখন তাদের মুখ থেকে যার নাম বের হচ্ছে তিনি মমতা ব্যানার্জি নন। তার নাম নরেন্দ্র মোদী! অর্থাত্ মমতাকে এখনো ভারতের শাসনকার্য চালানোর জন্য ‘যোগ্য’ হিসেবে মনে করছেন না পশ্চিমবঙ্গবাসী। টিভি চ্যানেলগুলোতেও যখন পশ্চিমবঙ্গ ভোটাররা কথা বলছেন তখনও দেখা যাচ্ছে কংগ্রেসবিরোধী মনোভাব প্রবল হয়ে উঠেছে। তারা এবার পরিবর্তন চাইছেন। কিন্তু সেই পরিবর্তিত আসনে তৃণমূল কংগ্রেসকে বসাতে রাজি নন তারা। সেখানেও লেগেছে মোদী হাওয়া। সামান্য হলেও পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান ভোটারদের একটি অংশ এবার পদ্মফুল প্রতীকে ভোট দিতে যাচ্ছে। অপরদিকে, টাইমস অব ইন্ডিয়ার অতি সাম্প্রতিক এক রিপোর্টে জানানো হয়, পশ্চিমবঙ্গের আদিবাসী এলাকাগুলোও এবার জোড়াফুলের পরিবর্তে পদ্মফুলে সয়লাব! প্রতিবেদক লেখেন, বোলপুর-শান্তিনিকেতন পেরিয়ে সোনাঝুরির ঢাল বরাবর বাঁ-দিকে নেমে গেলেই যে গ্রামটা প্রথম চোখে পড়বে, তার নাম বনেরপুকুরডাঙা। আরও খানিকটা ভেতরে ঢুকলে চোখে পড়বে একটি শিশুশিক্ষা কেন্দ্র। সেই স্কুলের একমাত্র দিদিমণি বাসনা দত্ত। বাড়ি বল্লভপুরে। তিনি জানালেন, এই গ্রামে একবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি এসেছিলেন। স্কুল লাগোয়া বাড়ির গৃহিণী চিত্রা মাড্ডিকে আশ্বাস দেন, ঝড় বৃষ্টিতে পড়ে যাওয়া বাড়িটাকে নতুন করে দিবেন। বছর ঘুরতে চলেছে। চিত্রা মাড্ডির ঘর আরও হতশ্রী হয়েছে। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী আর তার ঘরটির কথা মনে করেননি। গ্রামের চিত্রও আর কোনো কিছু বদলায়নি। চিত্রার কথায়, ‘কথা সবাই দিতে পারে, রাখা অত সহজ নয়।’ তিনি বলেন, ‘বাজারদর যা বেড়েছে, তাতে বাড়ি তৈরি করার ক্ষমতা নেই। মাঠ থেকে তুলে আনা শাক ছাড়া আর কিছু জোটে না।’ চিত্রাকে লোকসভা নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন করতেই তিনি উত্তর দিলেন, ‘ভোট? ভোট দিতে অবশ্যই যাব। দিদিকে তো আগে দিয়েছি। দিদি কই আমাদের দেখলেন! তিনি কাকে ভোট দিবেন স্পষ্ট করে না বললেও ইঙ্গিত ছিল মোদীর পদ্মফুল প্রতীকের দিকে। চিত্রার বাড়ির পরে লিদু মুর্মুর বাড়ি। লিদুর আক্ষেপ, ‘মমতা দিদির প্রতি ভরসা করেছিলাম। উনি আমাদের দেখলেন না। তাই এবার আর দিদিকে ভোট দিব না। সিপিএমকেও না।’ তবে কাকে ভোট দেবেন লিদু? এ প্রশ্নে তার উত্তর -এবার পদ্মফুলে ছাপ দিয়ে দেখতে হবে।’ লিদুর সঙ্গে থাকা মণীন্দ্র হেব্রমের গলাতেও এক সুর। তিনি বললেন, ‘শুনছি পদ্মফুলের লোকেরা দেশের রাজা হলে সবাইকে চাকরি দিবে। তাই ওদেরকেই এবার ভোট দিয়ে দেখতে হবে। শ্রীনিকেতনের কাছেই রয়েছে মোলডাঙা গ্রাম। সেখানকার গৃহবধূ মণিমালা মাহাড়ার কথায়, ‘পদ্মফুলের লোকেরা এসেছিল। বলেছে, ওরা সরকারে এলে আমাদের ছেলেগুলোকে চাকরি দিবে। ওই গ্রামেরই রঞ্জিত প্রামাণিক জানালেন, মোলডাঙা ব্লকের অন্তর্গত মোলডাঙাসহ দুর্গানগর, কালিপাড়া, নতুনপাড়া, টাকপাড়ার মতো গ্রামেও বিজেপির লোকেরা আসত। মণিমালা বলেন, সন্ধ্যাবেলায় পাড়ার আসরে ভোট নিয়ে অনেক কথা ওঠে। তাতেই শোনা যায়, দিল্লিতে এবার ওরাই আসবে। তাই বোলপুর লোকসভা কেন্দ্রেও ওদের লোক থাকলে আমাদের সুবিধে হবে। তৃণমূল সরকারের লোক থাকলে চলবে না।’ সিউড়ি থেকে প্রায় দশ-বারো কিলোমিটার দূরে আরও একটি আদিবাসী গ্রাম নিমডাঙা। এটি বীরভূম লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে পড়ে। এই গ্রামের মোড়ল গোপাল সোরেনের বয়স সত্তরের ঊর্ধ্বে। তিনি বলেন, এই গ্রামের কমবয়সি ছেলেদের মধ্যে পদ্মফুলে ছাপ দেয়ার একটা ঝোঁক তৈরি হয়েছে। তবে বুড়োদের ভোটটা ভাগাভাগি হয়ে যাবে। কেউ কাস্তেতে দেবে আবার কেউ জোড়া ফুলে, কেউবা পদ্মফুলে। এ বছর প্রথম ভোটার হওয়া রামদেব মাড্ডি বলেন, পদ্মফুলের হাওয়া উঠেছে।’ আরেক গ্রামবাসী সুশীল মাড্ডি বলেন, ‘দিদি আমাদের মোড়লকে উঠিয়ে দেবেন বলেছেন। তবে আমরা কি হিন্দুমন্দিরে গিয়ে বিয়ে করব? হিন্দু মন্দিরে বিয়ে করতে গেলে অনেক খরচ। তাছাড়া পণ লাগে। অত খরচ দিতে পারব না। আমার চারটে মেয়ে আছে। তাই আর ঝুঁকি নিতে পারব না। মমতা দিদির উপর আর ভরসা নেই।’ একই গ্রামের প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক অম্বুজাক্ষ মণ্ডল বলেন, ‘এই গ্রামে নতুন করে সিপিএমের লোকদের যাতায়াত শুরু হয়েছে। পদ্মফুলের লোকেরাও ভোট চাইতে আসে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত তৃণমূলের কাউকে প্রচারে দেখা যায়নি।’ বীরভূম আদিবাসী নেতা সুনীল সোরেন বলেন, ‘বীরভূমের আদিবাসী সমাজ সিপিএম বা তৃণমূল, কারও কাছ থেকে কোনও সুবিধা পায়নি। তাই ওরা এখন বিজেপির দিকে ঝুঁকছে।’ বীরভূমের বিজেপি প্রার্থী জয় ব্যানার্জি বলেন, তাদের সমীক্ষা রিপোর্টে আদিবাসী সমাজের কাছে বিপুল সাড়া পাওয়া গেছে।’ বিজেপির জেলা সম্পাদক দিলীপ ঘোষ বলেন, ‘কেবল আদিবাসী নয়। সব ধর্মগোত্রের মধ্যেই বিজেপি হাওয়া বইছে। আদিবাসী সংগঠনগুলো মার্চ মাস থেকেই তাদের দলের লোকদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করে। অনেক গ্রাম ধরে সরাসরি সমর্থন জানিয়েছে। ‘ভারত জাকাত মাঝি পরগনা মহল’ নামের মাঝি সংগঠন বিজেপিকে সমর্থন দিয়েছে। এই সংগঠনের নেতা নিত্যানন্দ হেমব্রম বলেন, ‘তৃণমূলকে আমাদের সমাজের কেউ ভোট দিবে না। আমরা বোঝাচ্ছি কেউ যেন সিপিএমকেও এবার ভোট না দেয়।’ বিজেপির পশ্চিমবঙ্গের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা বলেন, রাজ্যে বিজেপির নির্বাহী সদস্য কয়েকগুণ বেড়েছে। ২০১১ সালে যেখানে ছিল মাত্র ৩ লাখ সদস্য সেখানে ২০১৩ সালেই তা ৭ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। গত ছয় মাসেই দুই লাখের বেশি নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এর কারণ হিসেবে তারা মোদীর প্রধানমন্ত্রী প্রার্থীতার কথা বলছেন। বিজেপির যুব শাখার সদস্য সংখ্যাও গত কয়েক মাসে প্রায় ৫০ হাজার বেড়েছে। একই হারে বেড়েছে নারী শাখার সদস্য সংখ্যা। আরেকজন নেতা বলেন, বিজেপি কিংবা আরএসএস পশ্চিমবঙ্গে আগে কখনো এভাবে ঢেউ তুলতে সক্ষম হয়নি। বামফ্রন্ট কিংবা তৃণমূলের দিদির রাজত্বে ভোটের আগে বিজেপি এমন ‘দাদাগিরি’ করতে পারবে তা কল্পনাতেও ছিল না বিজেপি নেতাদের।