তারা সত্যিকারের ভবিষ্যত্দ্রষ্টা

শ্রষ্টার আশ্চর্য সৃষ্টি মানুষ। বিশ্বের বুকে পদার্পণের পর থেকেই মানুষ নিজ গুণে প্রাণিকুলের মধ্যে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে এসেছে। নিজের বিস্ময়কর কল্পনাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে নব নব আবিষ্কারের মাধ্যমে মানব সভ্যতার বিকাশ ঘটিয়েছে। একসময় যা ছিল শুধুই কল্পনা, পরবর্তীকালে তার অনেক কিছুই বাস্তবে রূপ দিতে পেরেছেন সৃষ্টিশীল মানুষ। ‘মোনালিসা’ এঁকে জগেসরা চিত্রশিল্পীর মর্যাদা লাভকারী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি তার প্রকৌশল জ্ঞান ও কল্পনাশক্তিকে কাজে লাগিয়ে এক অদ্ভুত আকাশযানের ছবি ও নকশা অঙ্কন করে গিয়েছিলেন যা থেকে পরবর্তীকালে নির্মিত হয়— হেলিকপ্টার। জনপ্রিয় বিজ্ঞান কল্প-কাহিনী লেখক জুলে ভার্নের ‘টোয়েন্টি থাউসেন্ড লিগ্স্ আন্ডার দ্য সি’তে ‘নটিলাস’ নামক যে আশ্চর্য ডুবোযানের বর্ণনা দেয়া আছে, তার সাথে প্রায় শখানেক বছর পর নির্মিত সাবমেরিনের যথেষ্ট মিল খুঁজে পাওয়া যায়। এমনই কয়েকটি উপন্যাস, চলচ্চিত্র ও টিভি সিরিজের কথা আজ তুলে ধরা হলো যেগুলোর ঘটনা পরবর্তী সময়ে আশ্চর্যজনকভাবে বাস্তবের সাথে মিলে গেছে। উপন্যাসের টাইটান জাহাজের মতো নিমজ্জিত হলো টাইটানিকও ১৮৯৮ সালে মর্গান রবার্টসন লিখেছিলেন ‘ফিউটিলিটি, অর দ্য রেক অব দ্য টাইটান’ নামক উপন্যাস যাতে আটলান্টিক মহাসাগরে হিমশৈলের সাথে সংঘর্ষে টাইটান নামক বিশাল এক জাহাজের ডুবে যাওয়ার কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে। ১৪ বছর পর ঠিক একইভাবে হিমশৈলের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে আটলান্টিকে নিমজ্জিত হয় আরএমএস টাইটানিক জাহাজ যে ঘটনা সারা বিশ্বে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। কল্পনার টাইটান ও বাস্তবের টাইটানিক জাহাজ দুইটির নামের মতো বিভিন্ন বিষয়েই রয়েছে প্রায় হুবহু মিল। টাইটানিক জাহাজটির দৈর্ঘ্য ৮৮২ ফুট আর টাইটান ৮০০ ফুট। দুইটি জাহাজই উত্তর আটলান্টিকের একই এলাকায় নিমজ্জিত হয়। হিমশৈলের সঙ্গে দুইটি জাহাজেরই একই অংশে ধাক্কা লাগে। ঐ সময়ে দুইটি জাহাজেরই গতি ছিল প্রায় একইরকম। দুর্ঘটনার সময়টাও আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়। টাইটানিক নিমজ্জিত হয় ১৯১২ সালের ১৪ এপ্রিল রাতে, আর কল্পনার টাইটানও ডুবে এপ্রিল মাসেরই এক রাতে। দুর্ঘটনায় টাইটানিকের ২২০০ যাত্রী ও ক্রুর অর্ধেকের বেশি সাগরে ডুবে ও ঠাণ্ডায় জমে মারা যায়, আর উপন্যাসের টাইটান জাহাজের ২৫০০ যাত্রী ও ক্রুর মধ্যে মারা যায় অর্ধেকেরও বেশি লোক। এইচ জি ওয়েলস-এর বইয়ে পারমাণবিক বোমা! সেই ১৯১৪ সালে বিজ্ঞান কল্প-কাহিনীকার এইচ জি ওয়েলস তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য ওয়ার্ল্ড সেট ফ্রি’তে পারমাণবিক বোমা ও এর ব্যাপক ধ্বংস ক্ষমতার কথা বর্ণনা করে গেছেন। লিখেছেন এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে পুরো পৃথিবী জুড়ে কি সর্বনাশা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মানবজাতিকে এই ভয়াবহ বোমা তৈরির প্রচেষ্টা থেকে বিরত রাখাই হয়তো ছিল লেখকের উদ্দেশ্য; কিন্তু হিতে বিপরীত ঘটে গেল। ১৯৩২ সালে চিকিত্সক লিও জিলার্ড বইটি পড়ে পারমাণবিক বোমা তৈরিতে অনুপ্রাণিত হন। বছরখানেক পরই তিনি নিউট্রন