খাজনা দেয় বুয়েট, ভোগ করে অবৈধ দখলকারীরা

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) প্রায় আড়াই একর জমি কর্তৃপক্ষের হাতছাড়া। অর্ধ শতকেরও বেশী সময় ধরে বেদখল জমির খাজনা কর্তৃপক্ষ নিয়মিত পরিশোধ করে আসছে। কিন্তু দখলে নিতে পারেনি আজও। আর এর মধ্যে অবৈধ দখলদাররা জমির উপর অধিকার ধরে রাখতে গড়ে তুলেছে সিন্ডিকেট। ক্যাম্পাস সংলগ্ন এ জমি দখল করা গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকট অনেকাংশেই কমে যেত বলে মনে করেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। বুয়েটের এস্টেট এন্ড লিগ্যাল অফিস এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বুয়েটের মোট ৮৪ একর ৯২ শতাংশ জমি রয়েছে। এ জমির নিয়মিত খাজনাও পরিশোধ করে আসছে কর্তৃপক্ষ। এরমধ্যে সরকারের কাছ থেকে লালবাগ মৌজায় বরাদ্দ ও মূল্য পরিশোধ সূত্রে প্রায় ৪৩ দশমিক ৩৮ একর জমি রয়েছে। এ মৌজার ২ একর ৩২ শতাংশ জমি কর্তৃপক্ষের হাতছাড়া। বেদখল জমিগুলো হলো- আজাদ এলাকার এক একর ৭১ শতাংশ, সুইপার কলোনীর ৩৩ শতাংশ এবং ঢাকেশ্বরী মন্দির সংলগ্ন বালুর মাঠের ২৮ শতাংশ জমি। বেদখল এ জমির খাজনা বাবদ বুয়েট কর্তৃপক্ষ প্রতিবছর ৫ হাজার ১০৪ টাকা খাজনা পরিশোধ করে। জমির মূল্য ও খাজনা পরিশোধ এবং সংরক্ষণ বাবদ কয়েক কোটি খরচও করেছেন তারা। অথচ জমি ভোগ দখল করছেন দখলদাররা। কয়েকবার চেষ্টা চালিয়েও এ জমি উদ্ধার করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। এ প্রসঙ্গে বুয়েটের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক এ কে এম মাসুদ ইত্তেফাককে বলেন, বেদখল জমিগুলো দখলে নিতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। সরকারের কাছেও এ ব্যাপারে সাহায্য চেয়েছি। বুয়েটের রেজিস্ট্রার অফিস ও প্রধান প্রকৌশলীর অফিস সূত্রে জানা যায়, ১৯৬২ সালে তখনকার সরকার পূর্ব পাকিস্তান ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি অর্থাত্ বর্তমান বুয়েটকে লালবাগ মৌজায় ৪৩ একর ৩ শতাংশ জমি বরাদ্দের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এর মধ্যে ২৬ একর ১৫ শতাংশ জমি গণপূর্ত বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীনে ছিল। এ জমির মূল্য বাবদ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ৪৩ লাখ ৭২ হাজার টাকা সরকারকে পরিশোধ করেছিল। তবে পুরো জমি একবারে হস্তান্তর করা হয়নি। এখন পর্যন্ত আজাদ কলোনী ও সুইপার কলোনীর জমি বুয়েটের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। হস্তান্তর করা হয়নি সিটি কর্পোরেশনের নিয়ন্ত্রণাধীন ঢাকেশ্বরী মন্দির সংলগ্ন বালুর মাঠ। আজাদ এলাকা সরকারি কর্মচারী ও বহিরাগতদের দখলে সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, আজাদ এলাকায় বুয়েটের বেদখল জমিতে সরকারের চারটি সেড রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ৪২ ও ৪৩ নং সেডে মোট ২৬টি কক্ষে ১০৪টি সিট রয়েছে। আর ৪৪ ও ৪৫ নং সেডে ১৮টি পরিবার বাস করছে। গণপূর্ত কর্তৃপক্ষ একাধিকবার এ সেডগুলো খালি করার উদ্যোগ নিলেও এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হয়নি। এ এলাকার বর্তমান বাসিন্দাদের মধ্যে গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রয়েছেন। এলাকায় বহিরাগত বেশ কয়েকটি পরিবার বাস করছেন। এছাড়া এলাকায় নিয়মিত আড্ডা গড়ে তুলেছেন স্থানীয় কয়েকজন মধ্যবয়স্ক ও তরুণ। এদের অনেকেই মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। ১৯৬৭ সালে এলাকার অভ্যন্তরে একটি ডরমেটরী দখলে নেয় বিশ্ববিদ্যালয়। এটি নির্মাণ বাবদ ১২ লাখ ১৩ হাজার ৫২৪ টাকা পরিশোধও করা হয়। এরপর দীর্ঘদিন ধরে বুয়েট কর্তৃপক্ষ এ এলাকার বাকি জমি দখলের চেষ্টা করে আসলেও সফল হয়নি। সর্বশেষ চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহেও কর্তৃপক্ষ জমি দখলের ব্যাপারে সহায়তা চেয়ে গণপূর্ত কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি প্রেরণ করেছে। এ প্রসঙ্গে বুয়েটের সহকারী রেজিস্ট্রার এম এন নবীউল আহসান বলেন, আজাদ এলাকার জমি নিয়ে