কুষ্টিয়ায় গড়াইসহ ৪ নদী মরে গেছে

ভারতের ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের নদ-নদী ও পরিবেশের ওপর পড়ছে বিরূপ প্রভাব। পানি না পেয়ে এক সময়ের প্রমত্তা পদ্মা এখন শুকিয়ে চরাঞ্চলে রূপ নিয়েছে। ফলে কুষ্টিয়ার পদ্মা নদীর শাখা গড়াইসহ ৪টি নদী এখন পুরোপুরি মরে গেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ওপর। খুলনা বিভাগের ১০ জেলা, রাজশাহী বিভাগের পাঁচ জেলা এবং ঢাকা বিভাগের রাজবাড়ি, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, শরিয়তপুর, মাদারিপুর, গোপালগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জসহ অনেক স্থানের পরিবেশ-প্রতিবেশ ও বাস্ততন্ত্রে এর প্রভাব পড়েছে। গঙ্গা অববাহিকার ভাটি অঞ্চলের নদ-নদীর শতকরা ৪০ ভাগ ইতোমধ্যে মরে গেছে। দেশের এ এলাকার তাপমাত্রার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে। গ্রীষ্মকালে কখনও ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপ জীবন-যাত্রা বিপর্যস্ত করে তুলছে। আবার শীতে তা কমতে কমতে ৫ ডিগ্রিতে নেমে যায়। ফলে খরা আর শৈত্য প্রবাহে কৃষি, স্বাস্থ্য, বন, পরিবেশ হুমকির মুখে পড়ছে। সময়মতো বৃষ্টি নেই। অনাবৃষ্টি অথবা অতিবৃষ্টিতে প্রতি মওসুমেই হয় ফসলের হানি, ফলে স্থানীয় শিল্পও ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার পদ্মার হার্ডিঞ্জ ব্রিজের পূর্বপাড়ের পাশাপাশি এবার পশ্চিম পাড়েও জেগেছে অসংখ্য চর, ডুবোচর। শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই জেগে ওঠা এসব চরে এলাকার কৃষকরা আবাদ করছেন ধানসহ অন্য ফসল। এছাড়াও প্রমত্তা পদ্মার বিরাট অঞ্চল একেবারেই শুকিয়ে গেছে। পদ্মার শাখা গড়াই, হিসনা, কালীগঙ্গা ও মাথাভাঙ্গা নদী প্রায় পুরোপুরি শুকিয়ে গেছে। নদীতে জীবিকা নির্বাহকারী পদ্মানদীর মাঝি আনোয়ার হোসেন জানান, পানির অভাবে খেয়া পারাপার করতে পারছেন না। ফলে তার একমাত্র উপার্জনের পথ নৌকা পারাপার বন্ধ হয়ে গেছে। সূত্র জানায়, ভারত সরকার দীর্ঘ মেয়াদে এক পরিকল্পনা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার রাজমহল ও ভগবানগোলার মাঝখানে এবং রাজশাহী জেলার সীমান্ত এলাকা থেকে মাত্র ১১ কিলোমিটার দূরে কলকাতা বন্দর রক্ষার নামে ১৬০ কিলোমিটার জলপ্রবাহ সচল রাখার অভিলাষে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়। ১৯৬১ সালের ৩০ জানুয়ারি বাঁধ নির্মাণ শুরু হয় আর ১৯৭০ সালে শেষ হয়। যে বাঁধের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল। ১৯৫১ সালে তদানীন্তন পাকিস্তান সরকার এ বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করতে পদক্ষেপ নেয়নি। ১৯৫৪ সাল থেকে সেচ প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় পানি চেয়ে আসতে থাকে বাংলাদেশ। স্বাধীন দেশে এ চাহিদা দাঁড়ায় প্রায় ৬৫ হাজার কিউসেকে। যা ৭৬ সাল থেকে বাংলাদেশ চাহিদানুযায়ী পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত। ফারাক্কা বাঁধের আগে শীতকালেও পদ্মা নদীতে ৪০ হাজার কিউসেক পর্যন্ত পানি পাওয়া গেছে। ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে নৌ-চলাচল, মত্স্য, কৃষি, পশুসম্পদ ও বাংলাদেশের গৌরব সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সুপেয় পানির দুষ্প্রাপ্যতা দেখা দিয়েছে। ক্ষতি হয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যের। চরমভাবে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে মংলা ও চালনা সমুদ্রবন্দর। ‘ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে পদ্মা, গড়াই, ভৈরব, মধুমতিসহ অনেক নদ-নদী শুকিয়ে যাওয়ায় কয়েক কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্যের সম্মুখীন। পদ্মাসহ এর শাখা নদীর ওপর নির্ভরশীল মানুষেরা হারিয়েছে তাদের যুগ-যুগান্তরের পেশা। জীবিকার তাগিদে প্রায় ৪ কোটি মানুষ আজ দরিদ্রতার শিকার। সর্বোপরি যে বিষয়টি আমাদের ভাবনার উদ্রেক করেছে তা হলো- অর্থনৈতিক কাঠামোতে আঘাত। বৃষ্টিহীনতা ও লবণজলের আগ্রাসনে উত্তরাঞ্চল মরুময় হচ্ছে আর দক্ষিণাঞ্চল লোনাজলে আবদ্ধ হয়ে তছনছ করে দিচ্ছে বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন কৃষিকে। হারিয়ে গেছে মহামূল্যবান প্রাকৃতিক মত্স্য। এছাড়াও বন-পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য, প্রাণী সম্পদের অস্তিত্ব বিপন্ন। নৌ-চ্যানেল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় বেকারত্ব বেড়েছে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় চাপ পড়েছে। আর্সেনিকের প্রবাহে ক্ষত বিক্ষত এ এলাকার জনজীবন। ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে সার্বিক বিবেচনা আরো ভয়ংকর। বর্ষার পলি নৌ চ্যানেলকে নষ্ট করেছে। ধ্বংস করছে প্রাকৃতিক জলাধার। চাহিদার মোকাবেলা করতে গিয়ে জমিতে চাপ বাড়ছে।