‘জীবিতদের ৯০ ভাগই ট্রমায় আক্রান্ত’

আনিসুল ইসলাম (৩০) রানা প্লাজার ‘নিউ ওয়েভ বটম’ নামের পোশাক কারখানার অপারেটরের কাজ করতেন? ভবস ধসের পরদিনই তাকে উদ্ধার করা হয়। তার শারীরিক ক্ষতি তেমন না হলেও, তিনি এখন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত? আনিসুল ইসলাম জানান, ‘রানা প্লাজা ধসের কয়েক মাস পর আমি একটি পোশাক কারখানায় কাজ নেই? কিন্তু তিন দিন পর কাজ ছেড়ে দেই আমি। মেশিন ধরতে গেলেই আমার হাত-পা কাঁপে। বিদ্যুত্ চলে গেলে প্রচণ্ড ভয় লাগে আমার।’ এই অবস্থা শুধু আনিসুলের নয়, রহিমা, সালেহা বেগমসহ আরো অনেকেরই। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট রানা প্লাজা ধসের পর বেঁচে যাওয়া শ্রমিকদের ওপর একটি জরিপ চালায়। সেই জরিপে দেখা যায়, ৯০ ভাগ শ্রমিকই ‘প্রাথমিক ট্রমা’ বা ‘প্রাথমিক আতঙ্কে’ আক্রান্ত হয়েছেন। তিন মাস পর আরেকটি জরিপে দেখা যায় যে, কমপক্ষে ৪০ ভাগ শ্রমিক ‘গুরুতর ট্রমা’ বা ‘গুরুতর আতঙ্কে’ আক্রান্ত রয়েছেন। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম জানান, ‘তাদের মধ্যে নানা উপসর্গ দেখা দিচ্ছে? ভয় পাওয়া, দুঃস্বপ্ন দেখা, অপরাধ বোধসহ নানা ধরনের দুঃসহ স্মৃতি তাদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। এছাড়া ঘটনার পর থেকে তারা বিষণ্নতা এবং মানসিক রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন?’ অধ্যাপক তাজুল বলেন, ‘সঠিক চিকিত্?সা না হলে তাদের অনেকেই মাদকাসক্ত হয়ে উঠতে পারেন। তাদের মধ্যে বাড়তে পারে আত্মহত্যার প্রবণতা।’ রানা প্লাজায় আহতদের মধ্যে যারা আতঙ্কগ্রস্ত, তাদের চিকিত্?সা সহায়তা দিচ্ছে বেশ কয়েকটি বেসরকারি সংগঠন? ‘কেয়ার’— এর চিকিত্?সা কেন্দ্র ‘মনোসামাজিক সহায়তা কেন্দ্র’ এরকম ৫০০ জনকে চিকিত্?সার আওতায় এনেছে। তাদের নিয়ে কাউন্সেলিং করা হচ্ছে। কেন্দ্রের পরিচালক ও মনোসামাজিক চিকিত্?সক দেওয়ান সাফায়েত আহমেদ বলেন, তাদের পর্যবেক্ষণে রানা প্লাজার ঘটনায় আহতদের প্রতি ১০ জনের পাঁচজন ট্রমায় আক্রান্ত। তার মানে, আহত ২ হাজার ৪৩৮ জনের মধ্যে অর্ধেকই এখন গুরুতর ট্রমা বা গুরুতর আতঙ্কে ভুগছেন। দেওয়ান সাফায়েত আহমেদও বলেন, সঠিক চিকিত্?সা না হলে এর শেষ পরিণতি হতে পারে আত্মহত্যা। অধ্যাপক তাজুল ইসলামের কথায়, আতঙ্কগ্রস্তদের জন্য এখন সরকারের উদ্যোগে ব্যাপক ভিত্তিক চিকিত্?সা কার্যক্রম শুরু করা উচিত। নয়তো তারা আর কর্মক্ষম হবেন না। ঠিকমতো চিকিত্?সা না হলে তারা আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন না। করতে পারবেন না কোনো কাজ। দিন দিন অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়বেন তারা। অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকবেন। তখন তাদের ও পরিবারে নেমে আসবে চরম বিপর্যয়। তিনি বলেন, তাদের চিকিত্?সায় সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে হবে। এখন পর্যন্ত যে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে তা পর্যাপ্ত বলে মনে করেন না তিনি। প্রসঙ্গত, গত বছরের ২৪ এপ্রিল সকাল ৯টায় সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় অবস্থিত নয় তলা ভবন ‘রানা প্লাজা’ ধসে পড়ে। আগের দিন সকালে ফাটল দেখা দেয়ার পরপরই ওই ভবনে থাকা চারটি গার্মেন্টস কারখানা ও ব্যাংক বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল? তবে পরদিন অর্থাত্ ২৪ এপ্রিল সকালে কারখানায় আবার কাজ শুরু হয়। এরপরই ধসে পড়ে ভবনটি।