বাংলায় মার্কেস
অনুবাদে, চর্চায় ও প্রেরণায়
প্রকাশ : ২৪ এপ্রিল ২০১৪, ১৯:৪৩
বিদায় কদলিবাগিচার হে কুহকি কথাকার
বিদায় গাবো, গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস। কলম্বিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় ক্যারিবিয় আরাকাতাকায় তাঁর জন্মের কিছু পরেই ধর্মঘটী কলাবাগিচা শ্রমিকদের ওপর চলেছে সরকারি সেনাদের নির্মম নৃশংসতা। শৈশবে শোনা কলাবাগিচা হত্যাকাণ্ড গল্পগাছির বীজ বুনে দিয়েছিল মনের গহনে; এই কলাবাগিচার কুহকই যেন তাঁর কথাজাদুর বিস্তার ঘটিয়েছে গৃহযুদ্ধ-সামরিক অভ্যুত্থান-স্বৈরতন্ত্র-গুপ্তহত্যা-ক্ষুধা-অপহরণ-মাদকমাফিয়া-দুর্নীতি আর বহুজাতিক কোম্পানির আধিপত্যঠাসা লাতিন আমেরিকার প্রত্যন্তে। লাতিনের চাপা স্বরকে ভূতলবাসের নিয়তি থেকে উদ্ধার করে সাহিত্যবিশ্বের ব্যাপ্ত পরিসরে নিয়ে এসেছেন মার্কেস। অতঃপর নিজ মহাদেশের গণ্ডি ছাপিয়ে অগণন ভাষাগোষ্ঠীর আপন-একান্তে স্থান করে নিয়েছেন তিনি। এমন যে ব্যক্তিলেখকের হাতে সমষ্টিমানুষের মহত্তম প্রকাশ ঘটে তাঁর মৃত্যু তো নেহায়েত আক্ষরিক মৃত্যু নয়; বরং এও যেন মৃত্যুচ্ছলে এক জাদুবাস্তব খেলা। এর কথাকার গার্সিয়া মার্কেসকে আমাদের বাঁধনহারা ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের পাশাপাশি দেখে নিতে চাই বাংলার লেখক-শিল্পীর অনুভবে মার্কেসের অবস্থান; বুঝে উঠতে চাই কোন রসায়নে অনুবাদে-চর্চায় ও প্রেরণায় মার্কেস তাঁর জাদুর মোহিনী ডানা বিস্তার করেছেন প্রবলভাবে। বোধ করি আমাদের এই ভূখণ্ডের মানুষের বিপন্নতা ও একই সঙ্গে বেঁচে থাকার অজেয় আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মার্কেসের লাতিন ল্যান্ডস্কেপের সমীপবর্তিতাই আকৃষ্ট করেছে আমাদের সৃষ্টিশীলতার ভুবনকে।
মার্কেস; ওপার বাংলায়
বাংলার পথিকৃত্প্রতিম মার্কেস অনুবাদক মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। গত শতকের সত্তরের দশকের শুরুতেই তিনি অনুবাদ করেন ‘কর্নেলকে কেউ চিঠি লেখে না’ (প্রকাশক. প্যাপিরাস, কলকাতা) এবং ‘সরলা এরেন্দিরা আর তার নিদয়া ঠাকুমার অবিশ্বাস্য করুণ কাহিনী’ (প্যাপিরাস)। এছাড়া ‘লাতিন আমেরিকার নিঃসঙ্গতা’ শীর্ষক মার্কেসের নোবেল ভাষণ থেকে শুরু করে ‘এই শহরে কোনো চোর নেই ও অন্যান্য গল্প’ (দে’জ পাবলিশিং)-এর অত্যাশ্চর্য অনুবাদ আমরা পেয়েছি মানবেন্দ্রের হাত থেকে।
মার্কেস নিয়ে মানবেন্দ্র বিস্তর লিখেছেন তাঁর লাতিন আমেরিকার সাহিত্য-বিষয়ী প্রবন্ধসংকলন ‘বাস্তবের কুহক, কুহকের বাস্তব’-এ। মানবেন্দ্র মনে করেন—
