কংগ্রেস শিবিরে ‘প্রিয়াঙ্কা বাতি’

এবারের লোকসভা নির্বাচনকে আদর্শগত লড়াই হিসেবে দেখাতে চাইছে কংগ্রেস। এজন্য নির্বাচনের মাঝপথে প্রচারণা পরিকল্পায় পরিবর্তন এনছে তারা। কংগ্রেসের পরিকল্পনা অনুযায়ী সাম্প্রদায়িক দলকে লক্ষ্যবস্তু করতে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করছেন সোনিয়া গান্ধীর তনয়া প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। শেষ সময়ে এসে কিছু জাতীয় ইস্যু ও বিরোধীদল বিজেপিকে লক্ষ্য করে বক্তব্য দিয়ে নতুন করে কংগ্রেসের পক্ষে জোয়ার তুলেছেন। সরাসরি কঠোর ভাষায় আক্রমণ করছেন নরেন্দ্র মোদীকে। মিডিয়ার সিংহভাগ মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছিল বিজেপি। কিন্তু নানামুখী চাপে কোনঠাসা হয়ে পড়া কংগ্রেসের সামনে যেন বাতি নিয়ে দাঁড়িয়েছেন প্রিয়াঙ্কা। সেই বাতির আলোতে কিছুটা হলেও চমকে গেছে বিজেপিসহ কংগ্রেসবিরোধীরা। নির্বাচনে শুধু মা সোনিয়া গান্ধীর রায় বরেলি ও ভাই রাহুল গান্ধীর আমেথি আসনে প্রচারণা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রিয়াঙ্কা। এর আগেও এই দুটি আসনে তিনি প্রচারণা চালিয়ে ছিলেন। কিন্তু সে সময় প্রচারণার ধরণ ছিলো ভিন্ন। ২০০৪ সালে লোকসভা ও ২০১২ সালে বিধান সভার নির্বাচনের সময় তিনি ছোট ছোট মহল্লা বা রাস্তার মোড়ে সমাবেশ করেছিলেন। তখন কোনো টেলিভিশন কাভারেজও ছিলো না। কিন্তু এবার ঠিক পঞ্চম ধাপের নির্বাচনের আগে প্রচারণা শুরু করেছেন তিনি। তার সমাবেশগুলো এখন অনেক বড় এবং সুসংগঠিত। টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হচ্ছে তার সমাবেশের বক্তব্য। তাই তা প্রচার পাচ্ছে ভারতের ঘরে ঘরে। প্রচারণায় নামার আগে রাহুল গান্ধীর প্রচারণা দপ্তরে অনেক বেশি সময় দিয়েছেন প্রিয়াঙ্কা। যে কারণে তার ভূমিকা এখন অনেক বেশি তাত্পর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে কংগ্রেসে। গত কয়েক মাস ধরে নীরবতা পালনের পর গত সপ্তাহে ব্যবসায়ী স্বামী রবার্ট ভদ্রকে রক্ষায় কথা বলেছেন প্রিয়াঙ্কা। জমি বেচা-কেনার ব্যবসায়ে জড়িত ভদ্র ইতিমধ্যে বেশ কয়েকবার বিজেপি নেতাদের সমালোচনার মুখে পড়েছেন। কেউ কেউ তার বিচারের হুমকি দিয়েছে। আবার কেউ কেউ তার আর্থিক উন্নয়নের মডেলও জানতে চেয়েছে। স্বামীকে রক্ষার পাশাপাশি বিজেপির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী নরেন্দ্র মোদীকেও তুলোধূনা করেছেন প্রিয়াঙ্কা। তিনি বলেছেন, এ নির্বাচন ভারতের জন্য বাঁচা-মরার লড়াই। মোদীর নেতৃত্বে সরকার গঠন হলে তারা দেশের অসাম্প্রদায়িক ভিত্তিকে ভেঙে চুরমার করে দেবে। কংগ্রেস সূত্র বলছে, নির্বাচনের এই মাঝামাঝি সময়ে এসে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর প্রচারণা কংগ্রেসকে উজ্জীবিত করেছে। তার বক্তব্য, প্রচারণা আগামী তিন ধাপের নির্বাচনে কংগ্রেসকে