১০ হাজার কিউসেক পানি না দিলে কঠোর আন্দোলন
আনোয়ার আলদীন, ডালিয়া (নীলফামারী) থেকে
প্রকাশ : ২৩ এপ্রিল ২০১৪, ২২:৩০
তিস্তার ডালিয়া পয়েন্টে লংমার্চ শেষে আয়োজিত এক সমাবেশে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, শুষ্ক মওসুমে তিস্তা নদীতে ১০ হাজার কিউসেক পানি আমাদের ন্যায্য হিস্যা। এই পানি না দিলে আগামীতে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। তিনি বলেন, এই সরকার কখনো তিস্তা পানি চুক্তি করতে পারবে না। কারণ এই সরকারের কোনো জনসমর্থন নেই। আর যাদের শক্তিতে তারা ক্ষমতায় আছেন, ভারতকে তারা অখুশি করতে চায় না। তাই এই সরকারের ওপর জনগণেরও কোনো আস্থা নেই।
দুই দিনের লংমার্চ গতকাল সমাপ্তির এই সমাবেশে বিএনপি, ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবকদলসহ ১৯ দলের সিনিয়র নেতাদের অনেকের উপস্থিতি ছিলো। গতকাল বহুল আলোচিত এই লংমার্চ সমাবেশে যোগদিতে সকাল থেকে সন্নিহিত নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর ও গাইবান্ধার মানুষ বাসে, ট্রাকে করে আসতে থাকে। রংপুর থেকে মির্জা ফখরুলরা গাড়ি বহর নিয়ে ৯৩ কিলোমিটার দূরে ডালিয়ায় পৌছান বেলা পৌনে ১২টায়। সমাবেশ চলাকালে তিস্তা নিয়ে শিল্পীরা ভাওয়াইয়া লোকগীতি পরিবেশন করছিলেন। মঙ্গলবার রাজধানী থেকে তিস্তা অভিমুখে লংমার্চ শুরু করে বিএনপি। উত্তরা থেকে লংমার্চ বহর গিয়ে যাত্রাবিরতি করে রংপুর ।
রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আহসান হাবিব দুলুর সভাপতিত্বে তিস্তা ব্যারেজের কাছে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. অব. মাহবুবুর রহমান, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, নজরুল ইসলাম খান, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধান, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক পানিসম্পদ মন্ত্রী মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ, চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, সেলিমা রহমান, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুজিবুর রহমান, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. ওসমান ফারুক, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, ইসলামী ঐক্যজোটের ভাইস চেয়ারম্যান আবুল হাসনাত আমিনী, জাতীয় পার্টি একাংশের প্রেসিডিয়াম সদস্য আহসান হাবিব লিংকন, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আহমেদ আযম খান, শামসুজ্জামান দুদু, যুগ্ম মহাসচিব মিজানুর রহমান মিনু, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন, নাজিমউদ্দিন আলম, শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক খায়রুল কবির খোকন, যুবদল সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানী, মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবদুস সালাম, স্বেচ্ছাসেবকদলের সাধারণ সম্পাদক মীর সরফত আলী সপু, মহিলাদলের সাধারণ সম্পাদক শিরিন সুলতানা, ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক নাসিরসহ বিএনপি ও অঙ্গদলের নেতৃবৃন্দ ছাড়াও স্থানীয় নেতারা।
সমাবেশ শেষে বেলা আড়াইটায় লংমার্চ বহর রংপুর হয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে। সমাবেশে যোগদানকারীদের অভিনন্দন জানিয়ে মির্জা আলমগীর বলেন, আজ তিস্তার ডালিয়া পয়েন্টে বানের পানির মতো মানুষ এসেছে। কারণ যে নদীর উপর তাদের জীবন-জীবিকা নির্ভর করে সে তিস্তা নদী মরে যাচ্ছে। তাদের জীবন-জীবিকাকে বিপন্ন করে তিস্তাকে মেরে ফেলা হয়েছে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ১৪টি বাঁধ নির্মাণ করে এ তিস্তাকে মেরে ফেলছে। তিনি বলেন, মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প তৈরি করে এবং তিস্তা সেচের মাধ্যমে এ অঞ্চলে কৃষিবিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। সেদিন এ অঞ্চলের মানুষ স্বপ্ন দেখেছিলেন কৃষিদিয়েই তারা সচ্ছল হবেন। কিন্তু আজ তিস্তা নদীর পারের জীবনব্যবস্থার দৃশ্য পাল্টে গেছে। পানির অভাবে মানুষ কৃষিকাজ করতে পারছে না। পরিবারের ভরণপোষণ দিতে পারছে না। মির্জা আলমগীর বলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতার আসার পর থেকে আমরা তিস্তা চুক্তির কথা শুনে আসছি। তাদের মন্ত্রীরা বারবার বলেছেন, তিস্তা চুক্তি হবে। কিন্তু বাংলাদেশে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং এলেন, কিন্তু চুক্তি হলো না। কারণ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলেছেন, তিস্তার পানি দেব না। এভাবেই শক্তিশালী দেশগুলো প্রতিবেশী ছোট ছোট দেশগুলোকে গ্রাস করতে চায়। যার কারণে আমাদের দেশের ১৬ কোটি মানুষ আজ বিপন্ন। তিনি বলেন, আমরা দেশ ছোট হতে পারি। কিন্তু আমাদের জনসংখ্যা ১৬ কোটি। আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ হলে কেউ আমাদের অধিকার ক্ষুণ্ন করতে পারবে না।
