শিশুদের স্বাস্থ্য ও টেলিভিশনের প্রভাব

আধুনিক সভ্যতার বদৌলতে বিশ্বটা আজ হাতের মুঠোয় কয়েকটি বোতামে আবদ্ধ হয়েছে ঠিকই আবার জীবনকে হুমকির মুখোমুখি করছে অনেক ক্ষেত্রেই। কানাডার টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা জানান, অতিরিক্ত টেলিভিশন দেখার ফলে শিশুরা মুটিয়ে যাচ্ছে যার ফলে পরবর্তীতে তারা মারাত্মক রোগের শিকারও হতে পারে। আজকালকার বেশিরভাগ শিশুরা প্রতিদিনই খেলার মাঠ ছেড়ে আবদ্ধ হয়ে পড়ছে টেলিভিশন, কম্পিউটার, ইন্টারনেটে—এর ফলে শারীরিক সক্ষমতার দিক দিয়ে তারা দুর্বল হয়ে পড়ছে। এই সমস্যার হাত থেকে পরিত্রাণের কিছু উপায় নিয়ে নিম্নে আলোচনা করা হল। একনাগাড়ে টেলিভিশন দেখা ও সঙ্গে বিভিন্ন রকম সুস্বাদু খাবার গ্রহণ অতিরিক্ত মেদের সৃষ্টি করে। দেখা যায়, অনুষ্ঠানের আকর্ষণের সাথে সাথে মুখরোচক খাবারে আসক্তিও চলে আসে আর এখান থেকেই হাতছানি দেয়া শুরু হয় প্রাণঘাতী রোগের, যেমন-রক্তে ফ্যাট, হাইপারটেনশন, হাইব্লাডপ্রেশার, ডায়াবেটিস প্রভৃতি। গবেষকরা ১২-১৯ বছরের ৭,৯৮২ জন শিশুর ওপর গবেষণা চালান অতিমাত্রায় টেলিভিশন দেখার শারীরিক সমস্যা সম্পর্কে। এছাড়া ভিডিও গেমসসহ এ জাতীয় অন্যান্য গেমস শিশুদের মস্তিষ্কের বিশেষ একটি অঞ্চলকে উত্তেজিত করে। এ ক্ষেত্রে সমাধান হচ্ছে—* বাচ্চাদের টেলিভিশন দেখার নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেয়া। * তাদের পছন্দের অনুষ্ঠানগুলোর তালিকা তৈরি করে প্রিয় কয়েকটি অনুষ্ঠান দেখতে দেয়া । * টেলিভিশন দেখার সময় স্ন্যাকস বা ফ্যাট জাতীয় খাবার খেতে নিষেধ করা। টেলিভিশন দেখতে কে না ভালোবাসে? সারাদিনের ব্যস্ত সিডিউলের পরে বাড়ি ফিরে ফ্রেশ হয়ে কিছুক্ষণ টিভির চ্যানেল সার্ফ করতে অথবা পছন্দের নিউজ চ্যানেলে সারাদিন কোথায় কী হয়েছে একঝলকে দেখে নেয়া কিংবা পছন্দের গানের শো দেখতে আমাদের প্রায় প্রত্যেকেরই ভালো লাগে। ভাবছেন হয়তো, তাহলে সমস্যাটা কোথায়? টিভি তো সবাই দেখে। সমস্যা কিন্তু টিভি দেখা নিয়ে নয়। সমস্যা অতিরিক্ত টিভি দেখা নিয়ে। কীভাবে বোঝা যাবে যে, কেউ টিভি দেখা অ্যাডিক্টেড হয়ে পড়েছেন। যদি একটানা দেড় থেকে দুই ঘণ্টারও বেশি কেউ টিভি দেখেন, তাহলে বুঝতে হবে যে তিনি টেলিভিশনে অ্যাডিক্টেড হয়ে পড়েছেন। অনেক সময় দেখা যায়, মা-বাবা টেলিভিশনকে ‘বেবি সিটার’ হিসাবে ব্যবহার করেন। বাচ্চাকে খাওয়ানোর সময় অথবা নিজেরা কাজ করার সময় যাতে বাচ্চারা তাদের বিরক্ত না করে তার জন্য বাচ্চাদের টিভি দেখতে বসিয়ে দেন। এর ফলে আস্তে আস্তে তারা টিভি আসক্ত হয়ে পড়ে। এখন বেশিরভাগ বাচ্চার মধ্যেই টিভিতে বিভিন্ন রকমের কার্টুন চ্যানেল দেখার প্রবণতা বেড়ে গিয়েছে। এর ফলে তারা ধীরে ধীরে সেইসব