ট্রেন যাত্রায় তিন অভিজ্ঞতা
প্রকাশ : ২৫ এপ্রিল ২০১৪, ২১:৩৬
কঙ্কন সরকার
এক. গাছ ও ছাত্রী
৪ এপ্রিল রেলপথে গন্তব্যে যেতে লালমনিরহাট স্টেশনে প্রবেশ করি। একটি ট্রেন মিস করি। পরবর্তী ট্রেন বেশ দেরি। ব্যক্তিগত কাজ করবার একটা সুযোগ এলো। অতএব ওভারব্রিজের ওপর দিয়ে যাচ্ছি পশ্চিম থেকে পূর্ব প্রান্তে। মাঝখানে পৌঁছেছি প্রায়। উলটো দিক থেকে তিন ছাত্রী আসছে বেশ হাস্যোজ্জ্বল মুখে কথা বলতে বলতে। পাশেই প্রায় দুটি মধ্যম আকারের মেহগিনি গাছ। নতুন পাতা গজিয়ে দ্যুতি ছড়াচ্ছে। কানে এলো—এক ছাত্রী গাছটি দেখিয়ে বলছে ওটি লিচুর গাছ না? অন্য একজন বলছে, হ্যাঁ লিচুর গাছ। দাঁড়ালাম। ওদের যেতে দেখলাম। ভাবনায় এলো—শহুরে তো তাই গাছ সম্পর্কে অত ধারণা নেই। তাই বলে কি সব জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লিচু আর মেহগিনি চিনবে না? ড্রেস দেখে বোঝা গেলো স্কুল ছাত্রী। শহুরে অভিভাবকবৃন্দ মাঝে মাঝে ছেলেমেয়েদের গাছ দেখিয়ে নিয়ে বেড়াবেন। খুব কঠিন হবে না বিষয়টি। একটু সঙ্গে নিয়ে হাঁটলে অনেক গাছ চেনাতে পারবেন। পারলে নার্সারিতে নিয়ে যান সময় করে। গাছ চেনাও হবে, মানসিক উত্কর্ষ বাড়বে বৈ কমবে না। স্কুল শিক্ষকবৃন্দও গাছ চেনাতে প্রয়োজনে একটা সময় বেছে নিন। বেশি না হোক অন্তত একটা দিন!
দুই. ট্রেন ও ছারপোকা
ঐ দিনই সান্তাহারগামী পদ্মরাগ এক্সপ্রেস ট্রেনে উঠি। কিন্তু কামরার ভেতর এত আবর্জনা ! কতদিন পর পর যে পরিষ্কার করা হয়? ট্রেন ছাড়লে কিছুক্ষণ পর দেখি আশেপাশের সিটে বসা যাত্রীরা উঠছে আর সিটে কিছু খুঁজছে। কেউ কেউ হাত কিংবা পা দিয়ে শব্দ করে ঝাঁকুনি দিচ্ছে সিটে। মানে ছারপোকা দূর করার চেষ্টা। আমিও কিছু কামড় খেয়েছিলাম। কিন্তু ভাবিনি ছারপোকার কামড়। ওদের দেখে আমিও লক্ষ্য করি। ওরে বাবা! ছারপোকায় ভরা! কিলবিল করে ফাঁক দিয়ে উঠছে শব্দ পেয়ে নামছে। এলেন ট্রেনটির লিজ নেওয়া কর্তৃপক্ষের টিটি। দেখলাম, দাঁড়ানো-বসা সবাই প্রায় টিকেট করেছে এবং আগ্রহ নিয়ে টিটিকে দেখালেন। দু একজন যাঁরা করেননি তাঁদের বেশি কিছু বলতে হলো না। কামরাতেই কেটে নিলেন টিটির কাছে। কর্তৃপক্ষ (যাঁরা লিজ নিয়েছেন এবং রেল কর্তৃপক্ষ) যাত্রীরা টিকেট কেটে অর্থসেবা দিচ্ছেন আপনাদের আর আপনারা তাদের শুধু গন্তব্যে পৌঁছে দিয়েই সেবা শেষ করবেন? নিয়মিত কামরা পরিষ্কার করে আর ছারপোকা তাড়ানোর ব্যবস্থা করে যাত্রীসেবা দেবেন না?
তিন. তিস্তা নদী
পরের স্টেশনে ক’জন মহিলা যাত্রী উঠলেন। সঙ্গে একজনের স্কুলপড়ুয়া ছেলে। বোঝা গেছে তারা আত্মীয়ের বাড়ি গিয়েছিল। সামনে তিস্তা ব্রিজ। মা ছেলেকে নদী দেখার জন্য জানালার কাছে পাঠালেন। ছেলেটি আগ্রহ নিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে দেখছে। এই তো বুঝি নদী এলো! তিস্তা সেতু পার হলো। ছেলেটি যেন তবুও আগ্রহ নিয়ে কিছু খুঁজছে! কথা বললাম—বাবা, নদী দেখেছ? কিছু না বলে মুখের দিকে তাকালো। হালকা করতে বললাম—কই গেছিলা? ও বললো—আত্মীয়ের বাড়ি। বললাম—পড়ো? ও বললো—হ্যাঁ। বললাম—কোন শ্রেণিতে? ও বললো—তৃতীয় শ্রেণিতে। এরপর আবার বললাম—নদী দেখেছ? সে হেসে বললো—কই নদী? খালি বালু। সত্যি, এককালের প্রমত্তা তিস্তা আজ যেন বালু নদী! রোদের আলোয় চিকমিক করে ওর বালু। মান্নাদের গান মনে পড়লো এ অবস্থা দেখে—এ নদী এমন নদী, জল চাই একটু যদি দু’হাত ভরে উষ্ণ বায়ু দেয় আমাকে...। এ নদীর উজানের দেশ ভারত নদীটির ভাটি অঞ্চলের অবস্থা একবার দেখবে কি?
গাইবান্ধা