দক্ষিণাঞ্চলে শত শত ভবদহ তৈরি হচ্ছে
প্রকাশ : ২৫ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৩৬
জমিকে লবণাক্ততা ও প্লাবন থেকে রক্ষার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড দক্ষিণাঞ্চলের খালগুলোর পাড়ে বাঁধ এবং খাল স্লুইসগেট তৈরি করে। নব্বইয়ের দশক থেকে দক্ষিণাঞ্চলের জমি লবণাক্ততার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে, এলাকার জমিতে ফসলাদি ভালো হচ্ছে, জোয়ারকালে সব সময়ে জমি প্লাবিত না হওয়ায় জমির গুণগত মান বেড়েছে। কিন্তু স্লুইসগেটগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার অভাবে খালগুলোর গেটের ভেতর ও বাইরের উভয় অংশই ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ভরাট অংশ স্বাভাবিকভাবেই দখল হয়ে গাছপালা, বাড়িঘর, মসজিদ, মাদ্রাসা, গুচ্ছগ্রাম, ধান ও করাতকল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এভাবে মাত্র পঁচিশ-তিরিশ বছরেই খালগুলো মরণদশায় পৌঁছেছে, আগে দেখা খাল আর এখন চেনার উপায় নেই। পঞ্চাশ গজ প্রশস্ত খালের কোথাও কোথাও তা মাত্র বিশ গজ আছে। গেটের ভেতরের চেয়ে বাইরের অবস্থাই করুণ। আর বছর দশ পরে এসব খাল দিয়ে বর্ষার জল নিষ্কাশনই কঠিন হয়ে পড়বে। জল আটকে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে তা বাড়ি-ঘর-দোর ভাসিয়ে দেবে। তৈরি হবে ভবদহের মতো শত শত করুণ পরিণতির। একটি ভবদহ ব্যবস্থাপনায় গেছে অর্ধযুগ, জনভোগান্তির হিসেব নেই। আর তেমন শত শত ভবদহের ব্যবস্থাপনায় কত যুগ লাগবে কে জানে!
পটুয়াখালী সদরের মরিচবুনিয়া-বাজারঘোনার মধ্যবর্তী চৌট্টার খালপাড়ের বাসিন্দা আমি প্রায়ই বাড়ি যাই। শীত-বসন্ত যখনই যাই না কেন তখনই দেখি দু-চারদিন পরপরই গেট খোলা থাকে। আর জোয়ারের জলের সঙ্গে ভেতরে ঢোকা বালি ও পলি থিতিয়ে খালের তলা ভরাট হয়। এভাবে মাত্র পঁচিশ-তিরিশ বছরেই খালটি মরে এসেছে, তলায় প্রচুর জলজ আগাছা জন্মেছে। গেটের দায়িত্ব যাঁর হাতে তিনি শিক্ষিত, সচেতন ও সজ্জন। কিন্তু এলাকায় নানাভাবে গজিয়ে ওঠা মারদাঙ্গা লোকদের কাছে তিনি অসহায়, আমার বারংবার আপত্তিতে তিনি বিব্রত। বস্তুত প্রবল পরাক্রান্ত ব্যতিরেকে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করাও প্রায় অসম্ভব। কখনো মাছ ধরার জন্য, কখনো গাছ বের করার জন্য, কখনো রাস্তায় মাটি দেওয়ার জন্য, আবার কখনো কারণ ছাড়াই একবার গেট খোলা হলে আর বন্ধ হয় না। এভাবেই আত্মঘাতী খালপাড়বাসীরা তাঁদের জন্য বয়ে আনছেন ভবদহের মারাত্মক এক পুনরাবৃত্তি। খাল ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন ইউপি মেম্বারকে বিষয়টির ভবিষ্যত্ করুণ পরিণতি বোঝাতে চেষ্টা করলে তিনি আমাকে জানান যে সরকার থেকে টাকা বরাদ্দ করিয়ে তাঁরা খাল কাটাবেন। সভাপতিকে বলে কাজ হয় না, মেম্বারকে বলে কাজ হয় না, তাই কয়েক বছর আগে একবার গেলাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছে। তিনি চা খাইয়ে ভদ্রতা করলেন। কিন্তু কিছু করার প্রমাণ পেলাম না।
দক্ষিণাঞ্চলের পানি উন্নয়ন বোর্ড ব্যবস্থিত খালসন্নিহিত এলাকায় না হলেও অদূর ভবিষ্যতে যে করুণ পরিণতি অপেক্ষা করে আছে তাতে চোখ বুজে থাকার অবকাশ নেই। এখনই কর্মপরিকল্পনা স্থির করে কাজে না নামলে সর্বনাশ অনিবার্য। এ ব্যাপারে কর্মপরিকল্পনার জন্য কতিপয় বিষয় বিবেচনায় নেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি—এক. গেটের ভেতরে ও বাইরের পুরো খালের সীমানা চিহ্নিত করে ভরাট হওয়া অংশ থেকে সমস্ত স্থাপনা উচ্ছেদ করা এবং আর কোনো স্থাপনা করতে না দেওয়া যাতে কোনো বিষয় খাল খননে বাধা হতে না পারে। দুই. সুষ্ঠু গেট ব্যবস্থাপনার জন্য প্রতি দশ-পনেরোটি খালের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিজস্ব লোকবল নিয়োগ করে তার কাছে গেটের দাবি রাখা এবং কমিটি ও স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের যৌথ অনুমতি (মোবাইল মেসেজ) ছাড়া গেট না খোলার কড়া বিধান করা। তিন. বছরের কোন মাস থেকে কোন মাস পর্যন্ত গেট সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে তার একটা যৌক্তিক সীমা নির্দিষ্ট করা। এ সময় কোন পরিস্থিতিতে জল নামাতে হলে কেবলমাত্র জল নামানোর সুযোগ রাখা। চার. যাদের প্রয়োজনে অসময়ে একান্তই গেট খোলা হবে তাদের কাছ থেকে যৌক্তিক ফি আদায়ের ব্যবস্থা করা। পাঁচ. খাল এলাকায় খানাভিত্তিক করারোপ করে তহবিল সৃষ্টি করে রাখা যাতে প্রয়োজনে খাল খননে অর্থাভাব না হয়, গেট রক্ষকের বেতন তহবিল থেকে দেওয়া যায় এবং খাল ব্যবস্থাপনায় জনসচেতনতা তৈরি হয়। ছয়. বিকল্প হিসেবে যেসব খাল হেজেমজে গেছে সে সব খালের বাঁধ দু-তিন বছরের জন্য খুলে দিয়ে নাব্যতা আনা যায় কিনা সেটা বিবেচনা করে দেখা। কারণ যত নিয়ন্ত্রণ ও সতর্কতাই আরোপ করা হোক না কেন, দীর্ঘ মেয়াদে খাল ভরাট হতে হতে এক সময় বিপর্যয় অনিবার্য। অন্তত গেটের বাইরে খালের দীর্ঘ প্রবাহ থাকলে বাইরের নাব্যতা খালের স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রবাহ ছাড়া ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। সাত. একটি আইনি সুরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি যাতে খাল ব্যবস্থাপনায় যে কোনো বাধা ও অনিয়মে সহজে শাস্তি বিধান করা যায়। প্রথমে জরিমানা, পরে হাজতবাস, শেষে জেলদণ্ড। অতীব জনগুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়ে জরিপ পরিচালনা এবং কর্তৃপক্ষীয় ও জনসচেতনতা সৃষ্টিতে মিডিয়ার যথাযথ ভূমিকা আশা করছি।
পটুয়াখালী