‘গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের নোবেল পুরস্কারের ভাষণ থেকেই স্পষ্ট বোঝা যাবে কোন কুহকের
বাস্তবতা আর বাস্তবতার কুহক সেই কোনিকস্তাদোরদের আমল থেকেই অন্যরকম—যার সঙ্গে ফরাসি পরাবাস্তববাদের খুব একটা সম্পর্ক নেই। এই ভাষণে—পিগাফেত্তার ভ্রমণপঞ্জি বা লাতিন আমেরিকার একনায়কদের ক্রিয়াকলাপ থেকে বোঝাই যায়, এই নতুন মহাদেশের বাস্তবতা কেন ভিন্ন হয়ে আছে—কেন তার ইতিহাসকে বাদ দিয়ে একে ঠিক বোঝাও যাবে না।’
বাংলায় প্রাতিষ্ঠানিক মার্কেস-পাঠের সূত্রধরও মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁরই উদ্যোগে মার্কেসের নোবেলপ্রাপ্তিরও বহু আগে ১৯৭০ সালে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্যবিভাগে ‘শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা’ পাঠ্যতালিকাভুক্ত হয়। (সূত্র : নীলাঞ্জন হাজরার সঙ্গে মার্কেস বিষয়ে মানবেন্দ্র
বন্দ্যোপাধ্যায়ের আলাপ, এই সময়, ২০ এপ্রিল ২০১৪, কলকাতা)
পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও বামফ্রন্ট নেতা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যও একজন বিশিষ্ট মার্কেস অনুরাগী ও অনুবাদক। তিনি ‘বিপন্ন জাহাজের এক নাবিকের গল্প’ (ন্যাশনাল বুক এজেন্সি) ও ‘চিলিতে গোপনে’ (দে’জ) নামে মার্কেসের দুটো বই অনুবাদ করেছেন।
অমিতাভ রায় মার্কেসের ঊনচল্লিশটি গল্প ভাষান্তর করেছেন। তাঁর অনূদিত মার্কেসের ‘গল্পসমগ্র’ গ্রন্থের (দে’জ ২০০৬) ভূমিকায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, ‘...তাঁর নাম শুনলেই মনে পড়ে ম্যাজিক রিয়েলিজমের কথা কিন্তু সেই বিশিষ্ট শিল্প আঙ্গিক মার্কেসের অনেক গল্পেই অনুপস্থিত। এই ছোটগল্পগুলির রচয়িতা যেন অন্য এক মার্কেস। বড়জোর তাঁর কয়েকটি গল্পকে বলা যায় ম্যাজিক রিয়েলিজম আঙ্গিকের আঁতুড় ঘর। অন্যান্য গল্পগুলিতে টানা বর্ণনারীতি অনুসৃত হয়েছে।’
অমিতাভ রায়ের অনুবাদে মার্কেসের গল্পকার সত্তা যেমন বাংলায় অবয়ব পেয়েছে তেমনি ‘গাবো; আপনাকে না পাঠানো চিঠি’ (অনুষ্টুপ, ২য় সংস্করণ ২০১২) বইয়ে অমিতাভ রায় গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের জীবন ও সৃজনবিশ্বকে এক উপন্যাসোপম রীতিতে ধারণ করেছেন।
