আমার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল তোমরা দলকে বাঁচিয়েছো
প্রকাশ : ২৭ এপ্রিল ২০১৪, ২৩:১৪
পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচন থেকে শেষ মুহূর্তে সরে যাওয়ার নিজের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল বলে স্বীকার করলেন জাতীয় পার্টি (জাপা) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ। নির্বাচনের পর দল থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সঙ্গে গতকাল রবিবার প্রথম বৈঠকে তাদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, ‘ভুল-ত্রুটি সবারই থাকে। তোমরা নির্বাচনে থেকে দলকে রক্ষা করেছ, দলকে তোমরা নতুন জীবন দিয়েছ। তোমরা সঠিক কাজ করেছ। তখন (নির্বাচনের সময়) আমার যে অবস্থানই ছিল না কেন, এখন আমি তোমাদের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছি। আমরা এক ও অভিন্ন। পেছনের দিকে না তাকিয়ে আমাদের এখন সামনের দিকে তাকাতে হবে। আমি তোমাদের সহযোগিতা চাই।’ রাজধানীর গুলশানে স্পেক্ট্রা কনভেনশন সেন্টারে দলের প্রেসিডিয়ামের সদস্য ও দলীয় এমপিদের নিয়ে এই যৌথসভা করেন এরশাদ।
৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে-পরে নানা নাটকীয়তা, ধুম্রজাল ও দ্বিধা-বিভক্তির পর প্রথমবারের মতো দলীয় এমপিদের নিয়ে বৈঠক করলেন তিনি। প্রেসিডিয়ামের সভাও হলো দীর্ঘ পাঁচ মাস পর। নির্বাচনের পর এতদিন দু’একজন ছাড়া এমপিদের প্রায় সবাই এরশাদকে এড়িয়ে চলতেন। নির্বাচন শেষে গত ১২ ফেব্রুয়ারি দলীয় এক অনুষ্ঠানে এরশাদ আমন্ত্রণ জানালে দলের ৩৪ এমপির ৩০ জনই যাননি। সেদিন এরশাদ তাদের উদ্দেশে বলেছিলেন ‘তোমরা আমার কাছে ফিরে এসো। না এলে তোমরা ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে।’
এসব ঘটনার পর গতকালের যৌথসভায় বিরোধী দলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদসহ প্রেসিডিয়ামের সদস্য ও দলীয় এমপিসহ ৫০ জনের বেশি নেতা যোগ দেন। তবে দলের সদ্য সাবেক মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, প্রেসিডিয়াম সদস্য জিএম কাদের ও অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন খানসহ কয়েকজন বৈঠকে যাননি। বুকের ব্যথার কারণে হাওলাদার গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিত্সাধীন ও অধ্যাপক দেলোয়ার নিজ এলাকা চাঁদপুরে থাকার কারণে যেতে পারেননি। তবে জিএম কাদেরের অনুপস্থিতির কারণ জানা যায়নি।
সকাল ১০টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বৈঠকে উপস্থিত থাকা জাপার প্রেসিডিয়ামের একাধিক সদস্য ও কয়েকজন এমপি ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে এরশাদের উপরোক্ত বক্তব্যের কথা জানিয়ে বলেন, বৈঠকে প্রেসিডিয়ামের উপস্থিত সকল সদস্য ও এমপিরা খোলামেলা বক্তব্য রেখেছেন। বেশিরভাগেরই বক্তব্য ছিল, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ঐক্যবদ্ধ জাপা অংশ নিতে পারলে দল থেকে আরও কয়েকজন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হতে পারতেন। নির্বাচনে থাকা না থাকার বিষয়ে তখন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে ধূম্রজাল সৃষ্টি করায় ক্ষতি হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তারা।
সূত্র মতে, বৈঠকে রওশন এরশাদও দীর্ঘ বক্তব্য রেখেছেন। তিনি বলেছেন, নানা ভুল-ত্রটি, সিদ্ধান্তহীনতা ও ভুল সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েও জাপা আজ এই অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। বিএনপি একটি বড় দল, নির্বাচনে না গেলেও তারা টিকে থাকতে পারবে। জাপা ততটা বড় দল নয়, সেদিন নির্বাচনে না গেলে জাপা রাজনীতি থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতো। ভেদাভেদ ভুলে এখন থেকে ঐক্যবদ্ধভাবে সামনে এগিয়ে যেতে তিনি দলের এমপি-নেতাদের পরামর্শ দেন।
বৈঠক শেষে কয়েকজন এমপি ইত্তেফাককে জানান, সভার শুরুতে এরশাদ বলেন ‘আমি আজ তোমাদের কথা শুনবো। তোমরা সবাই বক্তব্য রাখবে। যার মনে যত কথা আছে, সব খুলে বলবা। আমি যখনই যা করেছি, তোমাদের স্বার্থে করেছি, দলের কল্যাণের জন্য করেছি। একক সিদ্ধান্তে নয়, ভবিষ্যতে সবার সহযোগিতা নিয়ে দল পরিচালিত হবে।’ নিজের বিরুদ্ধে ৭৪টি মামলার কথা তুলে ধরে এরশাদ বলেছেন, আমি কখনো শৃঙ্খলমুক্ত হয়ে রাজনীতি করতে পারিনি।
সূচনা বক্তব্যে জাপার নবনির্বাচিত মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু বলেন, সমসাময়িক কোনো নেতা এরশাদের মতো এত দীর্ঘসময় জেলে থাকেননি। আগামীতে দেশের বৃহত্তম দল নয়, বরং জাপা প্রধান দল হয়ে সরকার গঠন করতে চায় বলে অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন তিনি।
মাঝখানে এক ঘণ্টার বিরতি দিয়ে দীর্ঘ ছয় ঘণ্টাব্যাপী অনুষ্ঠিত এই বৈঠক শেষে জাপা মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলু সংবাদ সম্মেলনে বলেন, দলকে সংগঠিত করতে আগামী মে-জুনে সারা দেশে গণসংযোগ করা হবে। ডিসেম্বরে দলের তৃণমূল থেকে কেন্দ্র হিস্যা আদায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংসদ চালু, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, খাদ্যে ভেজাল মেশানোর বিরুদ্ধে এবং দেশব্যাপী গুম-খুন-অপহরণের প্রতিবাদে জাপা সংসদের ভেতরে ও রাজপথে সোচ্চার থাকবে বলে জানান জাপা মহাসচিব।