সরকারের পতন ঘটিয়ে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করবো

তিস্তা ব্যারেজ অভিমুখে দুই দিনব্যাপী লংমার্চের প্রথম দিনে গতকাল রংপুর পর্যন্ত ৬টি পথসভায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বর্তমান সরকার ভারতের কাছ থেকে তিস্তা নদীতে পানি আনতে পারবে না। কারণ দরকষাকষির জন্য বাংলাদেশের হাতে থাকা সব হাতিয়ার তারা ভারতকে দিয়েছে। এ সরকারের ওপর ভরসা করা বোকামি। এখন এ সরকারের পতন ঘটিয়ে ভারতের কাছ থেকে পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করা হবে। তিনি বলেন, তিস্তা অভিমুখে আমাদের লংমার্চ ভারতের বিরুদ্ধেও নয়, বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধেও নয়। পানির ন্যায্য হিস্যা আদায়ের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে ভারত সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই আমাদের লংমার্চ কর্মসূচি। মির্জা আলমগীর বলেন, জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া কোন আন্দোলন সফল হয় না। তাই আগামী দিন আন্দোলনের প্রস্তুতি নিন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বিশ্বাসযোগ্য সূত্রে জানতে পারলাম- লংমার্চের কারণে ভারত তিস্তায় কিছুটা পানি ছেড়েছে। লংমার্চ কর্মসূচি সফল হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘এটা লংমার্চের প্রাথমিক সাফল্য। আমরা সাময়িক নয়, পুরোপুরি সফলতা চাই। গতকাল মঙ্গলবার সকাল ৯টায় রাজধানীর উত্তরার আজমপুর ওভার ব্রিজের কাছে এক পথসমাবেশের মধ্যদিয়ে লংমার্চ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। অতপর গাড়িবহর নিয়ে লংমার্চ যাত্রা সূচনা হয়। ঢাকা মহানগর ও পার্শ্ববর্তী জেলা মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী থেকে গাড়ি লংমার্চের বহরে অংশ নিয়েছে। শুরু থেকে গতকাল রংপুর পৌঁছানো পর্যন্ত কোথাও বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিপুল উপস্থিতি দেখা যায়নি। নেতারা বললেন, বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি এবং তীব্র খরতাপের কারণে এমনটি হয়েছে। এছাড়া পুলিশের ভয়ও তাদের ভেতর ছিল বলে স্থানীয় নেতারা জানান। উত্তরা থেকে টঙ্গী, জয়দেবপুর, কোনাবাড়ী হয়ে কালিয়াকৈর এলাকায় সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দ্বিতীয় পথসভা করেন লংমার্চে অংশ নেয়া বিএনপির নেতা-কর্মীরা। এরপর টাঙ্গাইল বাইপাস মোড়, সিরাজগঞ্জ পদ্মার মোড়, বগুড়ার মাটির ঢালীর মোড়, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ মহাসড়কে এবং পলাশবাড়িতে পথসভার পর লংমার্চ বহর গিয়ে যাত্রাবিরতির জন্য রংপুর পৌঁছায়। আজ সকাল ১১টায় ডালিয়ায় সমাবেশের মধ্যদিয়ে সমাপ্তি ঘটবে লংমার্চের। লংমার্চে অংশ নিয়েছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক পানিসম্পদ মন্ত্রী মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম, চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. ওসমান ফারুক, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন, নাজিমউদ্দিন আলম, শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক খায়রুল কবির খোকন, যুবদল সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবদুস সালাম, ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক নাসিরসহ বিএনপি ও অঙ্গ দলের শতাধিক কেন্দ্রীয় নেতা। এই লংমার্চে কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। মির্জা ফখরুল সরকারের উদ্দেশে বলেন, তিস্তা নদীতে ন্যায্য পানি দিতে বাধ্য করতে আপনারা ভারতকে চাপ দিন। বাংলাদেশের মানুষের কথা বিবেচনা করে, ন্যায্য দাবি অনুযায়ী তিস্তা নদীতে পানি দেয়ার জন্য ভারতের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আগে তিস্তা অববাহিকায় ২৫০০ কিউসেক পানি পাওয়া যেত, আর এখন নদীর উজানে বিভিন্ন পয়েন্টে ভারতের অব্যাহত পানি প্রত্যাহারের কারণে তা ৪০০ কিউসেকে নেমে এসেছে। এখন দেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থা ধ্বংসের মুখোমুখি। রীতিমতো মরুকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে সেখানে। দুর্যোগ নেমে এসেছে কৃষকের জীবনে। কালিয়াকৈর পথসভায় মির্জা ফখরুল বলেন, দেশের ৫৪টি নদী ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এগুলো আন্তর্জাতিক নদী। তাই নদীর ন্যায্য হিস্যা পাওয়া আমাদের অধিকার। এ সরকার আমাদের অধিকার আদায়ে ব্যর্থ হয়েছে। ভবিষ্যতে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। সেই আন্দোলনে অংশ নিতে এখনই সবাইকে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তিনি বলেন, ২০০৮ সালে ৯ম জাতীয় নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ অঙ্গীকার করেছিল—তারা ক্ষমতায় গেলে ভারতের সঙ্গে তিস্তাচুক্তি করবে। কিন্তু গত ৫ বছরে তারা এই চুক্তি করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। মির্জা আলমগীর বলেন, দেশ আজ ঘোর বিপদগ্রস্ত। ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানি ভারত একতরফাভাবে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। তাই এখন আর বসে থাকার সুযোগ নেই। বগুড়ার মাটিডালি মোড়ের পথসভায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ভারতের সঙ্গে সমঅধিকারের ভিত্তিতে বন্ধুত্ব চাই। নজরুল ইসলাম খান বলেন, একটু আগে খবর পেয়েছি আমাদের লংমার্চ শুরুর পর ভারত কিছু পানি ছাড়তে শুরু করেছে। কিন্তু আমরা তিস্তা নদীকে জলে টইটুমু্বর দেখতে চাই। এ জন্য সরকারকে সব ধরনের উদ্যোগ নিতে হবে। লংমার্চ রংপুরে রংপুর প্রতিনিধি জানান, ঢাকা থেকে আসা লংমার্চকে বরণ করে নিল রংপুর জেলা বিএনপি। গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে লংমার্চ রংপুরে এসে পৌঁছলে বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব দুলুর নেতৃত্বে নেতা-কর্মীরা কেন্দ্রীয় নেতাদের বরণ করে নেয়। আজ বুধবার সকাল ৯টায় রংপুর পাবলিক লাইব্রেরীর মাঠে পথসভা শেষে বিএনপির লংমার্চ ব্যারেজ অভিমুখে রওনা দেবে। পরে সেখানে জনসভা অনুষ্ঠিত হবে। এর আগে গতকাল দুপুরে লংমার্চ সফল করতে দলীয় কার্যালয় থেকে জেলা বিএনপি’র উদ্যোগে একটি মিছিল নগরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে দলীয় কার্যালয়ের সামনে তারা সমাবেশ করে। এসময় বক্তব্য রাখেন জেলা বিএনপির আহবায়ক মুক্তিযোদ্ধা মোজাফ্ফর হোসেন, যুগ্ম আহবায়ক সামছুজ্জামান সামু, শহিদুল ইসলাম মিজু, জেলা যুবদলের সভাপতি রইচ আহমেদ, ছাত্রদলের সভাপতি জহির আলম নয়ন প্রমুখ।