আইন আছে, নেই কার্যকর প্রয়োগ। ভেজাল ও নিম্নমানের খাদ্যপণ্যের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নিরাপদ খাদ্য আইন করেছে সরকার। ওই আইনে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য যথেষ্ট ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার প্রয়োগ নেই বললেই চলে। নামি-দামি ব্র্যান্ডের নিম্নমানের ৫২ পণ্যের মামলার শুনানিতে বারবার এই বিষয়টি উঠে এসেছে। হাইকোর্ট বলেছে, উন্নত দেশের আইন পর্যালোচনা করে সরকার নিরাপদ খাদ্য আইন করেছে। এর চেয়ে ভালো আইন আর হতে পারে না। আইনে প্রতিটি বিষয়কে নির্দিষ্ট করা হয়েছে। হয়ত আমরা উন্নত দেশের পর্যায়ে যেতে পারব না, তাদের মতো সে ধরনের অর্থনৈতিক সক্ষমতাও নেই। তবে আমাদের আইনে যা আছে তার মধ্যে থেকে ন্যূনতম একটা মান নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু আইনের সেই প্রয়োগ কি দেখতে পাচ্ছি? আদালত বলেন, খাদ্য-পণ্যের নিরাপত্তার ব্যাপারে আপসের কোনো সুযোগ নেই। সরকারি প্রতিষ্ঠান ঠিকমতো কাজ করলেই হয়ে যায়। কিন্তু এরা বড় বড় অফিস নিয়ে বসে আছে।
এদিকে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার অনেক ভালো ভালো আইন করছে। কিন্তু সেই আইনের প্রয়োগ যে সরকারি সংস্থার ওপর দেওয়া হয়েছে তারাই যদি কার্যকর প্রয়োগ না করে তাহলে আইন প্রণয়নের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হয়। ফলে জনগণ আইনের প্রকৃত সুফল পায় না। তারা বলেন, নিরাপদ খাদ্য আইন নিয়ে উচ্চ আদালত যে অভিমত তুলে ধরেছে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সেটাই আসল বাস্তবতা। যদি আইনের কঠোর প্রয়োগ করা হত, তাহলে ভেজাল ও নিম্নমানের খাদ্যপণ্যে বাজার সয়লাব হত না।
আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ২০১৩ সালে জাতীয় সংসদে নিরাপদ খাদ্য আইন পাস করে। এই আইনের অধীনে সরকার প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি সংস্থাটির কর্মপরিধি কি হবে তা আইনে উল্লেখ করা হয়। আইনটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সংস্থাটিকে বাজার মনিটরিং, স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, অনুপযোগী, ভেজাল খাদ্যদ্রব্য জব্দ ও তা ধ্বংস করার ক্ষমতাও আইনে দেওয়া হয়েছে। এমনকি নিম্নমানের অথবা ঝুঁকিপূর্ণ বা বিষাক্ত পদার্থযুক্ত খাদ্যদ্রব্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের জন্য ব্যবস্থা নিতে পারবে।
আইনের ৫৫ (১) ধারায় বলা হয়েছে, পরিদর্শক মধ্যরাত থেকে সূর্যোদয়ের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত সময় ব্যতীত, যে কোনো সময়ে—(ক) খাদ্য বিপণনের সরবরাহ স্থল, সরবরাহ পথ, মজুদস্থল বা বিক্রয়ের জন্য রক্ষিত খাদ্যদ্রব্যে ব্যবহারযোগ্য যে কোনো বস্তুর অবস্থা, স্থান অথবা উহার উত্পাদন প্রক্রিয়ার অবস্থা পরিদর্শন করতে পারবেন; এবং (৩) উপ-ধারা (১) এর অধীন পরিদর্শন এবং পরীক্ষাকালে যদি পরিদর্শকের বিশ্বাস করিবার কারণ থাকে যে খাদ্য প্রস্তুতকরণ বা বিপণন সংক্রান্ত কাজে নির্দিষ্ট কোনো জীবন্ত বা ক্রিয়াশীল বস্তু, ধারণপাত্র বা উহার উপাদান যাহা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বা অনুপযোগী বা ভেজাল, তা হলে তিনি ঐ সকল বস্তু বা উহা দ্বারা প্রস্তুতকৃত খাদ্যদ্রব্য জব্দ করতে পারবেন। কোনো কিছু জব্দের ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বাধা প্রদান বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারবেন না। এছাড়া জব্দকারী খাদ্যদ্রব্য, জীবন্ত বা ক্রিয়াশীল বস্তু, ধারণপাত্র বা উহার উপাদান অবিলম্বে অপসারণ করিবে।
মসলা, সরিষার তেল, ড্রিংকিং ওয়াটার, চিপস, লাচ্ছা সেমাই, স্পেশাল গাওয়া ঘিসহ নিম্নমানের ৫২ পণ্য চিহ্নিত করে বিএসটিআই। এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট এসব পণ্য বাজার থেকে জব্দ করে ধ্বংস করতে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু ওই আদেশ বাস্তবায়ন না করায় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের প্রতি উষ্মা প্রকাশ করে আদালত বলেন, এসিআই ও প্রাণের মতো বড় বড় কোম্পানিকে কর্তৃপক্ষ ভয় পান? যদি ভয় পান তাহলে আপনাদের এসব পদ দখল করে রাখার দরকার কি?
ব্যবসায়ী মহলের চাপ মোকাবিলা করে কাজ করতে হয়: মাহবুব কবীর
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য মো. মাহবুব কবীর গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে আইনে অনেক ক্ষমতা দেওয়া হলেও আমরা কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, অনেক সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ব্যবসায়ী মহলসহ অনেক চাপ মোকাবিলা করে আমাদের কাজ করতে হয়। এসব বিষয় আমরা চিহ্নিত করেছি। খুব শিগগির আমরা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানাবো। তিনি বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিয়েছি। আইন আইনের গতিতে চলবে। কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।