বেঁচেছিলেন ৭৭ বছর। কিন্তু তার মধ্যে ৩৪ বছর অসহনীয় নির্বাক জীবন কাটিয়েছেন। জন্মের পর থেকে মাত্র ৪৩ বছর বয়স পর্যন্ত স্বাভাবিক জীবন কাটিয়েছেন। এর মাঝে সাহিত্য রচনার কাল ছিল মাত্র ২৪ বছর। তিনি নির্বাক হয়েছিলেন ৭৭ বছর আগে, তাঁর মৃত্যুর পরও আমরা পেরিয়ে এসেছি প্রায় ৪৩ বছর। তার মানে প্রায় আট দশক তিনি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের বাসিন্দা। তারপরও বাঙালির জীবনে নজরুলের দিগন্তবিস্তারি প্রভাব রয়েছে! কেন? গবেষকরা বলছেন, সাহিত্য রচনার সময়কালের ব্যাপ্তি যাই হোক না কেন নজরুলের প্রভাব শতাব্দি পেরিয়ে আজো সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। মানবতাবাদী কবি নজরুল একুশ শতকে এসে হয়ে উঠেছেন মনুষত্বের কবি। যখন দেশে দেশে সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদ, ধর্মীয় কুসংস্কার বাড়ছে, তার বিপরীতে অসাম্প্রদায়িক ও মানবতার কবি নজরুল চর্চার বিকল্প নেই।
আজ শনিবার ১১ জ্যৈষ্ঠ। সাম্যের কবি, বিরহ-বেদনার কবি, বিদ্রোহের কবি বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২০তম জন্মবার্ষিকী। এ উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধী দলীয় নেতা এইচ এম এরশাদ কবির জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে নজরুলের লেখনী ধূমকেতুর মতো আঘাত হেনে জাগিয়ে দিয়েছিল ভারতবাসীকে। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ‘বিদ্রোহী কবি’ এবং আধুনিক বাংলা গানের ‘বুলবুল’ নামে খ্যাত কাজী নজরুল ইসলাম বিশ শতকের বিশ ও ত্রিশের দশকে উপমহাদেশের অবিভক্ত বাংলার সাংস্কৃতিক জগতে সবচেয়ে বর্ণাঢ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন। দ্রোহ, প্রেম, মানবতা কবির রচনাকে করেছে চিরন্তন, নিয়ে গেছে গণমানুষের কাছাকাছি। কবিতায় বলেছেন, ‘গাহি সাম্যের গান/ মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান...’।
কাজী নজরুল ইসলামের জন্ম বাংলা ১১ই জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ সালে (ইংরেজি ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে) পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে। তার পিতার নাম কাজী ফকির আহমেদ, মা জাহেদা খাতুন। ১৯৭২ সালের ২৪ মে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে কবি সপরিবারে বাংলাদেশে আসেন। বাংলাদেশ সরকার কাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করেন এবং জাতীয় কবি হিসাবে ঘোষণা দেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশেই ছিলেন।
কর্মসূচি:জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২০তম জন্মবার্ষিকী উদযাপনে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ত্রিশাল, ঢাকা, কুমিল্লা, চুয়াডাঙ্গা ও মানিকগঞ্জে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ত্রিশালে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শনিবার প্রধান অতিথি থাকবেন শিক্ষামন্ত্রী ডা: দীপু মনি। এতে সভাপতিত্ব করবেন সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। এ ছাড়া রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, সংস্থা, সংগঠন নানা অনুষ্ঠান আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করবে।
এদিকে নজরুল একাডেমীতে গতকাল শুক্রবার থেকে শুরু হয়েছে দুদিনের বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। আজ শনিবার অনুষ্ঠানের সমাপনী দিন। বিটিভিসহ বেসরকারি চ্যানেলগুলো নানা অনুষ্ঠান সমপ্রচার করবে। জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলো কবির ওপর বিশেষ সংবাদ ও নিবন্ধ পরিবেশন করবে।