না’গঞ্জে প্যানেল মেয়রসহ সাতজন অপহূত

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের দুই নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র আওয়ামী লীগ নেতা নজরুল ইসলাম ও তার সঙ্গে থাকা আরো ৪ জন অপহূত হয়েছেন। এছাড়া অপর এক ঘটনায় নারায়ণগঞ্জে আদালতপাড়া থেকে এক এডভোকেট ও তার গাড়িচালককে অপহরণ করা হয়েছে। গতকাল রবিবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জের আদালত থেকে একটি মামলায় জামিন নিয়ে তিনি সিদ্ধিরগঞ্জ ফিরছিলেন। তার সঙ্গে প্রাইভেটকারে ছিলেন তিন সহযোগী ও ড্রাইভার। রওনা হওয়ার কিছুক্ষণ পরই তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ধারণা করা হয় তারা অপহূত হয়েছেন। তবে কোথা থেকে কারা কিভাবে তাদের তুলে নিয়ে গেছে সে বিষয়ে কোন প্রত্যক্ষদর্শী পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধারকৃত গাড়ি থেকে নজরুলের গাড়িচালক জাহাঙ্গীরের ড্রাইভিং লাইসেন্স, একজন মহিলার জাতীয় পরিচয়পত্র এবং একজন পুলিশ পরিদর্শকের ভিজিটিং কার্ড উদ্ধার করা হয়েছে। নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি অভিযোগ করছেন, লামাপাড়া স্টেডিয়াম এলাকা থেকে তার স্বামীর গাড়ির (ঢাকা-মেট্রো-ব-১৪-৯১৩৬) গতিরোধ করে তাকে র্যাব পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে তিনি অভিযোগ করেন, এই ঘটনার পেছনে একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলরসহ দুইজন আওয়ামী লীগ নেতার হাত রয়েছে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, তাদের সঙ্গে কিছুদিন ধরে তার স্বামীর বিরোধ চলছিল। গতকাল রাত ৯টার দিকে গাজীপুরের শালবন থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি প্রাইভেটকার উদ্ধার করে পুলিশ। যদিও গাড়ির নম্বর প্লেট খোলা। তবে পুলিশের ধারণা গাড়িটি নজরুলের হতে পারে। নজরুল ইসলামের সঙ্গে আরো যারা অপহূত হয়েছেন তারা হলেন— গাড়িচালক জাহাঙ্গীর, শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদের সিদ্ধিরগঞ্জ থানা কমিটির সহ-সভাপতি তাজুল ইসলাম, ৭ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের কর্মী মনিরুজ্জামান ওরফে স্বপন এবং তার বন্ধু লিটন। নজরুল ইসলাম জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং কেন্দ্রীয় যুবলীগের সাবেক সদস্য। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে জোড়া খুনসহ কমপক্ষে ১৫টি মামলা ও বেশ কিছু সাধারণ ডায়েরি রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম বলেন, কাউন্সিলর নজরুল ও তার ৪ সহযোগীকে অপহরণ করা হয়েছে বলে তার স্ত্রী মৌখিকভাবে অভিযোগ করেছেন। অভিযোগ পেয়ে পুলিশ তাত্ক্ষণিকভাবে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নিয়ে অপহূত সকলকে উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে। র্যাব-১১ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল তারিক সাইদ মাহমুদ জানান, র্যাব এই ধরনের কাউকে গ্রেফতার বা আটক করেনি। এই ঘটনার সঙ্গে র্যাবের সম্পৃক্ততা নেই। এদিকে নজরুল অপহূত হয়েছেন এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে গতকাল বিকাল সোয়া ৫টার দিকে তার সমর্থকরা সাইনবোর্ড এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করে। এ সময় তারা রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করে এবং ১০/১২টি গাড়ি ভাঙচুর করে। এ ঘটনায় ওই সড়কে আধঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিলো। পরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অবরোধকারীদের