গল্প-কথায় পদার্থবিজ্ঞান

কিসমিস পুডিং মডেল

মাধব রায় সহকারী অধ্যাপক (পদার্থবিদ্যা) ব্লু-বার্ড স্কুল এন্ড কলেজ, সিলেট পূর্বাংশ:আমরা তো প্রথমে টের পাবোই না। পৃথিবী যে সূর্যের চারদিকে ঘুরছে আমরা কি টের পাচ্ছি ? না কি প্রথমে টের পেয়েছি ? মাথা নাড়লো আকাশ। বিষয়টা তার মনে ধরেছে। গত রবিবারের পর গল্প কথায় কখন যে ঘণ্টা দুয়েক চলে গেলো কেউ টের পায়নি। টের পেলো হঠাত্ বিন্দু ঘরে ঢুকায়। এই আকাশ কী করছিস ? বললো বিন্দু। কিছু না, বিজ্ঞানের গল্প শুনছি। আকাশ বললো। আর গল্প পেলি না। বিন্দু বিজ্ঞানের গল্প তেমন পছন্দ করে না। সে রূপকথার, রাক্ষস খোক্ষসের গল্প বেশি ভালোবাসে। এরই মধ্যে কমলা ঢুকলেন একটা ট্রে নিয়ে। বেশ মজার পুডিং তৈরি করে এনেছেন তিনি। ভাগনা-ভাগনি এসেছে কক্সবাজার থেকে বেড়াতে। ভালো মন্দ খাওয়াতে উনার বেশ উত্সাহ। নীলকান্তবাবু ট্রে থেকে একটা প্লেটে পুডিং নিয়ে এক চামচ মুখে দিয়ে বললেন— বাঃ বেশ হয়েছে তো ! ধন্যবাদ কমলা তোমাকে। এতো মজা করে পুডিং বানিয়ে এনেছো। এই তোমরা সবাই খাও। চন্দ্রাকেও ডাকো। আকাশ, বিন্দু প্লেট নিলো ট্রে থেকে। নীলকান্তবাবু কমলাকে বললেন— তুমিও একটু খাও না। কমলা বললেন— না, না তোমরা খাও। আমি পরে খাবো। আকাশ বললো— খাও না মামি। কমলা একটু নিলেন পুডিং। খেয়ে দেখলেন কেমন হয়েছে। বললেন— ভালোই তো। আরেকটু কিসমিস দিলে আরো ভালো হতো। নীলকান্তবাবু বললেন— না না, আরো দিলে বেশি হয়ে যেতো। এটাই ভালো। কমলা বললেন, তোমরা কী নিয়ে গল্প করছো ? আকাশ বললো— মজার গল্প, বিজ্ঞানের। বিন্দু বললো, না মা, পঁচা গল্প, ওগুলো কেউ শুনে ? নীলকান্তবাবু বললেন— পঁচা না রে, মন দিয়ে শোন, তাহলেই ভালো লাগবে। এবার মজার গল্প বলি, বোস। বিজ্ঞানী রাদারফোর্ডের আগে 1898 খ্রিষ্টাব্দে স্যার জোসেফ জন থমসন বলেছিলেন, পুডিংএর মধ্যে যেভাবে কিসমিস বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকে, পরমাণুতেও তেমনি ধনাত্মক আধানের মধ্যে ইলেকট্রন ছড়িয়ে থাকে। একে তিনি নাম দেন ‘কিসমিস পুডিং মডেল’। হো হো করে হাসলো সবাই। বিন্দু বললো— তিনি মনে হয় পুডিং খেতে বেশ ভালোবাসতেন। আকাশ বললো, সেটাই হবে। মামির মতো কেউ উনাকে পুডিং বানিয়ে খাওয়াতো। নীলকান্তবাবু বললেন, এই পুডিং এর মধ্যে ডিম-ময়দা-চিনি যেভাবে সবখানে রয়েছে, সেটি হলো ধনাত্মক আধান, আর কিসমিসগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে যেভাবে রয়েছে সেগুলো হলো ঋণাত্মক আধান। ইলেক্ট্রনগুলোর ভর খুব সামান্য। এই ডিম, ময়দার ভরই যেমন পুডিংএর ভর, তেমনি। পুডিংএর গল্পে বিন্দু একটু মজা পেয়েছে। তবে অর্ধেকটুকুই বুঝেনি। নীলকান্তবাবু সেটা ধরতে পেরেছেন। তিনি আরো একটু মজা করার জন্য বললেন— আমাদের দেশিয় পদ্ধতিতে একে তরমুজ মডেলও বলা হয়। সবাই মুখ চাওয়া চাওয়ি করলো, তরমুজ মডেল আবার কী ? একটু হাসলোও। নীলকান্তবাবু বললেন— তরমুজের মধ্যে বিচিগুলো যেমন ছড়ানো ছিটানো থাকে, কোনখানে কয়টি বিচি থাকবে, এটি নির্দিষ্ট করা নেই, তেমনি। আকাশ বললো— একটু বুঝিয়ে বলো মামা। বলছি, বললেন মামা। তোমরা নিশ্চয়ই দেখেছো কাঁঠাল বা পেঁপে, যেগুলো বহুবিজী ফল, সেগুলোর ফলের ভিতরে বিচিগুলো সাজানো গুছানো থাকে। কিন্তু তরমুজে সেটি নেই। এরা ভাবনায় পড়লো, মনে করার চেষ্টা করলো কাঁঠাল, পেঁপে ফলের ভিতরে বিচি কীভাবে থাকে। পরমাণুতে সেভাবেই ধনাত্মক আধানের মধ্যে ঋণাত্মক আধান ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে, তরমুজের মতো। মামি বললেন— তোমরা গল্প করো, আমার কাজ আছে, আমি যাই। বিন্দু বললো আমিও যাবো মা। আকাশও বললো, আজ আর ভাল্লাগছে না মামা। আরেকদিন শুনবো। নীলকান্তবাবু বললেন, ঠিক আছে। তবে একটা কথা শুনে রাখো, রাদারফোর্ডের এই মডেলটিও কিন্তু পরে আর টেকেনি। কিছু ত্রুটি ধরা পড়ার পর এই মডেলের ধারণা বাতিল হয়ে যায়। কী বললে মামা ? বিজ্ঞানীরাও ত্রুটিপূর্ণ ব্যাখ্যা দেন ! আকাশ আশ্চর্য হলো। মামা বললেন— হ্যাঁ, এতে আশ্চর্যের কী হলো ? বিজ্ঞানীরা তো মানুষ। ভুল তো হতেই পারে। কিন্তু ঋণাত্মক আর ধনাত্মক আবার কী ? আকাশ বললো। মামা বললেন, এখন আর না। পরে সব বলবো।