লে. জে. মাহবুবুর রহমান বলেন, পানির দাবি আদায় করতে খালেদার সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ জন্য আন্দোলনের প্রস্তুতি নিতে নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
নজরুল ইসলাম খান বলেন, তিস্তার পানি যত বাড়বে প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক তত উষ্ণ হবে। তিস্তায় যদি পানি না থাকে তা হলে সম্পর্ক রাখার দরকার নেই।
মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকার চাহিবামাত্র ভারতকে সব দিয়ে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার অনুযায়ী আমরা তিস্তার ১০ হাজার কিউসেক পানি পাওয়ার অধিকার রাখি। তিনি বলেন, শীত মৌসুমে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে আরো বড় লংমার্চ হবে।
রংপুর প্রতিনিধি ওয়াদুদ আলী জানান, লং মার্চ শেষে তিস্তা ব্যারেজ এলাকায় ৩ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে জনসভার ঘোষণা দেয়া হলেও শেষ পর্যন্ত বিএনপির লং মার্চে এ অঞ্চলের মানুষ খুব একটা সাড়া দেয়নি। নেতাকর্মীদেরও উপস্থিতি ছিল নগণ্য। সোমবার ঢাকা থেকে বিএনপির লং মার্চের গাড়িবহর রংপুরে আসার পথে পথসভাগুলোতে মানুষের উপস্থিতি ছিল না বললেই চলে। লং মার্চের বহরে ঢাকা থেকে আগত বেসরকারি চ্যানেলের সাংবাদিকরা সোমবার তাদের খবর ও সরাসরি সমপ্রচারিত সংবাদ বিষয়ক আলোচনায় জনগণের সাড়া না দেয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। তারা জানান, জনগণ তো দূরের কথা, স্থানীয় নেতাকর্মীর উপস্থিতিও ছিল নগণ্য। গতকাল লং মার্চ নীলফামারীর ডালিয়া এলাকায় যাওয়ার আগে সকাল ১০টার দিকে রংপুর পাবলিক লাইব্রেরীর মাঠে এক পথসভার আয়োজন করা হয়। সেখানেও মানুষের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। তিস্তা ব্যারেজের ডালিয়া এলাকায় ২০/২৫ হাজার মানুষও উপস্থিত হয়নি বলে প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে।
এদিকে বিএনপির লং মার্চ নিয়ে রংপুরে বিভিন্ন মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। রংপুর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা সরফুদ্দিন আহমেদ ঝন্টু বলেন, বিএনপির লং মার্চের অনেক আগেই বাম দলগুলো এবং সুশীল সমাজ তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে বিক্ষোভ, সমাবেশ ও লং মার্চ শেষ করেছে। এরপর বিএনপি এ কর্মসূচি ঘোষণা করায় জনগণ খুব একটা সাড়া দেয়নি। বিএনপি অন্য দল ও সুশীল সমাজের কর্মসূচি অনুসরণ করেছে মাত্র। এতে তাদের কোন কৃতিত্ব নেই। জাতীয়তাবাদী দল হিসেবে দাবিদার বিএনপির অনেক আগেই লং মার্চের কর্মসূচি পালন করা উচিত ছিল। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার তিস্তা নদীর পানি চুক্তির ব্যাপারে আন্তরিক ও তারা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মমতাজ উদ্দিন ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম রাজু জানান, বিএনপির হতাশাগ্রস্ত নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা ও চিত্তবিনোদনের জন্য লং মার্চের নামে তারা তিস্তা ব্যারেজ এলাকায় পিকনিক পার্টিতে এসেছিল। তাদের আন্দোলন লোক দেখানো। ভারতের সঙ্গে অমীমাংসিত বিষয়গুলো দ্বিপাক্ষিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে আওয়ামী লীগই সমাধান করছে। তবে জেলা বিএনপির আহবায়ক মুক্তিযোদ্ধা মোজাফফর হোসেন দাবি করেন, তাদের লং মার্চ সফল হয়েছে এবং লাখো মানুষ এই কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছে। বিশেষ করে রংপুর অঞ্চলে জামায়াতের শক্তিশালী সংগঠন থাকলেও বিএনপির লং মার্চে তারা সাড়া দেয়নি। এদিকে লং মার্চ শুরুর আগের দিন মঙ্গলবার ভারতের গজলডোবা ব্যারেজের গেট খুলে দেয়ায় ডালিয়ায় তিস্তা ব্যারেজ এলাকায় পানি প্রবাহ ছিল ৩ হাজার ৬ কিউসেক। গতকাল তা কমে গিয়ে ১ হাজার ২শ’ ২০ কিউসেকে দাঁড়িয়েছে। সোমবার ছিল ৪শ’ ৫০ কিউসেক পানি।