তরুণ ঘটক অনুবাদ করেছেন ‘নিঃসঙ্গতার শতবর্ষ’ এবং ‘চিত্রনাট্যের কর্মশালা-কেমন করে গল্প হয়’ (প্রতিভাস) শীর্ষক দুটো মার্কেস-গ্রন্থ। কল্যাণী ঘোষ অনুবাদ করেছেন ‘এ পরবাসে’ এবং ‘শনিবারের পরের দিন’ (প্যাপিরাস) শিরোনামে মার্কেসের দুটো বই। মিলনকান্তি ব্রহ্মচারী মূল স্প্যানিশ থেকে অনুবাদ করেছেন ‘আমার বিষণ্ন বারবিলাসিনীদের কথা’ (অনুষ্টুপ), অরুন্ধতী ভট্টাচার্যের ভাষান্তরে বেরিয়েছে ‘আমার বিষণ্ন বেশ্যাদের স্মৃতি’ (উর্বী প্রকাশন)। রবিন ঘোষের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে ‘গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের নির্বাচিত গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ-সাক্ষাত্কার’ (বিজ্ঞাপন পর্ব)। কামারুজ্জামান ‘বলে যাই বলে যাবো’ (কবিতীর্থ) নামে এ বছরই অনুবাদ করেছেন মার্কেসের আত্মজীবনী, ভবানীপ্রসাদ দত্ত কুলপতির কালো কার্তিক’ শিরোনামে মার্কেসের একটি বই অর্ধাংশ অনুবাদ করেছিলেন বলে তাঁর অনূদিত বই পাবলো নেরুদার অনুস্মৃতি-র ভূমিকা থেকে জানা যাচ্ছে।
উত্পল ভট্টাচার্য সম্পাদিত কবিতীর্থ লিটলম্যাগ ২০০৮ সালে প্রকাশ করে মার্কেস সংখ্যা। এই সংখ্যায় মার্কেস অনুবাদ ও বিশ্লেষণের পাশপাশি বিশেষ আকর্ষণ ছিল অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়কৃত ‘আমার স্মৃতির বিষাদ গণিকারা’ শীর্ষক উপন্যাস অনুবাদ যা ২০১২-তে পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয়। এছাড়া সুখেন্দ্র ভট্টাচার্য সম্পাদিত লিটলম্যাগ আন্তর্জাতিক ছোটগল্প (২০০২) এবং রবিন ঘোষ সম্পাদিত বিজ্ঞাপন পর্ব লিটলম্যাগও মার্কেসকে নিয়ে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করে।
এছাড়া পশ্চিমবঙ্গে মার্কেস অনুবাদ ও পর্যালোচনায় ব্রতী হয়েছেন শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়, পার্থপ্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায়, গৌতম চক্রবর্তী, শুভ চট্টোপাধ্যায়, জয়া চৌধুরীসহ আরো অনেকে।
১৯৯২ সালে প্রকাশিত হয় বিশিষ্ট কথাকার সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘কলেরার দিনগুলিতে প্রেম’। মার্কেসের উপন্যাসের নামের সঙ্গে নিজ উপন্যাসের নাম-সাযুজ্যকে তিনি উদ্যাপন করেন এভাবে—
‘...নামকরণে গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ‘‘লাভ ইন দ্যা ডেজ অফ কলেরা’’ গ্রন্থ-নামটি বাংলায় ব্যবহার করেছি। কারণ, এছাড়া এই কাহিনীর আর কোনো নাম হতে পারত না। বলাবাহুল্য, নামে ছাড়া, বইটির সঙ্গে এ রচনার আর কোনো সম্পর্ক নেই। অন্তত, থাকার কথা নয়। কেননা, নাম শুনলেও, বইটি এখনো হাতে আসেনি। একই নামের দুজন মানুষ থাকে। একই নামের দুটি বই। থাক না!’
(সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস একাদশ, প্রতিক্ষণ ১৯৯৭)
এছাড়া সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের ডায়েরিতেও মার্কেস উঠে আসেন বিমুগ্ধতায়—‘মার্কেসের গল্পে নায়ক বা নায়িকার নাম প্রায়ই প্রথম বাক্যেই এসে যায়। তারপর চরিত্র আসে। যেমন, ‘‘দ্য ফার্স্ট থিং সেনোরা প্রুডেনসিয়া লিনেরো নোটিসড...’’, ‘‘ওয়ান স্প্রিং আফটারনুন, হোয়াইল মারিয়া দে লা লুজ সার্ভেন্টেস ওয়জ ড্রাইভিং অ্যালোন, হোয়েন...’’ এমন কত উদাহরণ দেওয়া যায় তাঁর গল্প থেকে। উপন্যাসেও এর অন্যথা নেই। ‘‘ক্রনিকল অফ এ ডেথ ফোরটোল্ড’’, শুরুই হয়েছিল নায়ক নাদারের নাম দিয়ে, যে খুন হবে। ফার্স্ট নেমটা কী যেন। আর কলেরায় ডা. হুবিনাল উরবিনোর অবতরণ প্রথম বাক্যের ঠিক পরেরটিতে। একজন লেখক বড় একখানা উপন্যাসের প্রতিটা বাক্যেই এত ঠিকঠাক লেখেন কী করে। বিধাতা পুরুষ বললে বলা যেতে পারে। বাকসিদ্ধ বললে আরও ঠিক হয়। ক্রনিকল-এর কথাই ধরা যাক না কেন। এই ছোট্ট বইয়ের শব্দ-শৃঙ্খলার কাছে বর্ষার বাস্তুত্যাগী পিপীলিকা শ্রেণিও লজ্জিত।’ (সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের ডায়েরি, সম্পা. অদ্রীশ বিশ্বাস, প্রতিভাস ২০০৯)।
মার্কেস; বাংলাদেশে
চর্চায়
বাংলাদেশের বিশিষ্ট মার্কসবাদী সাহিত্যসমালোচক রণেশ দাশগুপ্ত ‘মার্কোয়েজের অনন্য উপন্যাস একশ বছরের নিঃসঙ্গতা নিয়ে কিছু প্রশ্ন’ প্রবন্ধে মার্কেসকে মার্কসবাদী সাহিত্যতত্ত্বের আলোকে ব্যাখ্যা করেন সবিস্তারে—‘লাতিন আমেরিকার একদিক দিয়ে বিবেচনা করলে বিশ শতকের দ্বিতীয় মহাজাগরণের পালা চলছে। উনিশ শতকে সিমোন বলিভার থেকে শুরু করে হোসে মার্তি পর্যন্ত যেসব মুক্তিযোদ্ধার সাধনা শত শত বছরের সামাজিক অচলায়তনের হেরফেরে কবরস্থ হয়েছিল, তার পুনরুত্থান ঘটেছে। সেজন্যে লাতিন আমেরিকার মানুষ আজ বাস্তবতার গভীরে যেতে চাইছে। উপন্যাস যত গভীরে যেতে পারে, ইতিহাস কিংবা অন্য কোনো খতিয়ান ততটা পারে না। মার্কোয়েজের উপন্যাসটিতে সেই অঙ্গীকার রয়েছে। এই কারণে ধ্বংস ও বিপর্যয় দিয়ে শেষ হলেও বইটি পুনরুত্থানকেই প্রতিফলিত করেছে।’ (শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ; রণেশ দাশগুপ্ত, সম্পাদনা : সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ, কথাপ্রকাশ ২০১৩)।
কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক ১৯৮১ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ ‘কথাসাহিত্যের কথকতা’-তে ‘মহাদেশের কথক : গাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ’ প্রবন্ধে বলেন—‘ইতিহাসের ফাঁদ, অর্থনীতির ফাঁদ, স্বৈরতন্ত্রের ফাঁদ, সাম্রাজ্যবাদের ফাঁদ, ভাগ্যের চাকার ফাঁদ, সম্পূর্ণ নির্দোষের অজানা ফাঁদ—আর সেই বিশাল মহাদেশি ফাঁদ—যার হাত থেকে নিস্তার নেই আজকের পৃথিবীতে কারও। তারই গল্প লেখেন বটে সেই মার্কেজ যিনি মানুষের অবসান অস্বীকার করেন আর বিশ্বাস করেন এখনও সময় আছে, দ্বিতীয় সুযোগের, সময়ের মধ্যে ঢোকার।’
কবি-গদ্যকার বেলাল চৌধুরী কেবল মার্কেস অনুবাদকই নন, মার্কেস নিয়ে বাংলা প্রবন্ধ-লেখকদের পুরোধা একজনও বটে। তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ ‘পূর্ণ মণিজালে’ (শুদ্ধস্বর ২০১৪)-তে মার্কেস বিষয়ে ‘যত কলরব জীবনের’ প্রবন্ধ ছাড়াও মার্কেসের বিশিষ্ট অনুবাদক গ্রেগরি রাবাসা বিষয়ে ‘গ্রেগরি রাবাসার সোনার চাবি’ শীর্ষক অনুসন্ধানী নিবন্ধও স্থান পেয়েছে। এছাড়া ‘লাতিন আমেরিকান শিল্পসাহিত্যের চারিত্র্যলক্ষণ এবং লাতিন আমেরিকান উপন্যাসের স্বৈরশাসকেরা’ প্রবন্ধেও অনিবার্যভাবে উঠে এসেছেন মার্কেস।
বেলাল চৌধুরীর মার্কেস পরিবীক্ষণের কয়েকছত্র—‘মার্কেজের জীবনে আরও বেশি প্রভাব ফেলেছিল অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল এবং কলম্বিয়ার গৃহযুদ্ধে দীর্ঘকালের অভিজ্ঞ সৈনিক তাঁর ঠাকুর্দা নিকোলাস মার্কেজ ইগুয়ানার। কলম্বিয়া দেশটি এমনিতেই হচ্ছে উগ্রতা আর হিংসাত্মক কার্যকলাপের ইতিহাসে ভরপুর। একদিকে যেমন নানা বৈচিত্র্যপূর্ণ আবহাওয়া, মনোরম দৃশ্যের সমাবেশ অন্যদিকে তেমনি তেমনি রয়েছে প্রকৃতির প্রতিকূল হিংস্রতা আর যুদ্ধবিগ্রহ। এ দুটি থিমকেই মার্কেজ তাঁর গল্পে চমত্কারভাবে ব্যবহার করে সম্পূর্ণ নতুন একটি মাত্রা সংযোজন করতে সক্ষম হয়েছেন। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের অধিবাসীদের ওপর উদগ্র গ্রীষ্মতাপ আর ক্রান্তীয় বৃষ্টির অস্বভাবী প্রভাবকে নিপুণ দক্ষতায় প্রত্যক্ষ করে তুলেছেন। চোখ তুললেই পাঠক দেখতে পান একটা গোটা দেশ ও তার জনজীবনকে।’ (যত কলরব জীবনের)
কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন তাঁর ‘লাতিন আমেরিকার উপন্যাস’ প্রবন্ধে মার্কেসের ভুবনকাঁপানো উপন্যাস ‘শতবর্ষের নিঃসঙ্গতা’ নিয়ে বলেন—‘...এখানে একটি জাতিকে আবিষ্কার করা হয়েছে। বলে দেওয়া হয়েছে এই লাতিন আমেরিকা, এই তার বৈশিষ্ট্য, এই তার স্বকীয়তা—আপন ঐতিহ্যে ফিরে যাবার এই প্রবণতা বিদেশি প্রভাব থেকে জাতিকে মুক্ত রাখার বাসনায় উচ্চকিত হয়... তাই এ উপন্যাস এক মহাকাব্যিক গাথা-এ গাথা শুধু ব্যক্তিজীবন কেন্দ্রিক নয়—সমাজ এবং রাষ্ট্র গভীরভাবে জড়িত বলে এর সীমানার ব্যাপক উত্তরণ ঘটে শৈল্পিক সিদ্ধিতে। মানুষ তার পিপাসা মেটায় আপন দর্পণে নিজের মুখ দেখে’। (স্বদেশ ও পরবাসী , ১৯৮৫)