চেইন রি-অ্যাকশন বিষয়টি আবিষ্কার করেন এবং ১৯৩৪ সালে এর প্যাটেন্ট করেন। আর ভয়ংকর পারমাণবিক বোমা তৈরির সূত্রপাতও ঘটলো সেই থেকেই। জুলে ভার্নের বিস্ময়কর উপন্যাস ‘ফ্রম দ্য আর্থ টু দ্য মুন’ ১৮৬৫ সালে জুলে ভার্নে লেখেন তার অনবদ্য সাইন্স ফিকশন উপন্যাস ফ্রম দ্য আর্থ টু দ্য মুন, যাতে ভার্ন চাঁদে মানুষের অভিযানের খুঁটিনাটি বর্ণনা দিয়েছেন। লিখেছেন কিভাবে ‘কলাম্বিয়াড’ নামক মহাকাশযানে করে পৃথিবী থেকে চাঁদে গেলেন তিনজন নভোচারী। কিভাবেই তারা ফিরে এলেন নিজ গ্রহে। প্রশান্ত মহাসাগরে এসে পড়লো তাদের নভোযান। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ঠিক ১০৪ বছর পর ১৯৬৯ সালের ১৬ জুলাই সত্যি সত্যিই পৃথিবী থেকে এপোলো-১১ নভোযানে করে চন্দ্রাভিযানে যান তিন নভোচারী নিল আর্মস্ট্রং, অলড্রিন ও মাইকেল কলিন্স এবং চন্দ্র জয় করে ফিরে আসেন পৃথিবীতে। তাদের নভোযানটিও প্যারাসুটের মাধ্যমে প্রশান্ত মহাসাগরে আছড়ে পড়েছিল ঠিক জুলে ভার্নের উপন্যাসের মতোই। আর মহাকাশে প্রায় ওজনবিহীন বিষয়টিও ভার্ন তার উপন্যাসে যথার্থভাবে তুলে ধরেছিলেন। এডগার অ্যালান পোর উপন্যাস ও বাস্তব একাকার রহস্য রোমাঞ্চ গল্প-উপন্যাস জগতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী একটি নাম এডগার অ্যালান পো। ১৮৩৮ সালে প্রকাশিত হয় তার ‘ দ্য ন্যারেটিভ অব আর্থার গর্ডন পিম অব নানটুকেট’ নামক উপন্যাস। এতে আছে এক জাহাজের বিদ্রোহী ৪ নাবিকের কথা যাদের ধরে সাগরে একটি নৌকায় করে ভাসিয়ে দেয়া হয়। চার নাবিকের একজনের নাম রিচার্ড পার্কার। খাবার পানির অভাবে সকলের যখন মরার দশা, তখন রিচার্ড প্রস্তাব দেয় টস করার। টসে যে হারবে, তাকে খাবে অন্যরা। অন্যদের বাঁচাতে রিচার্ড ইচ্ছে করেই টসে হেরে বসলো এবং বন্ধুদের জন্য নিজের জীবন উত্সর্গ করলো। সে সময় নিছক কাল্পনিক উপন্যাস বলে সকলে অ্যালান পোর লেখাকে একরকম উড়িয়ে দিলেও প্রায় ৫০ বছর পর ১৮৮৪ সালে ইংল্যান্ডের এক ইয়টে ঘটেছিল প্রায় অনুরূপ এক ঘটনা। সাউদাম্পটন থেকে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার পথে ৫২ ফুটি ইয়টটি সাগরে নিমজ্জিত হয়। লাইফবোটে উঠে প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হয় ৪ জন। কাকতালীয়ভাবে এদের একজনের নাম ছিল রিচার্ড পার্কার। ১৭ বছর বয়সী এই যুবককে মেরে তার মাংস খেয়ে ক্ষুধা নিবৃত্ত করে তার সঙ্গীরা। কাল্পনিক ও বাস্তবের দুই রিচার্ড পার্কারকে সম্মান জানাতেই ইয়ান মার্টেল ২০০১ সালে তার লেখা প্রখ্যাত উপন্যাস ‘লাইফ অব পাই’ ছবির অন্যতম প্রধান চরিত্র রয়েল বেঙ্গল টাইগারের নাম রেখেছিলেন ‘রিচার্ড পার্কার’। এই উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত চলচ্চিত্র লাইফ অব পাই ২০১৩ সালের শ্রেষ্ঠ ছবি হিসেবে অস্কার পুরস্কার লাভ করে। টিভি সিরিজ দ্য টোয়ালাইট জোন-এ বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের আগাম খবর বিজ্ঞান কল্প-কাহিনী ও অতিপ্রাকৃত বিষয় নির্ভর জনপ্রিয় টিভি সিরিজ দ্য টোয়ালাইট জোন-এ (১৯৫৯-১৯৬৪) বিজ্ঞানের চাঞ্চল্যকর সব আবিষ্কারের কথা আগাম তুলে ধরা হতো। মহাকাশে গ্রহ-গ্রহান্তরে অভিযান, চালকবিহীন গাড়ি, ফ্ল্যাট স্ক্রিন টেলিভিশন, মানব সদৃশ রবোট, সরকারি কাজে ব্যবহূত গোপন যন্ত্রপাতিসহ নানা বিষয় এই সিরিজে তুলে ধরা হয়, যেগুলো পরবর্তীতে বাস্তবে রূপ নিয়েছে।