রানা প্লাজার শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণে আশার আলো

রানা প্লাজার গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য ঘোষণাটি আশার আলো দেখাচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) উদ্যোগে গঠিত তহবিলে কানাডিয়ান ব্র্যান্ড লোবলোসহ কয়েকটি বিদেশি ব্র্যান্ড অর্থ প্রদানে সম্মতি দিয়েছে। লোবলো বলেছে, তহবিলে ৩৭ লাখ ডলার জমা দেবে। ফলে চার কোটি মার্কিন ডলারের (৩১২ কোটি টাকা) লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে গঠিত তহবিলের অর্ধেক অর্থের ফয়সালা হল। এর আগে গত বুধবার পর্যন্ত তহবিলে জমা পড়েছে এক কোটি ৭০ লাখ ডলার। আগামী ছয় মাসের মধ্যে বাকি অর্থ যোগাড় করে নিহতদের প্রকৃত দাবিদার ঠিক করে ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে চান তহবিলের উদ্যোক্তারা। প্রসঙ্গত: রানা প্লাজার শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার লক্ষ্যে আইএলও এবং আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার সংগঠন ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিল উদ্যোগ গ্রহণ করে। গতকাল বৃহস্পতিবার লোবলো এক বিবৃতিতে রানা প্লাজা ধসে নিহত গার্মেন্টস শ্রমিক ও ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য মোট ৫০ লাখ ডলার খরচের কথা জানায়। এর মধ্যে ৩৭ লাখ ডলার তারা জমা দেবে তহবিলে। ১০ লাখ ডলার খরচ করবে আহত শ্রমিকদের জন্য। বাকী অর্থের একটি অংশ আগেই শ্রমিকদের মজুরি বাবদ খরচ করেছে বলে জানায় লোবলো। ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিলের মহাসচিব রায় রমেশ চন্দ্র আশা করছেন, আগামী ৬ মাসের মধ্যে ক্ষতিপূরণের লক্ষ্যে গঠিত চার কোটি ডলারের এই তহবিল যোগাড় হবে। তিনি বলেন, লোবলোসহ অন্যান্যদের প্রতিশ্রুত এই অর্থ মিলিয়ে দুই কোটি ডলারের তহবিল যোগাড় হবে। এর বাইরে কয়েকটি কোম্পানি স্বল্প পরিমাণে হলেও তহবিলে অর্থ প্রদান করার আগ্রহ দেখিয়েছে। তিনি বলেন, এসব ব্র্যান্ড সুনাম নষ্ট হওয়ার ভয়ে জনসম্মুখে নাম প্রকাশ করতে রাজি নয়। এভাবে অন্তত তিন কোটি ডলার আদায় হলে সরকার এবং গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র কাছে ক্ষতিপূরণের বাদবাকী অর্থ চাইব। এই উপায়ে আগামী ৬ মাসের মধ্যে চার কোটি ডলার আদায় হবে বলে জানান তিনি। কানাডার লোবলো, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড ওয়ালমার্ট, চিলড্রেনস প্লেস, ক্যাটো ফ্যাশন্স, যুক্তরাজ্যের ব্যোন মার্শে, প্রিমিয়ার ক্লদিং, প্রাইমার্ক, বেলজিয়ামভিত্তিক সিএন্ডএ, ইটালির বেনেটনসহ ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেনের ২৯টি ব্র্যান্ড রানা প্লাজায় পোশাক বানাত। লোবলো ছাড়াও ব্রিটিশ ব্র্যান্ড প্রাইমার্ক, বোনমার্শে, স্পেনের ম্যাঙ্গো, ইন্ডিটেক্সসহ কয়েকটি ব্র্যান্ড ইতিমধ্যে এই তহবিলে অর্থ প্রদান করেছে। আইএলও’র এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হচ্ছে রানা প্লাজা থেকে পোশাক নেয়া ২৯টি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান। সম্প্রতি ওয়ালস্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে আমস্টারডামভিত্তিক আন্তর্জাতিক শ্রমিক অধিকার গ্রুপ ক্লিন ক্লথস ক্যাম্পেইনের বরাত দিয়ে বলা হয়, রানা প্লাজার ৫টি কারখানা যে ২৯টি ব্র্যান্ডের পোশাক বানাত ওই ব্র্যান্ডগুলো বছরে দুই হাজার দুইশ’ কোটি ডলারের ব্যবসা করে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য যে অর্থ চাওয়া হয়েছে তা তাদের সম্মিলিত মুনাফার পাঁচশ’ ভাগের একভাগ (দশমিক ২০ শতাংশ) মাত্র। শ্রমিক অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, যে সব সংগঠন এই তহবিলে অর্থ দিচ্ছে না তাদের ‘বিব্রত’ করার সব পদক্ষেপই নেয়া হবে। রায় রমেশ চন্দ্র বলেন, এসব ব্র্যান্ডের বড় পুঁজি হচ্ছে ভাবমূর্তি। তাদের ভাবমূর্তিতে আঘাত করলে ক্ষতিপূরণে অর্থ দিতে বাধ্য হবে। ইতিমধ্যে এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলেও জানা গেছে। ২৪ এপ্রিল রানা প্লাজা ধসের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের ব্র্যান্ড গ্যাপ ও ওয়ালমার্টের প্রধান কার্যালয় ও শাখার সামনে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। লন্ডনেও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। এছাড়া ওয়ার্কার্স রাইটস কনসোর্টিয়াম, ক্লিন ক্লথস ক্যাম্পেইন, সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক ইন্ডাস্ট্রিঅল গ্লোবাল ইউনিয়নসহ বিভিন্ন শ্রম অধিকার সংগঠন প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে। বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির (বিসিডব্লিওএস) এর নির্বাহী পরিচালক কল্পনা আক্তার ইত্তেফাককে বলেন, রানা প্লাজা থেকে পোশাক নেয়া ব্র্যান্ডগুলোর স্টোরের সামনে প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম বা চিঠিতে তাদের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালু আছে। ক্ষতিপূরণের অর্থ দিতে তাদেরকে বাধ্য করতেই এই উদ্যোগ। আইএলও কনভেনশনের ১২১ ধারা অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের লক্ষ্যে এই তহবিল গঠন করা হয়েছে। এর ফলে একজন শ্রমিক নিহত বা পঙ্গু হওয়ার ফলে ভবিষ্যত্ আর্থিক ক্ষতির শিকার হলে তা হিসাবভুক্ত হবে। একই সঙ্গে তার পরিবারের দু:খ-দুর্দশার আর্থিক মূল্যও বিবেচনায় আনা হবে। এই বিবেচনায় একজন নিহত শ্রমিকের পরিবার প্রায় ২০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কথা। এছাড়া আহত শ্রমিকরা ক্ষতির বিবেচনায় এর বেশি এমনকি ৪০ বা ৫০ লাখ টাকাও পাবেন বলে জানিয়েছেন রায় রমেশ চন্দ্র। ইতিমধ্যে আইএলও’র উদ্যোগে এই তহবিল থেকে রানা প্লাজার ৫টি গার্মেন্টস কারখানার সব শ্রমিককে ৫০ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে। তবে ক্ষতিপূরণের বাদবাকী অর্থ কেবল আহত এবং নিহতদের পরিবারকে দেয়া হবে।