কোনো মামলা নেই। বুয়েট নিয়মিত এ জমির খাজনা পরিশোধ করে আসছে। জমির দখল নিতে আমরা ধারাবাহিকভাবে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাথে যোগাযোগ করছি। সুইপার কলোনীর জমি দখলে নিতে মামলার জাল পূর্ব পলাশীর সিএস ৪৪ দাগের ৩৩ শতাংশ জমিও দখলে নিতে পারছে না বুয়েট কর্তৃপক্ষ। স্থানীয়ভাবে এ এলাকাটি সুইপার কলোনী নামে পরিচিত। ১৯৬৭ সালেই এ এলাকাটি বুয়েটকে বরাদ্দ দেয় সরকার। বুয়েট কর্তৃপক্ষ জমির মূল্যও পরিশোধ করে। তাত্ক্ষণিকভাবে জমির প্রয়োজন না থাকায় কর্তৃপক্ষ তখন ঐ জমি দখলে নেয়নি। এরইমধ্যে এই জমি শেখ বেলাল নামে একজন দখল করে নেয়। তিনি তখনকার ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়ি চালক ছিলেন। কর্তৃপক্ষ এ জমির দখল নিতে গেলে তিনি দাবি করেন, ম্যাজিস্ট্রেট তাকে এ জমি লিজ দিয়েছেন। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মামলা চলছে। ইতিমধ্যে বেলাল মারা গেলেও তার উত্তরাধিকারীরা মামলাটি নিয়ে লড়ছেন। তারাসহ এ জমির দখল নিতে মামলা লড়ছেন স্থানীয় বাসিন্দা ওবায়দুর রহমান, সুরবানু, মর্জিনা বেগম, জোত্স্না বেগম, আইয়ুব আলী, হাবিবা ইসলাম ও পল্টু। অভিযোগ রয়েছে, তারা একজোট হয়ে জমির দখল নিতে পৃথক পৃথকভাবে বুয়েট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে। যাতে একপক্ষ হারলে অপর পক্ষ মামলা চালিয়ে যেতে পারে এবং জমির ভোগ দখল অব্যাহত রাখতে পারে। দুইবার ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদের উদ্যোগ নিলেও প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপে তা বন্ধ হয়ে যায়। এ এলাকায়ও মাদক সেবন ও ব্যবসার সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে বলে জানা গেছে। বালুর মাঠের জমিও হাতছাড়া ঢাকেশ্বরী মন্দিরের দক্ষিণ দিকের বালুর মাঠটিও বুয়েট কর্তৃপক্ষের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। ১৯৬৭ সালে এ জমি খণ্ড সরকারের কাছ থেকে বরাদ্দ পেয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়। এক সময় ২৮ শতাংশের এ ভূমির পুরোটাই পুকুর ছিল। পরে বুয়েট কর্তৃপক্ষ বালু দিয়ে পুকুরটি ভরাট করলে স্থানীয়দের কাছে এ জায়গাটি বালুর মাঠ নামেই পরিচিতি পায়। মাঠের চারপাশে সীমানা দেয়ালও নির্মাণ করে কর্তৃপক্ষ। এ খাস জমির নির্ধারিত মূল্য ও খাজনাও বুয়েট পরিশোধ করেছে। কিন্তু সম্প্রতি এ মাঠ ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নিজেদের সম্পদ বলে দখল করেছে। জমি দখলে ব্যর্থতায় নিরসন হচ্ছে না আবাসন সংকট বুয়েটে বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার ছাত্র-ছাত্রী পড়াশোনা করছে। এরমধ্যে ৪০ ভাগ শিক্ষার্থী হলে থাকে। ৬টি ছাত্র হল ও একটি ছাত্রী হলে এ আবাসন ব্যবস্থা করা হয়েছে। চাহিদা থাকলেও পর্যাপ্ত স্থান না থাকায় আবাসন সুবিধা বাড়াতে পারছে না কর্তৃপক্ষ। ছাত্রীদের আবাসন সংকট প্রকট হয়ে উঠেছে। অধ্যয়নরত প্রায় ২ হাজার ছাত্রীর মধ্যে মাত্র ৪৩০ জন হলে থাকতে পারছেন। হলে থাকতে না পারায় অনেক ছাত্রীরই শিক্ষা গ্রহণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ হল নির্মাণের জন্য পরিকল্পনা করলেও উপযুক্ত জায়গা খুঁজে পাচ্ছে না। আজাদ এলাকার জমিতে হল নির্মাণের পরিকল্পনা প্রাথমিকভাবে গ্রহণ করা হলেও জমির দখল নিতে না পারায় তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। এ প্রসঙ্গে বুয়েটের রেজিস্ট্রার অধ্যাপক এ কে এম মাসুদ বলেন, ছাত্রীদের আবাসন সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে। আজাদ এলাকার বেদখল জমি উদ্ধার করা গেলে নতুন ছাত্রী হলের নির্মাণ কাজ শুরু করা যেত। বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক এস এম নজরুল ইসলাম বলেন, ঐ জমি দখলে আনতে আমরা দীর্ঘদিন ধরে লড়ে যাচ্ছি। এজন্য সরকারের সহায়তা প্রয়োজন। এর আগেও বেদখল কিছু জমি দখলে আনতে সরকার সহযোগিতা করেছিল। এখনও যে জমিগুলো বেদখলে রয়েছে, তা উদ্ধারে সরকার সহায়তা করলে সাফল্য পাওয়া যাবে। এজন্য সংশ্লিষ্টদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে।