রাজধানীতে তীব্র পানি সংকট ওয়াসার পাম্পে দীর্ঘ লাইন
প্রকাশ : ২৬ এপ্রিল ২০১৪, ২৩:১৬
পুরান ঢাকাসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। নিত্য-নৈমিত্তিক বা স্বাভাবিক কাজের জন্যও পানি জুটছে না। এছাড়া ওয়াসার দুর্গন্ধযুক্ত দূষিত পানি নিয়েও পুরান ঢাকায় নানা সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে ওয়াসার প্রতিটি পাম্পে বিশুদ্ধ পানির জন্য দীর্ঘ লাইন পরিলক্ষিত হচ্ছে।
দূষিত পানিতে শিশুদের শারীরিক অবস্থা বিপন্ন হয়ে পড়ছে। নানা রোগ-ব্যাধি বিশেষত ডায়রিয়ার প্রকোপ বেড়েছে, সঙ্গে পানিবাহিত নানা রোগ দেখা দিচ্ছে। ওয়াসা কর্তৃপক্ষ পানি সংকটের জন্য বিদ্যুত্ সরবরাহ সংকটকে দায়ী করেছে। রাজধানীতে সাড়ে চার শতাধিক পানি উত্তোলন পাম্প রয়েছে। বিদ্যুত্ সংকটের সময় জেনারেটর ব্যবহার করার কথা। কিন্তু অধিকাংশ জেনারেটর ব্যবহার করা হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। আবার অতিমাত্রায় ব্যবহারের কারণে অনেক জেনারেটর বিকল হয়ে পড়ছে। সার্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটজনক।
ধানমন্ডির সেন্ট্রাল রোডের কয়েকশ পরিবার গত ৩ মাস ধরে পানি সংকটে পড়েছেন। তারা টাকা দিয়েও ওয়াসার এক গাড়ি পানি সংগ্রহ করতে পারছেন না। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তারা ঢাকা ওয়াসার কাছে একাধিকবার অভিযোগ করার পরও সংকট নিরসনে উদ্যোগী হচ্ছে না কর্তৃপক্ষ।
১ বি সেন্ট্রাল রোডের বাসিন্দা প্রণব ভৌমিক ইত্তেফাককে বলেন, সেন্ট্রাল রোডের ইস্টার্ণ হাউজিং এলাকায় ৬ তলা থেকে ১২ তলা পর্যন্ত একাধিক ভবন রয়েছে। এখানে কয়েকশ পরিবার গত ৩ মাস ধরে লাগাতার পানি সংকটে আছেন। সারা দিনে ওয়াসার লাইন থেকে তারা এক বালতি পানিও সংগ্রহ করতে পারছেন না। ফলে কেনা পানির উপর তাদের সম্পূর্ণ নির্ভর করতে হচ্ছে।
সেন্ট্রাল রোড ও আশপাশ এলাকার ভুক্তভোগী মানুষ অভিযোগ করে বলেছেন, টাকা দিয়েও এই এলাকায় পানি মিলছে না। অ্যাডভোকেট আফতাব আহামেদ ইত্তেফাককে বলেন, ওয়াসার প্রতি গাড়ি পানি ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। তিনি ওয়াসার নির্ধারিত মূল্য জমা দিয়ে এক গাড়ি পানির জন্য গত মঙ্গলবার থেকে ৫ দিন অপেক্ষা করেও পানি পাচ্ছেন না। অথচ ওয়াসার কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীর যোগসাজশে অনেকে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে এক-দুই ঘণ্টার মধ্যেই পানি ভর্তি গাড়ি পেয়ে যাচ্ছেন। এক্ষেত্রে তাদের প্রতিটি গাড়ির জন্য গুনতে হচ্ছে ১ হাজার, ১২শ থেকে সর্বোচ্চ ১৫শ টাকা। প্রতিদিন রাত ১০টার পর এখানে ওয়াসার পানির গাড়ির লাইন লক্ষ্য করা যায়। যারা অতিরিক্ত টাকা দেয় সময়মত তাদের ঠিকানায় পানি পৌঁছে যায়। পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার লেন ও আশপাশের এলাকায় গত এক মাস ধরে পানি সংকট চলছে। পুরান ঢাকার সুত্রাপুরের বাসিন্দা আফসার উদ্দিন ইত্তেফাককে বলেন, ঘরের পানির কলে পানি নেই। রাস্তায় ওয়াসার কলেও পানি নেই।
ঢালকানগর ছাড়াও শাঁখারীনগর লেন, আলমগঞ্জ লেন ও আলমগঞ্জ রোডে গত এক বছর ধরে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দুই ঘণ্টাও পানি থাকে না বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করেন। এবার গরম বৃদ্ধির পর গত এক মাস যাবত্ এসব এলাকার কলে পানি একেবারেই আসছে না।
গরম বেড়ে যাওয়ায় রাজধানীর মিরপুর, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, দক্ষিণ মনিপুর, কাফরুল, কল্যাণপুরেও পানির সমস্যা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন এসব এলাকার বাসিন্দারা। কোথাও পানি নেই, কোথাও পানিতে ময়লা ও দুর্গন্ধ। মিরপুর ২ নম্বর সেকশন সংলগ্ন কাজীপাড়ায় ৩ মাস ধরে পানি সংকট চলছে। মিরপুর ১৪ নম্বর এলাকা সংলগ্ন বৌবাজার এলাকায় পানির কল খুললে ময়লার সঙ্গে কেঁচোও আসছে। মাঝে মাঝে পানি আসছে না।