ধাওয়া দিয়ে রাস্তা থেকে হটিয়ে দেয়। বিকাল পৌনে ৬টায় আবার যান চলাচল শুরু হয়। নজরুলের সমর্থকরা দ্বিতীয় দফায় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় সিদ্ধিরগঞ্জের মৌচাক এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে শুয়ে অবরোধ করে। রাত সাড়ে ৮টার দিকে নজরুলের সাথে নিখোঁজ হওয়া স্বপনের সমর্থকরা সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী ইপিজেড এলাকায় বেশ কয়েকটি যানবাহনে ভাঙচুর চালায়। নজরুলের স্ত্রী সেলিনা সাংবাদিকদের বলেন, একটি মামলায় জামিন নিতে নজরুলসহ ১৫ জন সকালে নারায়ণগঞ্জ আদালতে যান। আদালতের কাজ শেষে কর্মীদের বাসে যেতে বলে তিনি প্রাইভেটকারে রওনা দেন। এরপর তার সঙ্গে কয়েক দফা যোগাযোগের চেষ্টা করেও তিনি ব্যর্থ হন। এ সময় তার মোবাইল ফোনটিও বন্ধ পাওয়া যায়। সেলিনা অভিযোগ করেন, স্থানীয় ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি নূর হোসেন ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজী মো. ইয়াসিনসহ বেশ কয়েকজনের সঙ্গে তার বিরোধ রয়েছে। তারাই র্যাব পরিচয়ে তার স্বামীকে তুলে নিয়ে গেছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে এ ব্যাপারে কাউন্সিলর নূর হোসেন তার বিরুদ্ধে আনা নজরুলের স্ত্রীর অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, নজরুল অপহরণের বিষয়টি তিনিও অন্যদের কাছ থেকে শুনেছেন। তবে তিনি এই ঘটনার ব্যাপারে কিছুই জানেন না। এই ঘটনায় সেলিনা ইসলাম বিউটির পক্ষ থেকে ফতুল্লা থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। ফতুল্লা থানার ডিউটি অফিসার সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আসমা বেগম জানান, নজরুলের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করতে থানায় এসেছিলেন। পরে তাদেরকে জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান বলেন, রাত ৯টার দিকে গাজীপুরের ন্যাশনাল পার্কের পাশ থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি টয়োটা করোলা প্রাইভেটকার উদ্ধার করা হয়েছে। ওই প্রাইভেটকারের নাম্বার প্লেট ছিল না। ফলে এই প্রাইভেটকারটি নজরুল ইসলামের কি-না তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। না’গঞ্জে গাড়ি চালকসহ আইনজীবী নিখোঁজ নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র ও কাউন্সিলর নজরুল ইসলামসহ পাঁচজনের অপহরণের রেশ কাটতে না কাটতেই খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না নারায়ণগঞ্জ বারের আইনজীবী চন্দন সরকার (৬০) ও তার গাড়ি চালকের। গতকাল রবিবার দুপুরের পর থেকে তার কোনো হদিস নেই। রাতে এ ব্যাপারে নিখোঁজ আইনজীবী চন্দন সরকারের ভাতিজা অরুনাভ সরকার পান্না ফতুল্লা থানায় একটি জিডি করেছেন। জিডি নম্বর ১৬১৬। এদিকে রাতে চন্দন সরকারের নিখোঁজের বিষয়টি জেলা পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম ও র্যাব-১১ এর কার্যালয়ে মৌখিকভাবে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান জানান, দুপুর দুইটার দিকে নারায়ণগঞ্জের আদালতপাড়া থেকে নিজের প্রাইভেটকারে চড়ে (ঢাকা মেট্রো গ-২৭-৩৩৩৭) বের হন অ্যাডভোকেট চন্দন সরকার। এরপর থেকে চালকসহ তার কোনো খোঁজ নেই। তিনি আরো জানান, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের প্যানেল মেয়র ও কাউন্সিলর নজরুল ইসলামসহ পাঁচজনের অপহরণের সময় চন্দনের গাড়িটি অপহরনকারীদের গাড়ির সামনে ছিল বলে স্থানীয়রা তাকে জানিয়েছেন।