শ্রদ্ধা ভালবাসা আর প্রতিবাদমুখর রানা প্লাজা চত্বর

কবিতাপাঠ, শোক শোভাযাত্রা, মোমবাতি প্রজ্বলন, ফুলেল শ্রদ্ধা আর ভালবাসায় স্মরণ করা হলো রানা প্লাজা ধসে হতাহতদের। একই সঙ্গে জানানো হল প্রতিবাদ। গতকাল বৃহস্পতিবার ভোর থেকেই বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন, হতাহত এবং নিখোঁজদের স্বজনেরা ভিড় জমায় রানা প্লাজার সামনে। রানা প্লাজার সামনে নির্মিত বেদীতে তারা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়। একই সঙ্গে ২৪ এপ্রিলকে তৈরি পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের নিরাপত্তা দিবস ও রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা, রানা প্লাজার শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি পুনর্বাসনের দাবি, নিখোঁজ শ্রমিকদের সন্ধান এবং ঘটনার সাথে জড়িতদের বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ চলে দফায় দফায়। সকাল থেকেই রানা প্লাজার সামনে প্ল্যাকার্ড ও নিখোঁজদের ছবি হাতে স্বজন হারাদের আত্মচিত্কার করতে দেখা গেছে। রানা প্লাজার সামনে জনস্রোতে পুত্রের ছবি হাতে ছুটে বেড়িয়েছেন নিখোঁজ শ্রমিক লিটনের মা নাছিমা বেগম। তিনি চিত্কার করে বলতে থাকেন, আমার ছেলেকে যারা মারছে, আমি তাদের ফাঁসি চাই। আমি কিভাবে কাকে নিয়ে বাঁচবো তার উত্তর চাই। শ্রমিক শান্তা আক্তারের মা সাহিদা বেগম মেয়ের ছবি হাতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন আর উন্মাদের মতো বলছেন, মেয়েটাকে জীবিত কিংবা মৃত পেলাম না। আমার মেয়েকেতো কবরও দিতে পারলাম না। ভোর থেকে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের পাশে রানা প্লাজার শ্রমিকরা ভিড় করে। এ সময় ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে। সকালে ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক শেখ ইউসুফ হারুন, পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান, শিল্প পুলিশ-১ এর পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কামরুল হাসান মোল্যা রানা প্লাজার বেদীতে পুস্পস্তবক অর্পণ করেন। পর্যায়ক্রমে গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের মোরশেফা মিশু, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান খান, সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের নাজমা আক্তার, গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়ক জুনায়েদ সাকি, বাংলাদেশ গার্মেন্টস এন্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের রফিকুল ইসলাম সুজন, গার্মেন্টস শ্রমিক ফ্রন্ট, বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতি, জাতীয় শ্রমিক লীগসহ ২৫টি শ্রমিক সংগঠন ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিনিধিরা বেদীতে ফুল দেয়। কর্মসূচি চলাকালে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন কালো পতাকা হাতে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে রানা প্লাজার আশেপাশে ২ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে শোক মিছিল বের করে। অনেকে মহাসড়কে শুয়ে পড়ে এ ঘটনার প্রতিবাদ জানায়। শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বলেন, ১ বছর হয়ে গেল। এখনও নিখোঁজ, নিহত-আহত শ্রমিকদের প্রকৃত তালিকা প্রকাশ করেনি বিজিএমইএ বা সরকার। গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের পক্ষ থেকে রানা প্লাজার মালিক ও ৫ কারখানার মালিকের নামে হত্যা মামলা দায়ের করে শ্রমিক হত্যাকারী হিসেবে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত, নিহত ও নিখোঁজদের প্রত্যেকের পরিবারকে ৪৮ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ, আহত শ্রমিকদের উপযুক্ত চিকিত্সার ব্যবস্থা ও পঙ্গু শ্রমিকদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা, রানা প্লাজার জায়গায় শ্রমিকদের স্মৃতি সৌধ নির্মাণের দাবি জানানো হয়। অধর চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ে মিলাদ মাহফিল রানা প্লাজার নিহতের আত্মার শান্তি ও আহতদের সুস্থতা কামনায় সাভার অধর চন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয়ে মিলাদ মাহফিল ও দোয়ার আয়োজন করা হয়। ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুদ চৌধুরী এ দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করেন। মোমবাতি প্রজ্বলন রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির এক বছর পূর্তি উপলক্ষে নিহতদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বলন করেছে জাতীয় শ্রমিক লীগসহ বেশ কয়েকটি সংগঠন। সন্ধ্যায় রানা প্লাজার সামনে ১১৩৫টি মোমবাতি প্রজ্বলন করেন তারা। যশোরে দোয়া মাহফিল যশোর অফিস জানায়, রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির বর্ষপূর্তি উপলক্ষে যশোরে দোয়া মাহফিল এবং ওই দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত যশোরের বাসিন্দাদের মধ্যে সহায়তা প্রদান করেছে একটি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান। দিবসটি উপলক্ষে প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোগে গতকাল দুপুরে যশোর প্রেসক্লাব মিলনায়তনে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় হতাহত দুই পরিবারের মধ্যে সেলাই মেশিন বিতরণ করা হয়। অনুষ্ঠানে ঘোষণা দেয়া হয় বৃহত্তর যশোরের অন্য ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যেও একইভাবে সহায়তা দেয়া হবে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্তদের প্রত্যেক পরিবারের একজন করে সদস্য যোগ্যতা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটিতে চাকরি করতে পারবেন।