এগিয়ে রাখতে বড় সহায়ক হবে। সূত্র জানায়, নির্বাচনী প্রচারণায় সোনিয়া ও রাহুল গান্ধীও মোদীর সমালোচনা করে বক্তব্য রাখছেন। কিন্তু প্রিয়াঙ্কার মন্তব্যের প্রভাব আগুনের ফুলকির মতো ছড়িয়ে পড়ছে। এ কারণে দলীয় কর্মীরা নতুনভাবে উজ্জীবিত হয়েছে। কংগ্রেস মুখপাত্র আনন্দ শর্মা বলেন, প্রিয়াঙ্কা কিছু বললে সবাই সেটা লক্ষ্য করছে। ভাই রাহুল গান্ধীর চেয়ে বয়সে দুই বছরের ছোট হলেও ভারতের রাজনীতিতে তাকে অনেক বেশি সহজাত বলেই বিবেচনা করা হয়ে থাকে। প্রচারণাকালে চাচাতো ভাই বরুণ গান্ধীরও তীব্র সমালোচনা করেছেন প্রিয়াঙ্কা। সুলতানপুর থেকে বিজেপির টিকিটে লড়ছেন বরুন গান্ধী। তিনি বরুণকে লক্ষ্য করে বলেছেন, নির্বাচন হলো মতাদর্শগত লড়াই। এটা পারিবারিক কোনো চায়ের আসর নয়। ইতিমধ্যেই প্রিয়াঙ্কা জানিয়ে দিয়েছেন, দলে কোনো পদ নেয়ার ইচ্ছা তার নেই। শুধু দুটি আসনেই তার প্রচারণা চলবে। এই দুই আসনে প্রচারণার সময় মোদী ব্রিগেডকে আক্রমণ করে দেয়া তার বক্তব্য দলের সংগঠকদের সাহস জোগাচ্ছে। কংগ্রেস সূত্র জানায়, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী হলেন একজন সহজাত রাজনীতিক। মোদীর যে জোয়ার চলছে তা তিনিই থামাতে পারেন। বর্তমানে এই দুই আসন ও দিল্লির জন্য সময় ভাগ করেছেন তিনি। যার ফলে ভাই রাহুলের নেতৃত্বে চলা প্রচরণায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারছেন। একই সঙ্গে তিনি বারানসিতে বড় লড়াইটিও পর্যবেক্ষণ করছেন। এই আসনে বিজেপির নরেন্দ্র মোদী, আম আদমি পার্টির অরবিন্দ কেজরিওয়াল আর কংগ্রেসের পক্ষে অজয় রায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর জোর প্রচার-প্রচারণা হলো শেষ মুহূর্তে কংগ্রেসের প্রচারণা পরিকল্পনায় পরিবর্তনের ফল। হতে পারে গত ছয় পর্বের নির্বাচনে অধিকহারে ভোটার উপস্থিতি কংগ্রেসের অস্বস্তি বাড়িয়েছে। যে কারণে বিজেপি বিশেষ করে নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে আগ্রাসী প্রচারণা চালানোর জন্যই প্রিয়াঙ্কাকে সামনে আনা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো পরিবর্তিত পরিকল্পনায় তারা কতটুকু সফল। প্রিয়াঙ্কা কী কংগ্রেস ও গান্ধীদের রক্ষা করতে পারছেন। কিছু গণমাধ্যম বলছে, রায় বরেলিতে মোদীকে আক্রমণ করে প্রিয়াঙ্কার বক্তব্য জাতীয় নির্বাচনে কংগ্রেসের আবেদনকে জোরালো করতে পারেনি। এমনকি গণমাধ্যমের সর্বোচ্চ সাড়াও পায়নি। অনেকেই বলছেন, নিরাপদ আসনে প্রচারণায় এমন বক্তব্য দুর্বলতারও লক্ষণ। মূলত মোদীর উপর থেকে গণমাধ্যমের নজর সরাতে এ ধরনের প্রচারণা চালানো হচ্ছে বলে বিরোধীদল মনে করে। তবে যে যাই বলুক শেষ মুহূর্তে এসে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন প্রিয়াঙ্কা। তার আগ্রাসী প্রচারণা, মুগ্ধকর বক্তব্যে শেষ পর্যন্ত রাজনীতিবিদ প্রিয়াঙ্কাকেই দেখতে পারছে ভারতীয়রা।