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম তাঁর বিখ্যাত সাহিত্য-কলাম অলস দিনের হাওয়ায় ‘গার্সিয়া মাকের্জের একটি অপহরণের সংবাদ’ শিরোনামে প্রবন্ধ লিখেছেন।
রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী মার্কেস বিশ্লেষণ করেছেন নানান লেখাপত্রে। ‘জগতের সবচেয়ে আশ্চর্য সুন্দর গল্পকথক’ বিশেষণে মার্কেসকে তিনি খুঁজে পান সৃষ্টিশীলতার অভূত ইন্দ্রজালে—‘একদিন আমরা সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়বো, কোনো সন্দেহ নেই যে গাবো আর তাঁর মাকোন্দো তখনো জেগে থাকবেন আবহমানকালের ইন্দ্রজাল হয়ে।’ (‘আমার দুঃখভারাক্রান্ত বেশ্যাদের স্মৃতিকথা’ গ্রন্থের অনুবাদকের ভূমিকাংশ)
রাজু আলাউদ্দিন ‘মিল-অমিলের মানিক ও মার্কেজ’ প্রবন্ধে লাতিনের মার্কেস ও বাংলার বিশিষ্ট কথাশিল্পী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসভুবনের তুলনামূলক আলোচনা করেছেন।
হাসান ফেরদৌস একটু ভিন্ন পরিসরে ‘মড়কের সময়ে প্রেম’ শিরোনামে মার্কেসের ‘লাভ ইন দ্যা টাইম অব কলেরা’-র ভিত্তিতে ব্রিটিশ পরিচালক মাইক নেওয়েল নির্মিত চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনা করেছেন। মার্কেসের অসাধারণ এই উপন্যাসের চলচ্চিত্ররূপ হাসান ফেরদৌসের পর্যবেক্ষণে ধরা পড়ে এভাবে—‘...নেওয়েল একজন অনুগত দাসের মতো উপন্যাসের ঘটনাক্রম অনুসরণ করেছেন, কিন্তু সে কাহিনীতে জীবন সঞ্চারে সক্ষম হননি। আসলে ব্রিটিশ এই পরিচালক মার্কেজের প্রেমের গূঢ়তাই উদ্ধার করতে পারেননি, তাঁর অন্তর্গত লাতিন চরিত্র তাঁর পক্ষে বোঝা সম্ভব হয়নি।’ (দৃশ্যকাব্য, সন্দেশ ২০১০)
লাতিন আমেরিকাকেন্দ্রিত সাহিত্যপত্র সিন্দাবাদ (সম্পাদক : রাজু আলাউদ্দিন, রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী, আলীম আজিজ, দিলওয়ার হাসান, ধ্রুব এষ, ২০১১) তাঁর প্রথম সংখ্যা বের করে মার্কেসকে উপজীব্য করে। এই সংখ্যায় প্রথম গল্পসহ মার্কেসের চারটি গল্প, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে বিষয়ে মার্কেসের লেখা, প্লেবয় পত্রিকায় প্রদত্ত সাক্ষাত্কার, মার্কেস বিষয়ে ফিদেল ক্যাস্ত্রো, কার্লোস ফুয়েন্তেস, মারিও বার্গাস ইয়োসা, মিলান কুন্ডেরা, পপ তারকা শাকিরার লেখা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। মূল স্প্যানিশ ও ইংরেজি অনুবাদ থেকে এসব লেখাপত্রের বাংলা ভাষ্য প্রণয়ন করেছেন রাজু আলাউদ্দিন, রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী, আলম খোরশেদ, দিলওয়ার হাসান, শওকত হোসেন, জুয়েল মাজহার, এহসানুল কবীর প্রমুখ।
