লো ক স ভা নি র্বা চ ন
স্বচ্ছতার চাবিকাঠি প্রযুক্তির হাতে
প্রকাশ : ২৭ এপ্রিল ২০১৪, ২১:১২
ভারতের চলমান লোকসভা নির্বাচনে দেশীয় প্রযুক্তি সবচে বড় ‘তারকা’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ভোটাররা একটা বাটন টিপে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট দিচ্ছে অতি সহজে। অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচনের চাবিকাঠি বহন করছে ভারতে তৈরি এই ইভিএম মেশিনগুলো। ইভিএম নিয়ে বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকম বিতর্ক তৈরী হয়েছে। অনেকের মতে, ইভিএম হ্যাকিং করা যায়। ফলে একজন দক্ষ হ্যাকারের পক্ষে ইভিএমের ফল পরিবর্তন করা সম্ভব। এর সপক্ষে বিভিন্ন সময় এই মেশিনগুলো হ্যাকিং করে ভোটের ফল পাল্টে দেয়ার উদাহরণও দেখিয়েছে তারা।
কিন্তু লোকসভা নির্বাচনে যেসব ইভিএম ব্যবহার করা হচ্ছে সেগুলো বিতর্কের উর্ধ্বে। মেশিনগুলো হ্যাকিং করা একেবারেই অসম্ভব। দেশ-বিদেশের বাঘা বাঘা হ্যাকারদের হাতে দিনের পর দিন এগুলো জমা রাখা হয়েছিল তাদের হ্যাকিং ক্ষমতা কতটুকু তা যাচাই করার জন্য। কিন্তু সবাই ব্যর্থ হয়েছে। একারণে এই মেশিনগুলো নিয়ে ভারতের কোনো রাজনৈতিক দল আপত্তি তোলেনি। এছাড়া প্রতিটি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণের চিত্র ডিজিটাল ক্যামেরায় ধারণ করা হচ্ছে। তারবিহীন নেটওয়ার্কের সাহায্যে দূরে বসে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করছেন নির্বাচন কমিশনের পরিদর্শকরা। বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশে প্রযুক্তির এই ব্যাপক ব্যবহার নির্বাচনকে প্রায় শতভাগ বিতর্কমুক্ত রাখতে সাহায্য করছে। কোনো দলের পক্ষ থেকেই কারচুপি কিংবা পক্ষপাতিত্বের তেমন কোনো অভিযোগ আনা হয়নি।
প্রযুক্তিনির্ভর এই নির্বাচনে বিপুল উত্সাহ নিয়ে কাজ করেছেন নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা। নির্বাচনের আগে দেখা গেছে নৌকায় ভরে, ভ্যানে করে এমনকি হাতি, ঘোড়া, গাধার পিঠে করে ইভিএম নিয়ে যাওয়া হচ্ছে দুর্গম এলাকার ভোটকেন্দ্রগুলোতে। আর সফলভাবে এগুলোর সাহায্যে স্বচ্ছ ও সুন্দর নির্বাচন করতে পেরে কমিশনের কর্মকর্তাদের পরিশ্রম স্বার্থক। ইভিএমে ভোটগ্রহণ নিয়ে এত গর্ব খুব কম দেশই করতে পেরেছে। যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, বর্তমানে মোট ১৪টির মতো দেশ রাজনৈতিক নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করে থাকে। সেই সংখ্যা দিন দিন কমছে। যেসব দেশ এখনো সীমিত পরিসরে ভোটিং মেশিন ব্যবহার করে সেগুলো হচ্ছে ব্রাজিল, জার্মানি, ভেনিজুয়েলা, কানাডা, বেলজিয়াম অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং ফ্রান্স।
এমনকি বিশ্বের প্রাচীনতম গণতন্ত্র যুক্তরাষ্ট্রেও এখনো কাগজের ব্যালট বিরাজমান। ভারতের নির্বাচনকে বিশ্বের সবচে জাঁকজমক ‘গণতান্ত্রিক নৃত্য’ বলেও অভিহিত করে থাকে অনেকে। কারণ এটি এমন এক দেশ দেখানে প্রায় ১২১ কোটি লোকের বাস এবং ৮১ কোটি ভোটারের হাতে থাকে রাজনীতিকদের ভাগ্য। অর্থাত্ যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের জনসংখ্যার সমান হলো ভারতের ভোটার সংখ্যা। তারপরেও ভারতে কাগজের ব্যালট বিলুপ্তির দিকে যাচ্ছে।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের হর্তা-কর্তাদের নির্বাচন চলাকালীন সময়টাতে ঘুম হারাম হয়ে যায়। এবারো তার ব্যতিক্রম ছিল না। যত বড় নেতা কিংবা যত বড় পদের অধিকারী হোক না কেন, আচরণবিধি লংঘন করলে নির্বাচন কমিশন কাউকে ছাড় দেয়নি। প্রতিটি নির্বাচনী মিছিল এবং জনসভার ভিডিও রেকর্ড করেছে নির্বাচন কমিশন। প্রার্থীদের মিছিল-জনসভার পেছনে পেছনে ঘুরছে ক্যামেরা যুক্ত মোবাইল ভ্যান। পরে সেগুলো যাচাই বাছাই করে দেখা হচ্ছে। কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে আচরণবিধি লংঘনের প্রমাণ পেলেই সাথে সাথে ব্যবস্থা নিচ্ছে। ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ভিএস সামপাথ গণমাধ্যমকে বলেন, অনেক দেশে ইভিএম নিয়ে বিতর্ক হয়। কারণ সেগুলোতে ফল পাল্টে দেয়ার সুযোগ থাকে এমন অভিযোগ করা হয় কারো কারো পক্ষ থেকে। কিন্তু লোকসভা নির্বাচনে যে ইভিএমগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে সেগুলো কারচুপির কাজে ব্যবহার করা একেবারেই অসম্ভব। এগুলো একেবারে ভিন্ন প্রযুক্তির। কম্পিউটারে কীবোর্ডের চেয়ে সামান্য আকারে বড়। জাঁদরেল হ্যাকারের হাতে তুলে দিলেও তার পক্ষে এর ভেতরের ডাটা পাল্টানো অসম্ভব। সারা দেশের ৯ লাখ ৩০ হাজার ভোটকেন্দ্রে ১৪ লাখের মতো ইভিএম ব্যবহার করা হবে। মেশিনগুলো বিভিন্ন কেন্দ্রে পাঠানো হয় দৈবচয়ন পদ্ধতিতে। কেন্দ্রে পৌছানোর আগে কেউই জানতে পারে না কোন ইভিএমগুলো কোন রাজ্যের কোন জেলার কোন কেন্দ্রে যাবে। তাই কারসাজির সম্ভাবনা জিরো।
নির্বাচন কমিশন আরো জানায়, কেবল হ্যাকিংপ্রুফ ইভিএম দিয়েই তারা নিশ্চিন্তে বসে থাকেনি। যেসব এলাকায় বিদ্যুত্ কিংবা ইন্টারনেট সংযোগ নেই সেসব এলাকার নির্বাচন প্রক্রিয়া মনিটর করা হয়েছে জিপিআরএসের সাহায্যে। গোয়েন্দার যেসব কেন্দ্রকে ‘স্পর্শকাতর’ হিসেবে তথ্য দিয়েছে সেসব কেন্দ্রের সবগুলোতে সরাসরি খেলা সমপ্রচারের মতো ‘লাইভ’ সম্প্রচার করে ইসিতে বসে নজরদারি করেছে কমিশন। এমনকি যেসব কেন্দ্র নিয়ে বিতর্ক উঠতে পারে সেসব কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া ভিডিও স্ট্রিমিং করে সরাসরি দেখিয়েছে কমিশন যাতে ঘরের কম্পিউটারে যে কেউই ইন্টারনেট ব্রাউজারে সেই ভোটগ্রহণের দৃশ্য দেখতে পারে। তবে সমপ্রচার এমনভাবে করা হয়েছে যাতে ভোটারদের গোপনীয়তা ভঙ্গ না হয়। কে কোন প্রতীকে ভোট দিচ্ছেন তা যেন দেখা না যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের একজন ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ার চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেছিলেন ব্লুটুথ দিয়ে তার পক্ষে যেকোন ইভিএম হ্যাকিং করা সম্ভব। ভারতের নির্বাচন কমিশন তার এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে বলেছিল, যত সময় প্রয়োজন তত সময় ধরে তিনি চেষ্টা করে দেখতে পারেন ফল পাল্টে দিতে পারেন কি না। পারলে তিনি যেন সাংবাদিক সম্মেলনে সবার সামনে একটা ইভিএমের ফল পাল্টে দেখান। কিন্তু সেই মার্কিন প্রকৌশলী অনেক ঘাম ছুটিয়েও শেষ পর্যন্ত পরাজয় মেনে নেন। তার আগে ভারতের অনেক দক্ষ ইভিএম ইঞ্জিনিয়ার এই মেশিনে ভোটগ্রহণ বন্ধ করতে সুপ্রিম কোর্টে রিট করেছিল। এই ইভিএমগুলোর ফল পাল্টানো সম্ভব কিনা সুপ্রিম কোর্ট তাদের সেটা প্রমাণ করতে বলে। কিন্তু একের পর এক ইভিএম নষ্ট করেও কেউ সেগুলো কারসাজি করতে সক্ষম হয়নি। তাই সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়, লোকসভা নির্বাচনে এসব ইভিএম ব্যবহার বৈধ এবং নিরাপদ।
গত লোকসভা নির্বাচনে পেপার ব্যালট ব্যবহার করা হয়েছিল। সেই ব্যালটগুলো ছাপতে ৮ হাজার মেট্রিক টন কাগজ লেগেছিল। এই পরিমাণ কাগজ উত্পাদন করতে ১ লাখ ২০ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক গাছ কাটার দরকার হয়। সুতরাং এই ইভিএমগুলো সেই অর্থে বিপুল পরিমাণ গাছের প্রাণ রক্ষা করে পরিবেশ বাঁচাতে বড় ভূমিকা পালন করছে। একবার দু’বার নয়, এই ইভিএমগুলো বছরের পর বছর ধরে ব্যবহার করা যায়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, এত বড় কঠিন নির্বাচনকে সহজ করে দিয়েছে প্রযুক্তি। তাছাড়া পেপার ব্যালটের ব্যবহার না হওয়ায় পেশিশক্তির ব্যবহার করার সুযোগও বিদায় নিয়েছে।