গরমে ডায়রিয়ার প্রকোপ

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ডায়রিয়ার প্রকোপ বেড়েছে। তীব্র গরমে বিশুদ্ধ পানির সংকট, খোলা ও বাসি খাবার গ্রহণের কারণে ডায়রিয়ার প্রকোপ বাড়ছে বলে জানান মহাখালী আন্তর্জাতিক উদারাময় কেন্দ্রের (আইসিডিডিআরবি) বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক ও প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা। জানা গেছে, প্রচণ্ড গরমে রাজধানীতে প্রতিদিনই ডায়রিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। গতকাল রাত ৮টা পর্যন্ত প্রায় ৭শ রোগী আইসিডিডিআরবিতে ভর্তি হয়েছে। ডায়রিয়া আক্রান্তদের মধ্যে ৬০ ভাগ বয়স্ক ও ৪০ ভাগ শিশু। আইসিডিডিআরবির চিফ ফিজিশিয়ান ডা. পি কে বর্ধন গতকাল ইত্তেফাককে জানান, এখন ডায়রিয়ার মৌসুম। প্রচণ্ড গরমে বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা যাচ্ছে। তাছাড়া বেশির ভাগ মানুষ ওয়াসার সরবরাহকৃত পানি কিংবা অনিরাপদ পানি ব্যবহার করে থাকে। এছাড়া খোলা ও বাসি খাবারের কারণেও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। সমাজ কল্যাণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর ফুটপাত ও বস্তিতে ভাসমান প্রায় ৩০ লাখ মানুষ আছে। তারা রাস্তার পাশে খোলা বাসি খাবার খাচ্ছে। ফুটপাত, রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট, বাস টার্মিনাল এবং রাস্তার পাশে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তাদের বাস। ওয়াসার পানিই তাদের একমাত্র ভরসা। তবে যারা অফিস আদালতে ‘মিনারেল’ ওয়াটার খাচ্ছেন, তাদের অনেকেও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন। আইসিডিডিআরবির বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেন, বাজারজাতকৃত ৯৮ ভাগ মিনারেল ওয়াটার ওয়াসার কিংবা অনিরাপদ পানি বোতলজাত করে বিক্রি করছে। ওই পানিতে ডায়রিয়ার জীবাণু থাকা স্বাভাবিক। ডা. বর্ধন বলেন, বিশুদ্ধ পানি সংকট থাকা মানুষ যত্রতত্র ওয়াসার সরবরাহকৃত পানি ব্যবহার করে আসছে। শিশু ও বৃদ্ধ বয়সে মানুষের রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা কম থাকে। এ কারণে এই দুই শ্রেণির মানুষ ডায়রিয়ায় বেশি আক্রান্ত হয়। রাজধানীর প্রায় সকল এলাকা থেকে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগী আইসিডিডিআরবিতে চিকিত্সার জন্য আসছে। তবে বাড্ডা, তেজগাঁও, যাত্রাবাড়ী, পুরাতন ঢাকা ও কাঁঠাল বাগান এলাকা থেকে আসা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেশি। পাওয়া যায়নি অন্য কোন রোগের জীবাণু: আইসিডিডিআরবির দীর্ঘ মেয়াদী ডায়রিয়া ইউনিটের প্রধান ডা. আজহারুল ইসলাম জানান, আক্রান্ত রোগীদের পরীক্ষা করে শুধু ডায়রিয়ার জীবাণু পাওয়া গেছে। অন্য কোন রোগের জীবাণু পাওয়া যায়নি। চিফ ফিজিশিয়ান ডা. বর্ধনও একই তথ্য জানান। তিনি বলেন, আক্রান্ত রোগীদের শরীরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বিশেষ কোন জীবাণু পাওয়া যায়নি। তারা শুধু ডায়রিয়াই আক্রান্ত হয়েছেন। তবে এসময় মানুষজন চিকেন পক্স, টাইফয়েড, ভাইরাস জ্বর, আমাশাসহ সংক্রামক ও পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। করণীয় সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন বিভাগের প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, সবারই এসময় পারলে গরম পরিহার করা ভাল। মাঠে যারা কাজ করেন কিংবা শ্রমিকদের দেহ থেকে এ সময় ঘামের সঙ্গে প্রচুর লবণ বের হয়ে যায়। প্রচুর পানি পান করলে ও লবণ মিশ্রিত পানি পান করলে শরীর থেকে বের হওয়া লবণ পূরণ হয়ে যাবে। তিনি ওরস্যালাইন সেবন করার পরামর্শ দেন। এছাড়া রাস্তার পাশে কিংবা যত্রতত্র খোলা ও বাসি খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকতে বলেন তিনি। রাস্তাঘাটে শরবত না খাওয়ারও পরামর্শ দেন তিনি। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, এ সব শরবত ওয়াসার দূষিত পানি দিয়েই তৈরি করা হয়। জন্ডিস, আমাশা ও প্রচণ্ড জ্বর হলে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের কাছে যেতে বলেন তিনি। ডা. পি কে বর্ধন ও ডা. আজহারুল ইসলাম ডায়রিয়া প্রতিরোধে একই পরামর্শ দিয়ে বলেন, পচা, বাসি ও খোলা খাবার খাওয়া পরিহার করতে হবে। পানি ব্যবহারেও সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তারা।