গোপীবাগ, পেয়াদাপাড়া, মোহাম্মদপুর, উত্তরা ও গুলশানের কিছু অংশে পানির সমস্যার কথা জানিয়েছেন এলাকাবাসী। পেয়াদাপাড়া, ওয়ারী ও বনগ্রাম এলাকায় ওয়াসার পানিতে ঝাঁজালো গ্যাসের দুর্গন্ধ আসছে। এই পানি দিয়ে হাত, মুখ ও গোসল করলে চোখ জ্বালাপোড়া করে। গা থেকে দুর্গন্ধ আসে। ওই এলাকার বাসিন্দারা রামকৃষ্ণ মিশন ও ওয়ারী পাম্প থেকে পানি সংগ্রহ করছেন।
গত শনিবার মিলব্যারাক পাম্প হাউসে গিয়ে দেখা যায়, পানি নিতে বালতি, কলসি, জারিকেন নিয়ে ভিড় করেছেন আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা। কিন্তু পাম্প থেকে পানি মিলবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই।
আলমগঞ্জ লেনের বাসিন্দা মাহাবুবুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, বাসায় এক ফোঁটা পানি নেই। অফিসে হাজিরা দিয়ে আবার বাসায় এসে পানি নিতে পাম্পে এসেছেন। পানি নেয়া হলে আবার অফিসে যাবেন। তিনি বলেন, সন্ধ্যায় অফিস থেকে বাসায় ফিরে হাত-মুখ ধোয়ার পানিও পান না। ওয়াসার ১ নম্বর অঞ্চলে বিষয়টি জানানোর পর পানির গাড়ির জন্য সিরিয়াল দেয়ার পরামর্শ দেন কর্তব্যরত কর্মকর্তা। কিন্তু সিরিয়াল দিয়ে সাতদিনেও পানির গাড়ির দেখা পাননি তিনি।
সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার থেকে প্রতিদিন ৪৫ কোটি লিটার পানি উত্পাদন হলেও একদিকে সদরঘাট ও অন্যদিকে পোস্তগোলার মাঝের বিরাট এলাকায় ওই পানি যায় না। কারণ, সেখানে শোধনাগারের পানির লাইন স্থাপিত হয়নি। তাই ওই এলাকার মানুষ নির্ভরশীল মিলব্যারাক পুলিশ লাইন, দীননাথ সেন লেন ও আইজি গেট এলাকার তিনটি পাম্পের গভীর নলকূপের ওপর। বর্তমানে গরমের কারণে পানির চাহিদা বেড়ে গেছে। এর ওপর লোডশেডিং, বিদ্যুত্-বিভ্রাট বেড়ে যাওয়ায় পাম্পগুলোয় পানি উত্তোলনেও সমস্যা হচ্ছে। ফলে ঢালকানগর লেন ও আশপাশের এলাকায় যেটুকু পানি আসত, তা-ও আসছে না।
গেন্ডারিয়ার বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ বলেন, রান্না করা, গোসল করা, কাপড় ধোয়াসহ বিভিন্ন কাজে ভীষণ সমস্যায় পড়েছেন এলাকাবাসী। পান করার মতো পানিও কখনো কখনো পাওয়া যায় না। এর আগে ওয়াসার সঙ্গে যোগাযোগ করেও লাভ হয়নি।
দূষিত ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি সম্পর্কে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিত্সক ডা. আবু নোমান ইত্তেফাককে বলেন, পুরান ঢাকায় ওয়াসার দুর্গন্ধযুক্ত পানি ফুটিয়েও পান করা যাচ্ছে না। পানিতে দূষণ থেকেই যাচ্ছে। ফলে দূষিত পানি পান করায় কোমলমতি শিশুরা সবচেয়ে বেশি পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। প্রতিদিন পুরনো ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত রোগীর ভিড় বাড়ছে হাসপাতালে। গুরুতরদের পাঠানো হচ্ছে মহাখালী উদরাময় হাসপাতালে।
এ ব্যাপারে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান ইত্তেফাককে বলেন, চোরাই লাইনের কারণে ওয়াসার পাইপ লাইনের ফুটো দিয়ে অনেক সময় ময়লা-আবর্জনা ঢুকে পড়ছে। এতে করে কোথাও কোথাও পানিতে দুর্গন্ধের সৃষ্টি হতে পারে। তিনি সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের ফুটিয়ে পানি পান করার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ঢাকাবাসীর পানির চাহিদা ২২০ কোটি লিটার, উত্পাদন হচ্ছে ২৪৫ কোটি লিটার। সংগত কারণে পানি নিয়ে সংকট হবার কথা নয়। তবে অতি গরমের কারণে পানির অপচয় হচ্ছে বেশি। তিনি বলেন, যেসব এলাকায় পানি সংকটের অভিযোগ পাওয়া গেছে সেসব এলাকায় পানি সংকট নিরসনে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।