আবাদি জমি রক্ষা করতে হবে

বাংলাদেশের তিন-চতুর্থাংশ মানুষ সরাসরি কৃষি অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে অপরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প, শিল্পায়ন এবং নগরায়নের ফলে ক্রমশ কমছে আবাদি জমির পরিমাণ। একটি প্রতিবেদনের তথ্যসূত্রে জানা যায়, ২০০০ সালের পরে প্রতি বছর দেশের ৬৮ হাজার ৭৬০ হেক্টর চাষাবাদযোগ্য জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশে আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ৯.৭৬২ মিলিয়ন হেক্টর। গত ৩৮ বছরে এই জমির পরিমাণ কমেছে ১.২৪২ মিলিয়ন হেক্টর। আর জনসংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণ। অনেকেই বলে থাকেন— কৃষিজমির পরিমাণ কমে যাওয়ার পেছনে জনসংখ্যা বৃদ্ধি দায়ী। কিন্তু বাস্তব প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও নগরায়নের জন্য আবাদি জমি অকৃষিতে পরিণত হচ্ছে। এভাবে কৃষিজমি কমতে থাকলে ৬৮ শতাংশ মানুষের জীবন-জীবিকা চরম হুমকির মুখে পড়বে। বাংলাদেশে ১৭৬০০৮০৪ কৃষক পরিবার রয়েছে। তাদের শতকরা প্রায় ৬০ ভাগই প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষক। এই প্রান্তিক কৃষকেরা অপেক্ষা করে ধানের ফলনের জন্য আর ধানের আয়ের ওপর নির্ভর করে তৈরি হয় তাঁদের সংসারের আয়-ব্যয়ের বাজেট। কৃষিজমি অকৃষিতে রূপান্তরিত হওয়ায় এই প্রান্তিক কৃষকেরা সংসারের হিসাব মেলাতে পারছে না। ক্রমশ কৃষিজমি কমে যাওয়া দেশের মোট শ্রমশক্তিতে প্রভাব ফেলছে। এক হিসাবে দেখা গেছে—আর্থিকভাবে সক্ষম গ্রামীণ ২৫.১ মিলিয়ন শ্রমশক্তির ২৪ মিলিয়ন কর্মে নিয়োজিত এবং ১.১ মিলিয়ন বেকার। বাংলাদেশে শহরের তুলনায় গ্রামে বেকারের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে বেশি। দেশের মোট শ্রমশক্তির মধ্যে কৃষি খাতে নিয়োজিত শ্রম শক্তির (যাদের বয়স ১৫+) হার ১৯৯৫-৯৬ সালে ছিল ৬৩.২ শতাংশ, ১৯৯৯-২০০ সালে ছিল ৫১.৩ শতাংশ, ২০০২-২০০৩ ছিল ৫১.৭ শতাংশ, ২০০৫-২০০৬ সালে ছিল ৪৮.১ শতাংশ অর্থাত্ কৃষি খাতে শ্রমশক্তি কমছে। দ্রুত নগরায়নের কারণে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠছে ইটের ভাটা। সাধারণত বাংলাদেশের ছোট-বড় শহরগুলোর কৃষিজমিতে দেখা যায় এইসব ইটের ভাটা। রাজধানীর আশেপাশে পরিকল্পনাহীনভাবে ইট ভাটা গড়ে ওঠার বিরূপ প্রভাব পড়েছে পরিবেশের ওপর। বিশেষ করে বৃহত্তর ঢাকা জেলা, ময়মনসিংহ জেলার দক্ষিণাংশ ও টাঙ্গাইল জেলায় ফলদবৃক্ষের মড়ক দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাহাড় কেটে ইট তৈরি হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম শস্য ভাণ্ডার হলো বরেন্দ্র এলাকা। এখানেও দেখা যাচ্ছে যে, আবাদি জমির পাশে ইট ভাটা গড়ে উঠছে, রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ি উপজেলায় ফসলি জমিতে ইটের ভাটা তৈরি করা হচ্ছে। ইটের ভাটার প্রভাবে এখানকার জমির উত্পাদন ক্ষমতা ক্রমে ক্রমে হ্রাস পাচ্ছে । এভাবেই কমে যাচ্ছে কৃষিজমি। কৃষিজমি কমার কারণে গ্রামীণ বেকারত্ব বাড়ছে। দেশের মোট জনসংখ্যার ৯ কোটি ৮৯ লাখ লোক নিরঙ্কুশ দরিদ্র যার মাঝে ৫ কোটি ৭৫ লাখ চরম দরিদ্রতার মাঝে বসবাস করছে। মোট দরিদ্রের ৮২ শতাংশ লোক গ্রামে আর ১৮ শতাংশ শহরে বাস করে। এই বৃহত্তম জনগোষ্ঠী কৃষিকাজের ওপর নির্ভর করে জীবন-জীবিকা চালায়। গত দুই বছরে বাংলাদেশকে বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি করতে হয়নি দেশে পর্যাপ্ত খাদ্য উত্পন্ন হওয়ায় এবং এতে বিদেশ নির্ভরতা কমছে আর গ্রামীণ কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে। বিগত তিন-চার বছর ধরে খাদ্যমূল্য কম থাকায় জাতীয় মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি রোধ করা সম্ভব হয়েছে। তাই সরকারের উচিত দেশের কৃষিজমি সংরক্ষণের দিকে নজর দেওয়া এবং ভূমি ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা। যেখানে সেখানে কৃষিজমিতে যার খুশি যেমন তেমন ভাবে যাতে ইট ভাটা, অপরিকল্পিত শিল্প-কারখানা এবং আবাসন প্রকল্প গড়ে তুলতে না পারে সে ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। রাজশাহী