দুর্নীতিবাজদের পরিনতি হবে ভয়াবহ

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। আল্লাহপাক মানুষকে নিজের সৌন্দর্য ও সুরত দ্বারা পয়দা করেছেন। অতঃপর তাকে উন্নত বিবেক, বুদ্ধি ও আত্মাদান করেছেন। আবার বাতেনীভাবে পাক পরোয়ারদেগার মানুষের সেই আত্মার সপ্তম স্তর নাফসীর মাকামে অবস্থান নিয়েছেন। মানুষকে আল্লাহপাক জগতে প্রেরণ করে তাঁর চোখে চোখে রেখেছেন। মানুষ প্রকৃত সাধনার পথ তাসাওফের অনুসন্ধানী না বলেই আল্লাহপাককে লাভ করতে পারছে না। কিন্তু সুফিসাধকগণ সেটি করতে পারেন অনায়াসে কারণ তাঁরা আল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগের কৌশল ও পদ্ধতি আয়ত্ব করতে সক্ষম। আর যারা আত্মোন্নয়নের শিক্ষা থেকে বিমুখ রয়েছেন তারা বিপথে পরিচালিত হচ্ছেন। ফলে তারা জীবন-জীবিকার জন্য কতই-না খারাপ পথে পা বাড়াচ্ছেন। জগত সংসারে খারাপ পথে টাকা উপার্জনের যতগুলো পথ রয়েছে তার মধ্যে দুর্নীতি হচ্ছে অতি জঘণ্যতম। কেননা ইহা অসত্ উপার্জনের এমন একটি প্রক্রিয়া বা রাস্তা যা নিজে থেকে ফন্দি-ফিকির করে বের করতে হয়। যেমন- একটি পুল নির্মাণে, নতুন রাস্তা তৈরি বা মেরামতে, পেনশনের টাকা গ্রাহককে দিতে, বিদেশী সংস্থাকে কাজ পাইয়ে দেওয়া ইত্যাদি মাধ্যম থেকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা নিয়ন্ত্রক দুর্নীতি করে মোটা অংকের টাকা আত্মস্বাত্ করে থাকেন। টাকার নেশায় এসব কর্মকর্তা অনিয়ম দ্বারা এতটাই অধপতনে চলে যান যে, আল্লাহ ও রসূল (স.) এর ভয় ও আদেশ নিষেধ তারা মানেন না। অথচ আল্লাহপাক এরশাদ করেছেন, “তোমারা উত্তম ও পবিত্র বস্তু খাও, যা আমি তোমাদের জীবিকারূপে দান করেছি” (আল বাকারা : ১৭২)। হালাল বা বৈধ উপার্জনই কেবলমাত্র আল্লাহ ও রসূল (স.) কর্তৃক অনুমোদিত। হালাল উপার্জনে জীবনের কল্যাণ নিহিত। আর হারাম আয়ে রয়েছে অশান্তি ও পরকালের অকল্যাণ। পরকালে দুর্নীতিবাজদের কঠোর শাস্তি ও অনন্তকালের লানত বা ভোগান্তি হবে। আল্লাহপাক মানুষ সৃষ্টি করেছেন তার এবাদতের জন্য, হালাল উপার্জন ভক্ষণের জন্য অথচ সে মানুষ যদি অর্থের মোহে পড়ে কোন কিছুর বাদ বিচার না করে দুর্নীতি পরায়ণ হয়ে পড়ে, তখন আল্লাহ তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। মানুষ যখন নিজের মনুষত্বকে ভুলে পাপের দিকে ধাবিত হয়, তখন সে বিবেক বর্জিত হয়ে পড়ে। মানুষের ভেতরে ষড়রিপু রয়েছে। ষড়রিপু বলতে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাত্সর্য ইত্যাদিকে বুঝায়। এই কুরিপুসমূহের তাড়নায় পড়ে মানুষ খারাপ পথে পা বাড়ায়। যেমন কাম রিপুর ফলে জেনা করে, ক্রোধের জন্য মারামারি করে আর লোভ রিপুর জন্য করে চুরি তথা দুর্নীতি। কিন্তু মানুষ যদি কুরিপুমুক্ত হওয়ার জন্য আত্মশুদ্ধি লাভের শিক্ষা গ্রহণ করে তবে সে দুর্নীতিবাজ হয় না। দুর্নীতি এক ধরণের ব্যাধি। এই ব্যাধি আজ আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে গেছে। একে দূর করতে হলে রাষ্ট্রীয় ব্যাবস্থাপনায় আত্মোন্নয়নের শিক্ষা সুফিবাদকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। ধ্যান-মোরাকাবার জন্য অলীআল্লাহগণের পরামর্শ নিয়ে আত্মশুদ্ধির প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। তবেই ব্যক্তির বাতেন বা ভেতরটা শুদ্ধ হবে। ব্যক্তি শুদ্ধ হলে সমাজ শুদ্ধ হবে, সমাজ শুদ্ধ হলে রাষ্ট্র শুদ্ধ হবে, আর তাতেই আসবে প্রকৃত কল্যাণ ও শান্তি। এমন একটি পদ্ধতি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় চালু হলে বড় বড় দূর্নীতির পথে পা বাড়ানোর বদ মানুষ আর থাকবে না। সুন্দর চরিত্রের অধিকারি হবেন এসব সংস্থার কর্তা ব্যক্তিরা। যারা দুর্নীতির পথে ধাবিত হয় তাদের স্থান হবে পরকালে জাহান্নামে। অবশ্য তাদের দুনিয়াও জাহান্নামের কোন অংশে কম নয়। কবি বলেছেন, ‘কোথায় স্বর্গ, কোথায় নরক, কে বলে তা বহুদূর? মানুষেরি মাঝে স্বর্গ নরক, মানুষেতে সুরাসুর!’ অর্থাত্ এক অর্থে দুনিয়াই স্বর্গ দুনিয়াই নরক। তাই আল্লাহর এই জমিনেও দুর্নীতিবাজদের জন্য চরম অপমান এবং শাস্তি রয়েছে। কেননা আল্লাপাক কুরআনে বলেছেন, “বলুন হে আল্লাহ! তুমিই মালিক সার্বভৌম শক্তির, তুমি যাকে ইচ্ছা রাজ্য দাও, আর যার কাছ থেকে ইচ্ছা রাজ্য কেড়ে নাও, যাকে ইচ্ছা তুমি সম্মানিত কর এবং যাকে ইচ্ছা অপমানিত কর। সমস্ত কল্যান তোমারই হাতে, নিশ্চয় তুমি সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান” (আল ইমরান : ২৬)। কর্মজীবনে যারা দুর্নীতি করছেন এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা পঙ্গু, প্যারালাইসিস ও কঠিন রোগগ্রস্থ হয়ে নিকৃষ্ট পশুর চেয়েও কষ্টে আছেন। শুধু টাকা দিয়েই সব হয় না, জগতে আল্লাহ যার প্রতি রুষ্ট হন তার ভোগান্তির কোন সীমা থাকে না। এটা কেবল ভুক্তভোগিরাই অনুধাবন করতে পারেন। কারণ আল্লাহর বিধানের বাইরে চলার উপায় নেই কোন মানুষের। তারপরও যারা অহংকার করে যৌবনের, দাম্ভিকতা দেখায় নিজের প্রভাব ও পদবীর। আর ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতির পথে অঢেল সম্পদ বানায় তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে কঠিন শাস্তি। এ শাস্তি এতই জঘণ্য হবে যে, কাল হাশরের মায়দানে আল্লাহ তাদের দিকে ফিরেও তাকাবেন না। এবং এর চেয়ে নিকৃষ্ট জীবন আর কার হতে পারে? মহানবী (স.) বলেন, “হারাম খাদ্য পরিপুষ্ট যে মাংস, নরকাগ্নিই তার উত্তম স্থান।” মানুষকে আল্লাহ নিজের গুপ্ত রহস্য বলে আখ্যা দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, “আমি মোমেনদের অভিভাবক।” আল্লাহজাল্লাশানু যার অভিভাবক হন তার ত্রিভুবনে আসলে কিছু কী চাওয়া-পাওয়ার থাকে? অথচ সেই মানুষ অর্থের লোভে দুর্নীতির মত নিকৃষ্ট পাপের পথ বেছে নেয়। যারা মোমেন হন তারা মেধা, শ্রম ও এলহাম দ্বারা জীবন পরিচালিত করে সম্পদ রাজি গড়ে তুলতে পারেন। তাদের দুর্নীতি বা পাপ পথে পা ফেলতে হয় না। হযরত রসূল (স.) বলেন, “দুই হাতের উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে উত্তম খাদ্য কেউ কোন দিন খায় নি” (বুখারী)।