কার্টুন চরিত্রের মতো নিজেদের তৈরি করার চেষ্টা করে। এই অভ্যাস ওদের জন্য খুবই ক্ষতিকর। শুধু ছোটো বাচ্চা নয়, বড়দের মধ্যে অত্যাধিক টিভি দেখার প্রবণতা রয়েছে। বেশিক্ষণ টিভি দেখার অনেক সাইড এফেক্ট রয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে কোনো সাইড এফেক্ট না থাকলেও আসলে এর থেকে শরীরের অনেক ক্ষতি হতে পারে। একটানা অনেকক্ষণ টিভি দেখলে চোখে ব্যথা করার সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায় চোখ লাল হওয়া, ঘাড়ে ব্যথা এবং চোখের পাওয়ার বেড়ে যাওয়ার সমস্যা। টিভি দেখতে দেখতে খাবার অনেকেই খেয়ে থাকে। এমনটা করা একেবারেই ঠিক নয়। খাওয়ার সময় টিভি দেখলে মনোযোগ যেহেতু টিভির দিকে থাকে, তাই অনেক সময়ই খাবার বেশি খাওয়া হয়ে যায়। ফলে আমাদের অজান্তেই ওজন বেড়ে যায়। টেলিভিশন একেবারেই দেখা চলবে না, তা কিন্তু নয়। তবে খেয়াল রাখতে হবে, একটানা যেন টিভি দেখা না হয়। সম্ভব হলে টিভির রিমোট কন্ট্রোল ব্যবহার না করে ম্যানুয়ালি অপারেট করতে হবে। এর ফলে বার বার উঠে গিয়ে টিভির চ্যানেল পাল্টাতে হলে অথবা টিভির আওয়াজ বাড়াতে কিংবা কমাতে হলে আস্তে আস্তে টিভি দেখার প্রবণতাও কমে যায় কারণ, বার বার উঠে গিয়ে এসব কাজ করতে কারই-বা ভালো লাগে? কোনো ছুটির দিনে বাড়িতে বসে টিভি দেখে সময় নষ্ট না করে জমে থাকা জরুরি কাজগুলো সেরে ফেলা যেতে পারে। আর যদি ছুটির দিনে সেভাবে কাজ করতে ইচ্ছে না করে, তাহলে বন্ধু-বান্ধব অথবা প্রিয় মানুষদের সঙ্গে সময় কাটানো যেতে পারে। টিভি দেখার পরিবর্তে নিয়ম করে প্রতিদিন খানিকক্ষণ বই পড়ার অভ্যাস করা যেতে পারে। কারণ, অলস শিশুরা ক্রমাগত স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ডায়াবেটিস ও হূদরোগের মতো মারাত্মক রোগও। সমপ্রতি গবেষকরা এ বিষয়ে অভিভাবকদের সতর্ক করে দিয়েছেন। তারা বলেছেন, খুব বেশি দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই সন্তানদের কর্মমুখী করে তুলতে হবে। গবেষকরা বলেছেন, তারা লক্ষ্য করেছেন স্কুলগুলোতে বাচ্চাদের কাজ করার প্রবণতা কম। অভিভাবক, স্কুল কর্তৃপক্ষ ও কমিউনিটি স্বাস্থ্য সেবার সঙ্গে যুক্ত যারা, তাদের বিষয়টি নিয়ে ভাবা উচিত। গবেষণাকালে দেখা গেছে, এসব অলস বাচ্চার পরবর্তী সময়ে ডায়াবেটিস ও হূদরোগের আশঙ্কা রয়েছে। জাঙ্ক ফুড, বিলাসবহুল জীবনযাপন, অতিরিক্ত টেলিভিশন দেখা ও কম্পিউটারের ব্যবহার এ ধরনের অলস ছেলে-মেয়ে তৈরি করছে। এসব শিশু প্রতিযোগিতামূলক কোনো খেলায়ও অংশ নেয় না। শিশু ও কিশোরদের প্রতিদিন কমপক্ষে ৬০ মিনিট কায়িক পরিশ্রম করা উচিত। পরিশ্রমের পরিমাণ যত বাড়বে, জীবনমানের প্রত্যাশাও তত বাড়বে, কমে যাবে নানা ধরনের অসুখের ঝুঁকি। লেখক :সাংবাদিক