এছাড়া বাংলাদেশে মার্কেসকে নিয়ে নানা সময়ে লিখেছেন বিপ্রদাশ বড়ুয়া, খালিকুজ্জামান ইলিয়াস, আলী আহমদ, দাউদ হায়দার, আলম খোরশেদ, সৈয়দ শহীদ, মুহম্মদ মুহসিন, মনজুরুল হক, হাসান ফেরদৌস, মাসুদুজ্জামানসহ আরো অনেকে।
বিপুল ভাষান্তর
বাংলাদেশে মার্কেসের গ্রন্থাবলি অনুবাদে সন্দেশ প্রকাশনা সংস্থা বিশেষ ভূমিকা পালন করে চলেছে। সন্দেশ থেকে প্রকাশিত জি এইচ হাবীবের অনন্য অনুবাদ ‘নিঃসঙ্গতার একশ বছর’ বাংলা অনুবাদ সাহিত্যে এক বলবান সংযোজন হিসেবে ইতিমধ্যে সুধী পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এছাড়া সন্দেশ থেকে প্রকাশিত মার্কেসের বইপত্রের মধ্যে রয়েছে বেলাল চৌধুরী অনূদিত ‘মৃত্যুর কড়ানাড়া’, আলী আহমদ অনূদিত ‘প্রেম ও অন্যান্য দানব’, ‘বারো অভিযাত্রীর কাহিনী’, সালেহা চৌধুরী অনূদিত ‘সরলা এরেন্দিরা ও অন্যান্য গল্প’, সুরেশরঞ্জন বসাক অনূদিত ‘একটি অপহরণ সংবাদ’, অদিতি ফাল্গুনী অনূদিত ‘গোত্রপিতার হেমন্ত’, অঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায় অনূদিত আমার ‘স্মৃতির বিষাদ গণিকারা’, মোরশেদুর রহমান অনূদিত ‘গোলকধাঁধায় সেনাপতি’ ইত্যাদি।
প্রখ্যাত অনুবাদক প্রয়াত কবীর চৌধুরী ‘লাভ ইন দি টাইম অব কলেরা’ অনুবাদ করেছেন ‘প্রেম ও কলেরা’ (প্রকাশক. সময় প্রকাশন-ঢাকা ও প্রতিভাস-কলকাতা) শিরোনামে। এছাড়াও তিনি অনুবাদ করেছেন ‘ক্রনিকল অব এ ডেথ ফোরটোল্ড’ (প্র. ঐতিহ্য)।
খালিকুজ্জামান ইলিয়াস মার্কেসের সংলাপ সংকলন অনুবাদ করেছেন ‘পেয়ারার সুবাস’ (প্র. মাওলা ব্রাদার্স) নামে। সুরেশ রঞ্জন বসাকের অনুবাদে বেরিয়েছে ‘গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ছোটগল্প’ (প্র. দিব্যপ্রকাশ)
রফিক-উম-মুনীর চৌধুরী মূল স্প্যানিশ থেকে ভাষান্তর করেছেন ‘আমার দুঃখভারাক্রান্ত বেশ্যাদের স্মৃতিকথা’ (প্র. প্রথমা প্রকাশন) এছাড়া এবছরই তাঁর অনুবাদে শুদ্ধস্বর থেকে প্রকাশিত হয়েছে মার্কেস ও মারিয়ো বার্গাস ইয়োসার লাতিন আমেরিকার উপন্যাস বিষয়ক সংলাপের বই।
তপন শাহেদ মার্কেসের বিপুলায়তন আত্মজৈবনিক গ্রন্থ Living to tell the tale অনুবাদ করেন ‘বেঁচে আছি গল্পটা বলবো বলে’ (প্র. নান্দনিক) শিরোনামে।
আনোয়ার হোসাইন মঞ্জু অনুবাদ করেছেন ‘মেমোরিজ ওফ মাই মেলানকোলি হোরস’ (প্র. ঐতিহ্য)। শরিফুজ্জামান ভূঁইয়া অনুবাদ করেছেন ‘ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অব সলিচিউড’ (প্র. জোনাকি প্রকাশন)। ঐতিহ্য থেকে অশোক দাশগুপ্তের ভাষান্তরে বেরিয়েছে ‘দি স্টোরি অফ এ শিপরেকড সেইলর’, ‘নো ওয়ান রাইটস টু দি কর্নেল’, ‘ইন ইভিল আওয়ার’, ‘অব লাভ অ্যান্ড আদার ডেমনস’।
বাংলা ভাষান্তরকবৃন্দ মূলত গ্রেগরি রাবাসা, এডিথ গ্রসম্যান, রেনডলফ হোগান প্রমুখ ইংরেজি অনুবাদকদের সূত্রে বাংলায় এনেছেন কদলিবাগিচার কুহকি কথককে।
প্রভাব-বিভাব
বাংলাদেশের নতুন ধারার অনন্য কথাশিল্পী প্রয়াত শহীদুল জহির এক সাক্ষাত্কারে বলেন—‘...আমি আসলে বর্ণনার টাইমফ্রেমটাকে ভাঙতে চাচ্ছিলাম এবং সময়ের এক তল থেকে অন্য তলে অনায়াসে যাতায়াত করতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু ট্র্যাডিশনাল ধারায় আমি তা পারছিলাম না। আমার খুবই কষ্টকর এবং ক্লান্তিকর মনে হচ্ছিল। মানে এইখানে শুরু করতে হবে, এইখানে শেষ করতে হবে—এই রকম আমার কাছে ক্লান্তিকর মনে হচ্ছিল। তো মার্কেসের ‘‘হানড্রেড ইয়ারস অব সলিচিউড’’ পড়ে আমি দেখলাম, তিনি অনায়াসে সময়ের একতল থেকে আরেক তলে যাতায়াত করছেন।’ (আহমাদ মোস্তফা কামালের সঙ্গে সাক্ষাত্কারে শহীদুল জহির; শহীদুল জহির সমগ্র, পাঠক সমাবেশ ২০১৩)
মার্কেস যেমন জাদু বিস্তার করে গেছেন আমাদের কোনো কোনো কথাসাহিত্যিকের অন্তর্মহলের কাঠামোয় তেমনি নবীন-প্রবীণ অনেক লেখকের গল্প-উপন্যাসের নামকরণেও তাঁর অন্তর্লীন প্রভাব চোখে পড়ে।
কথাসাহিত্যিকদের পাশাপাশি কবিদের আবাহনেও এসেছেন মার্কেস। কবি রুবী রহমান ‘মার্কেসের কাছে ঋণ স্বীকার করে’ লেখা কবিতায় ব্যক্তিজীবনের কলেরামুহূর্তকে মার্কেসীয় অনুধ্যানে শব্দরূপ দেন এভাবে—‘কলেরার পদপ্রান্তে বসে আছে/ জ্বরতপ্ত ক্লান্ত ভালোবাসা’ (কলেরার সময়ে ভালোবাসা, কান পেতে আছি মৌমাছি, ২০০৬)।
আবার কবিতার সাথে সমকালীন বাংলা টিভিনাটকেও ভাস্বর দেখি কলম্বিয়ান মার্কেসকে। মার্কেসের গল্প অবলম্বনে অমিতাভ রেজা নির্মাণ করেছেন নাটক ‘একটা ফোন করা যাবে প্লিজ’।
বহমান মার্কেস
মার্কেসের মৃত্যুর পর বাংলা সংবাদ-সাময়িকপত্র থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের বিপুল প্রতিক্রিয়াকে আমরা কেবল আনুষ্ঠানিক বলে মনে করি না, বরং তাঁর আখ্যানের ইন্দ্রজালে গল্পের মতো জীবন আর জীবনের মতো গল্প খুঁজে পাওয়া যায় বলেই গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস মৃত্যুর পর আরো বিপুলভাবে বেঁচে ওঠেন আমাদের পাঠ-পাঠান্তরে।